ভারত এমন একটা দেশ, যেখানে মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে বর্তমানের চেয়ে বেশি ভীত। তেমনই এক সিনেমা নির্মাণ করেছেন দিবাকর ব্যানার্জি। নাম ‘তিস’। কাশ্মিরী একটি পরিবারের তিন প্রজন্ম নিয়ে এর গল্প। তবে পরিবার নিয়ে মূল গল্প হলেও গল্পের নির্যাসে আছে ডিস্টোপিয়া। আর দিবাকরের ডিস্টোপিয়ার ধরনটা হলো বর্তমানের সবকিছু ছাপিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়। কিন্তু সিনেমাটিই নিজের ভবিষ্যতের কাছে হেরে গেছে। কেননা তিস মুক্তি পাওয়ার কথা নেটফ্লিক্সে। তারাই সিনেমা মুক্তির ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু নির্মাণ হয়ে যাওয়ার পর এ নিয়ে নেটফ্লিক্সের পক্ষ থেকে আর কোনো ঘোষণা আসেনি। সিনেমাটি এক রকম বাতিলই করে দিয়েছে তারা।

নেটফ্লিক্সের ওয়েবসাইটে ২০১৯ সালে এ সিনেমা নিয়ে প্রথম পোস্ট করা হয়। তখন এর নাম ছিল ‘ফ্রিডম’। সিনোপসিসে লেখা আছে সিনেমার গল্প। এছাড়া দিবাকর যে সিনেমার গল্পকার, নির্মাতা ও প্রযোজক—তাও স্পষ্ট। সিনেমাটি নির্মাণ শেষ হয় ২০২২ সালে। কিন্তু এরপর সিনেমাটি নিয়ে নেটফ্লিক্স কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। ২০২৩ সালে মার্কিন গণমাধ্যম ডেডলাইন প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, দিবাকর ব্যানার্জির তিস নামের সিনেমাটি মুক্তি দেয়ার কোনো পরিকল্পনা নেটফ্লিক্সের নেই। তারা এটি ঝুলিয়ে রেখেছে। কিন্তু স্থগিত করার কোনো কারণও প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ করেনি। অনেকের ধারণা প্রাইমের সিরিজ ‘তাণ্ডব’ নিয়ে ওঠা বিতর্কের জের ধরে মুক্তি বাতিল বা পিছিয়ে যাওয়া বহু কনটেন্টের মতোই অবস্থা হচ্ছে দিবাকরের এ সিনেমার। প্রশ্ন হলো, দিবাকর তার সিনেমার এ দশা নিয়ে কী মনে করেন।

দিবাকর বলেন, ‘আমি কখনো ভুলেও চিন্তা করিনি, সিনেমার গল্পের একটা চরিত্রের জীবনই আমাকে যাপন করতে হবে। তিসের গল্পটা আনহাদ দ্রাবুকে নিয়ে। ২০৪৩ সালের পটভূমিতে রচিত এ গল্পে দ্রাবু একটা উপন্যাস লেখে। উপন্যাসের নামই ‘তিস’ এবং এটি সাহিত্য মন্ত্রণালয় থেকে নিষিদ্ধ হয়। আমার সিনেমার ব্যাপারটাও অনেকটা সে রকমই হয়েছে।’

সিনেমাটির মুক্তি আটকে যাওয়া বা বাতিল হওয়ার মধ্য দিয়ে দিবাকরের অন্যান্য প্রজেক্টেরও দফারফা হয়েছে। এ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল অনেকগুলো স্বপ্নই এর মধ্য দিয়ে নষ্ট হলো। এ সিনেমার সঙ্গে অনেকেই যুক্ত ছিলেন। তাদের অনেক আবেগ কাজ করেছে। এর মধ্যে সিনেমাটোগ্রাফার রঞ্জন পালিত, সম্পাদক জাবিন মার্চেন্ট, সাউন্ড ডিজাইনার সুস্মিত নাথ অন্যতম। সিনেমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমি প্রচণ্ড রেগে যাই। রীতিমতো থেরাপি নিতে হয়েছে এ অবস্থা থেকে বেরোনোর জন্য।’

সিনেমায় ২০৩০ সালকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০৩০ সালকে কেন দেখানো হয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা মূলত ২০২৫-২৬ সালের একটা টাইমলাইন চিন্তা করেছিলাম, যেখানে ক্ষমতাসীনরা সংখ্যালঘুদের এগিয়ে যেতে দেয় না। কিন্তু তাদের কোয়ালিশনও ভেঙে যায়। পুরো বিষয়টা ২০৩০ সালের দিকে গিয়ে একটা পরিণতি পায়। তবে এ সময় একটা দাঙ্গা হয়। পুরনো অনেক কিছুই ফিরে আসে এ ভবিষ্যতের গল্পে। দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িকতা ও যা যা হতে পারে।’

গল্প থেকেই বোঝা যায়, যদিও ভবিষ্যতের কথা হচ্ছে, কিন্তু দিবাকর আসলে বর্তমানের অ্যানার্কির কথাই বলছেন। তিনিই এ কথার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, আসলে বর্তমানের নির্যাস নিয়েই ভবিষ্যতের এ গল্প সাজানো। সিনেমার একটি চরিত্রকে মহান নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাকে সবাই ‘দেশের কন্যা’ বলে সম্বোধন করে।

সিনেমাটিকে ভবিষ্যতের সময়কে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে ভিজুয়াল ইফেক্ট নিয়েও কাজ করতে হয়েছে। এজন্য বেড়ে গেছে বাজেটও। কিন্তু এমন সিনেমার ক্ষেত্রে ভারতে বাজার ধরতে পারাও কঠিন। দিবাকর অবশ্য মনে করেন ডিস্টোপিয়াকে আগে বোঝা উচিত। তিনি বলেন, ‘বিষয়টা আসলে ততটাও ভবিষ্যতের নয়। ১৯৯৫ বা ৯৯ সালের কারো জন্য বর্তমান সময়টা ছিল ডিস্টোপিয়া। এখন আমাদের জন্য ২০৪৩ হতে পারে ডিস্টোপিয়া। কিন্তু সময়ের পার্থক্য হলেও পরিস্থিতির পার্থক্য তেমন নেই। বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের পার্থক্য খুব বেশি নয়।’

স্ক্রলডটইন অবলম্বনে আসরার আবেদিন