সাল ১৯৪০। চারদিকে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শুরুতে পরাশক্তিদের কাছে অতটা গুরুত্ব না পেলেও ক্রমেই করাল হয়ে উঠছে নাৎসি জার্মানি। হিটলারের বাহিনী দোর্দণ্ডপ্রতাপে এগিয়ে চলেছে। চেকোস্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়ে এরই মধ্যে তাদের দখলে চলে এসেছে। তিন মিলিয়ন জার্মান সৈন্য এখন অবস্থান করছে বেলজিয়ান সীমান্তে।

ফরাসি বাহিনীও খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না তাদের বিরুদ্ধে। যেকোনো সময় পতন ঘটতে পারে তাদের। তারপর ইংলিশ চ্যানেলটা পাড়ি দিলে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ শক্তি যুক্তরাজ্যও হয়ে পড়বে তাদের গোলাম। কেননা এ মুহূর্তে সরাসরি যুদ্ধে তাদের পক্ষে জার্মানদের হারানো দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়। এখন যুক্তরাজ্যের কৌশল কী হবে? তারা কি যুদ্ধক্ষেত্রে লড়বে? নাকি না লড়ে সুবিধাজনক কোনো চুক্তি করে করদ রাজ্যে পরিণত হবে? 

জো রাইট পরিচালিত ডার্কেস্ট আওয়ারে ১৯৪০ সালের ৮ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত সময়ে ব্রিটেনের রাজনীতির ঘটনাবলি দেখানো হয়। এ সময়ে ব্রিটেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তারা কোন কৌশলে এগোবে, সে-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দোদুল্যমানতা দূরীভূত হয়। এ সময়কেই অভিহিত করা হচ্ছে ডার্কেস্ট আওয়ার নামে। এসব ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ব্রিটেনের পাশাপাশি পুরো বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব সিদ্ধান্ত যদি ভিন্ন হতো, তাহলে হয়তো বর্তমান দুনিয়ার চেহারাটাও অন্য রকম হতো। 

টাইটেল কার্ডে তৎকালীন প্রেক্ষাপট বর্ণনার পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ব্রিটিশ সংসদে। দেখানো হয় চেম্বারলেইনের পদত্যাগ। হিটলার বা জার্মানির যুদ্ধংদেহী মনোভাব দমাতে না পারা, কিছু বুঝে ওঠার আগেই শত্রুপক্ষের ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকা, এসব কারণে তাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দিতে হয়। ফলে সৃষ্টি হয় নেতৃত্বের সংকট। সবাই হ্যালিফ্যাক্সকে নেতৃত্বে চাইলেও, তার মনে ছিল অন্য চাল। ফলে ক্ষমতায় আসেন উইনস্টন চার্চিল। তাকে ক্ষমতায় বসানোর একমাত্র কারণ বিরোধী দল রক্ষণশীল দলের নেতাদের মাঝে শুধু তাকেই বিশ্বাস করে। 

ঠোঁটকাটা স্বভাব, মদ্যপান, অদ্ভুতুড়ে আচরণ—এসবের জন্য চার্চিলকে রাজা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী কেউই দেখতে পারে না। গ্যালিপলি ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তার সিদ্ধান্তের পরিণাম নিয়ে লোকজন হাসাহাসি করে। সবাই মনে করে যে কিছুদিন পরই প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়তে হবে তাকে। সে লোকই কীভাবে যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাজ্যের সর্বেসর্বা হওয়ার পথে নিজেকে নিয়ে যান, তা-ই দেখানো হয়েছে জো রাইটের সিনেমায়। 

পরিচালকের ২০০৭ সালে নির্মিত সিনেমা এটোনমেন্টেও যুদ্ধের প্রভাব দেখা গেছে। সেখানে মূলত যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ব্যক্তিগত বিরহ আর অনুশোচনা ছিল গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে। আর এখানে গল্প আবর্তিত হয়েছে যুদ্ধকালীন রাজনীতি-কূটনীতিকে ঘিরে। কয়েকটি যুদ্ধের দৃশ্য ব্যতীত সম্মুখ সমরের দৃশ্য প্রদর্শন না করেও ‘‌ডার্কেস্ট আওয়ার’ অনায়াসে ‘‌ওয়ার’ ফিল্ম।

এ ছাড়া উইনস্টনের ব্যক্তিগত দূরদর্শিতা, চিন্তা-চেতনা, হিউমার ও তার পারিবারিক কাঠামোর দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন পরিচালক। এতে চার্চিলের জীবন ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তার পরিবারের অবদান, তাদের ত্যাগের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। স্ত্রী ক্লেমেন্টাইনের সঙ্গে চার্চিলের পরিণয়, তাদের দাম্পত্য জীবনের সূক্ষ্ম বিষয়াবলিও সিনেমায় উঠে এসেছে। ছিল তৎকালীন সময়ে তার ব্যক্তিগত সহকারী এলিজাবেথ লেটনের বয়ানও। এসব বিষয় উপস্থাপনের ফলে চার্চিলের খ্যাপাটে, অদ্ভুতুড়ে ব্যক্তিত্ব আরো সহজবোধ্যভাবে চিত্রিত হয়েছে দর্শকের সামনে। 

সিনেমার কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনা করতে হলে পরিচালক জো রাইট, চিত্রনাট্যকার অ্যান্থনি ম্যাককার্টেন ও সিনেমাটোগ্রাফার ব্রুনো ডেলবনেল, সবার নামই নিতে হবে। ইতিহাসের যে কিছুদিনের ঘটনাপ্রবাহ এখানে দেখানো হয়, সেটাকে সাধারণ ঐতিহাসিক ড্রামার আদলে বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে থ্রিলারের আদলে। 

ম্যাককার্টেনের ক্যামেরা এমনভাবে চালিত হয়েছে, যাতে ক্যাবিনেট ওয়ার রুমের টানেল, লন্ডনের বিখ্যাত আন্ডারগ্রাউন্ড রেলপথের অন্ধকারাচ্ছন্ন আর আশাহীন পথ উপস্থাপন হয়েছে করাল রূপে। এতে দর্শকমনে উদ্রেক হয়েছে শ্বাসরুদ্ধকর ও ক্লসট্রোফোবিকতার অনুভূতি। যেটি আসলে ওই সময়ের ব্রিটেনেরই সাধারণ অনুভূতির প্রতিভূ। জাতি ও বিশ্বশক্তি হিসেবে তাদের পিঠ যে দেয়ালে ঠেকে গেছে এবং জার্মানরা যে তাদের কোণঠাসা করে ফেলেছে, এ ধরনের আবহ সৃষ্টি করতে পারার পেছনে আবহ সংগীতেরও অপরিসীম ভূমিকা আছে। তাই সংগীত পরিচালক দারিও মারিয়ানেলির কাজেরও প্রশংসা করতে হবে। 

চার্চিলের চরিত্রে গ্যারি ওল্ডম্যান অনবদ্য। এতকাল ধরে লম্বাটে, স্থুলকায়, বদমেজাজি, ভাবালু আরো নানা ধরনের চার্চিলকে টিভি ও সিনেমার পর্দায় দেখা গেছে। কিন্তু চেহারা ও উদ্দীপনায় কোনো চার্চিলই এ সিনেমার চার্চিলের সমকক্ষ হতে পারেনি। ঐতিহাসিকভাবে শুদ্ধ ডার্কেস্ট আওয়ারে ইতিহাস ওইক’টা দিনের উইনস্টন চার্চিল পরিপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছেন। 

সিনেমার অন্যান্য চরিত্রের কথা বলতে গেলে ক্লেমেন্টাইন রূপী ক্রিস্টিন স্কট থমাস ও রাজা ষষ্ঠ জর্জ রূপী বেন মেন্ডেলসনের নাম অগ্রগণ্য। উভয়েই যতক্ষণ পর্দায় ছিলেন, মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন, গ্যারি ওল্ডম্যানকে যোগ্য সাহচর্য দিয়েছেন। লিলি জেমস, রোনাল্ড পিকআপ ও স্টেফেন ডিলেইনও ভালো অভিনয় করেছেন। ফলে কখন ১২৫ মিনিটের সিনেমাটি শেষ হয় যায়, তা টেরও পাওয়া যায় না।