স্টিভেন স্পিলবার্গ পুরোদস্তুর সিনেমার মানুষ। তাকে সিনেমার প্রবাদপুরুষ বললে ভুল হবে না। একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে ১৯ বার মনোনীত হয়ে সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন তিন বার। এমন ব্যক্তির আত্মজৈবনিক সিনেমায় সিনেমার গল্পই উঠে আসবে, এ আর বিস্ময়ের কী! তার সাম্প্রতিক নির্মিত ‘দ্য ফেবলম্যানস’ এমন সিনেমারই প্রতিনিধিত্ব করে।
সিনেমাটি শুরু হয় পরিবারের সঙ্গে স্যামির সিনেমা দেখতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রথমেই আমরা স্যামির মুখে শুনি, সে সিনেমা দেখার ব্যাপারে ভীত। কেননা ছয় কী আট বছর বয়স্ক স্যামি মনে করে পর্দা থেকে কোনো দানব হয়তো বেরিয়ে আসবে। সেখানেই তার বাবা-মায়ের মুখে আমরা শুনতে পাই এক অমোঘ বাণী-সিনেমা মানে স্বপ্ন। এরপর পুরো সিনেমায় সে স্বপ্নের গল্পই বুনেছেন স্পিলবার্গ।
স্পিলবার্গের স্যামি তার দেখা সিনেমায় ট্রেনের সঙ্গে একটি গাড়ির সংঘর্ষ দেখেছিল, যা তার মনে গেঁথে যায়। এরপর বাবার কিনে দেয়া খেলনা রেলগাড়িকে নিজের আরেকটি খেলনা গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে দেয় সে নিজেই। খুবই সাধারণ ঘটনা কিন্তু স্পিলবার্গ ঘটনাটি দৃশ্যায়ন করার ক্ষেত্রে দেখিয়েছেন, ছোট্ট স্যামির মানসে তখন ছিল ভিজুয়াল। আর কে না জানে, সিনেমার প্রথম শর্ত বা একক হলো ভিজুয়াল। স্যামির বেড়ে ওঠার সঙ্গে বিকশিত হতে থাকে তার ভাবনা আর সে ভাবনাজুড়ে ডানা মেলতে থাকে সিনেমা। বলা চলে ‘দ্য ফেবলম্যানস’ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিনেমা নির্মাণে হাত পাকাতে থাকে স্যামি।
সিনেমা আজ চলে গেছে ডিজিটাল ভার্সনে। ব্যবহৃত হচ্ছে সিজিআই। স্পিলবার্গ নিজে যখন পেশাদারি নির্মাতা হলেন, তখনো এত সুযোগ ছিল না। স্যামির ছেলেবেলায় তো ওসব ভাবা আরো অসম্ভব। এরই মধ্যে স্যামি ক্যামেরা ধার করে বন্ধুদের নিয়ে সিনেমা বানানোর চেষ্টা করে। ছোট একটি গল্প নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্যের সিনেমা। কিন্তু স্যামির সিনেমা নির্মাণের এ চেষ্টার মধ্য দিয়ে স্পিলবার্গ উন্মোচন করেছেন ক্যামেরায় ভিজুয়াল ধরার নানা কৌশল। একটি গাড়ি স্থির অবস্থায়ই তাকে নাড়িয়ে, হাতে ধুলো ছিটিয়ে চাকার ধুলোর ঝড় ইত্যাদি এক সময় কীভাবে তৈরি হতো স্যামির সিনেমা নির্মাণ থেকে তা বোঝা যায়। এর পরই আসে ফিল্ম নিয়ে কাজ। পড়াশোনার বাইরে স্যামি ফ্রেমে যা ধরে, বসে বসে তা নিজেই এডিট করে। সিনেমা সম্পাদনার পুরো প্রক্রিয়া স্পিলবার্গ দেখাননি কিন্তু ফিল্ম চালিয়ে ভিজুয়াল দেখা এবং ফিল্ম কেটে রাখার সময় স্যামি যেভাবে কাজ করে, সে দৃশ্যায়নে স্পিলবার্গের সেট, সিনেমার শিল্প নির্দেশনার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কয়েকটি দৃশ্যে ফিল্ম হাতে স্যামিকে দেখে যেকোনো ফটোগ্রাফার এ সিনেমায় স্পিলবার্গের ফটোগ্রাফির প্রেমে পড়তে বাধ্য।
সময়কে ধরার ব্যাপারটি স্পিলবার্গের সিনেমায় সবসময়ই থাকে। এ সিনেমায়ও তাই। আমেরিকায় ফেবলম্যান পরিবারের জীবনযাপনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখি সেখানকার সংস্কৃতি। পোশাক, বাসগৃহ থেকে মানুষের চিন্তাজগতের খবরও দিয়েছেন স্পিলবার্গ। সেখান থেকেই আসে সিনেমা নিয়ে তখনকার মানুষের ধারণা। ভালো চাকরির প্রতি স্যামির বাবার আগ্রহ, এমনকি ক্যাম্পাসে সেমেটিক ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে স্যামিকে করা কটূক্তি। কিন্তু সে বিষয়ের জবাবও স্যামি এক সময় দেয় সিনেমার মাধ্যমে, যেমন দিয়েছিলেন স্পিলবার্গ নিজেও।
স্যামির চরিত্রে অভিনয় করা গ্যাব্রিয়েল ল্যাবেল মনোমুগ্ধকর অভিনয় করেছেন। একজন তরুণের স্বপ্ন, পরিস্থিতির শিকার হয়ে তার রুদ্ধশ্বাস অবস্থা, প্রেম সবকিছুই অভিব্যক্তি ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে চমৎকার উপস্থাপন করেছেন। স্যামির বাবা বার্ট ফেবলম্যানের চরিত্রে পল ডানো একজন নিপাট ভদ্রলোকের হুবহু উপস্থাপন। জন ফোর্ডের চরিত্রে ডেভিড লিঞ্চের উপস্থিতি দর্শককে অবাক করবে। তবে এ সিনেমায় মুগ্ধ করেন মিটজি ফেবলম্যান (স্যামির মা) চরিত্রে অভিনয় করা মিশেল উইলিয়ামস। পরিবার ও প্রেমের মধ্যে কোনটা বেছে নেবেন, সে দোটানার মধ্যেও মিশেল সুন্দর। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় স্পিলবার্গের এ সিনেমার চমৎকারতম উপস্থাপনটিকে।
ফেবলম্যান পরিবার একটি বনভোজনে যায়। সেখানে বনফায়ারের সামনে স্বচ্ছ পোশাকে মিটজির নাচ ক্যামেরায় রেকর্ড করে স্যামি। পুরোদিনই সে ক্যামেরা ধরেছিল। সেটিকে এডিট করার সময়ই স্যামির চোখে ধরা পড়ে বার্টের বন্ধু বেনির সঙ্গে মিটজির ঘনিষ্ঠতা। স্যামি সেদিন শিখেছিল, খোলা চোখে যা দেখা যায় না, কখনো কখনো তা লেন্সে ধরা পড়ে। তারপর হয়তো কোনোদিন স্যামির মনে পড়েছিল তার প্রথম সিনেমা দেখার আগের অভিজ্ঞতা। তার মা বলেছিল, ‘সিনেমা স্বপ্নের মতো।’
স্যামি শিখেছিল, লেন্সের মধ্য দিয়ে যেমন স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলা যায়, তেমনি বাস্তবও স্বপ্ন হয়ে যায়।










