বাবা-মায়ের মনোযোগ পেতে মানুষ কত কী করে! বিশেষ করে যে শিশুদের মায়ের অথবা বাবার সঙ্গে দূরত্ব থাকে, ভয় থাকে; তারা যেকোনো উপায়ে তাদের খুশি করতে চায়। একটু কম রাগের বিনিময়ে, কম ভর্ৎসনার বিনিময়ে এসব শিশু যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। অথচ সেই মা-বাবা অবলীলায় উপেক্ষা করে যান সন্তানের অপেক্ষা, ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, একটু সময়ের জন্য করা হাহাকার। উপেক্ষা, অপেক্ষা, হাহাকার জমতে জমতে কোন পর্যায়ে পৌঁছে; তার কিছু চিত্র আমরা দেখতে পাই নেটফ্লিক্সে সদ্য মুক্তি পাওয়া ভারতীয় ছবি ‘‌কলা’য়।

অবশ্য কলাকে শুধু একটি দর্শনের ছবি বলা যাবে না। অনেক ভাবনার দরজা উন্মোচনের ছবি কলা। যেখানে উঠে এসেছে মায়ের সঙ্গে মেয়ের সম্পর্কের টানাপড়েন, রসায়ন; তেমনি পুত্র সন্তানের জন্য আকাঙ্ক্ষা, তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্ধকার কুঠুরি। উঠে এসেছে প্রবল পুরুষ আধিপত্য, বংশগতির ধারা বজায় রাখার তীব্র মানসিকতা। পরিচালক অন্বিতা দত্ত গুপ্ত সাইকোলজিক্যাল ড্রামা ঘরানার এ ছবির পরতে পরতে গেঁথেছেন অসংখ্য অসংগতি, দিতে চেয়েছেন গভীর কিছু বার্তা।

ছবিটি শুরু হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের তরুণ সংগীতশিল্পী কলার গোল্ডেন ভিনিল পুরস্কারপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। মায়ের মন পেতে এ পুরস্কার অর্জন করতে চেয়েছিল সে। সাফল্যের চূড়ায় বসে যখন কলা পুরস্কার জিতল, তখন মা ছিলেন না তার সঙ্গে। না, কলার মা মৃত নন। মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন তিনি। 

এর পরই আমরা দেখি কলার জীবনের ফ্ল্যাশব্যাক। পুরো ছবিতেই তার অতীত আর বর্তমান জীবন সমান্তরালে চলেছে। আমরা দেখতে পেয়েছি তার আচরণের কারণ, প্রত্যক্ষ করেছি কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জীবনের কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।

হিমাচল প্রদেশের সম্ভ্রান্ত সংগীত পরিবারে জন্ম কলার। জন্মেছিল জমজ ভাইয়ের সঙ্গে, কিন্তু জন্মের পর পরই মারা যায় সে ভাই। কারণ হিসেবে চিকিৎসক কলার মা উর্মিলা মঞ্জুশ্রীকে বলেছিলেন, দুজন জমজ শিশুর মধ্যে একটি বেশি শক্তিশালী হলে অন্যটির ভাগের পুষ্টিও সে নিয়ে নেয়। ফলে দুর্বল শিশুটির পৃথিবীতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। স্পষ্ট করে ছবিতে বলা না হলেও পুত্র সন্তান হারানোর শোক-রাগ-দুঃখ সবকিছুর জন্যই সম্ভবত কলার ওপর রাগ ছিল তার মায়ের। উর্মিলার ইচ্ছা ছিল মেয়ে বাবার মতো পণ্ডিত সংগীতশিল্পী হবে, তাই রেওয়াজে বা গানে কলার সামান্য ভুলও তিনি মেনে নিতে অপারগ ছিলেন। একে তো মেয়ে, তার ওপর মায়ের মনমতো গুণ প্রদর্শনে দক্ষতার অভাবে পদে পদে কলাকে তিরস্কার করেছেন উর্মিলা। আর মায়ের মন পেতে সংগীতশিল্পী হওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে কলা।

অন্যদিকে উর্মিলার পুত্র সন্তানের জন্য তার এতই আকাঙ্ক্ষা ছিল যে একটি সংগীত আয়োজনে পরিচিত হওয়া অনাথ শিল্পী জগনকে পুত্রের মর্যাদা দিয়ে ঘরে নিয়ে আসেন। যে আকাঙ্ক্ষা কলা পূরণ করতে পারেনি, তা জগনের মাধ্যমে পূরণের স্বপ্ন দেখতে থাকেন। অন্যদিকে হঠাৎ করেই জীবনে জগনের উপস্থিতি, তাকে মায়ের পালক পুত্র করে নেয়া, যে ভালোবাসার জন্য কলা লালায়িত তা জগনের ভাগ্যে জুটে যাওয়া কলাকে ক্রমাগত কষ্ট দেয়। এভাবেই বর্তমান আর ফ্ল্যাশব্যাকের আলোয় এগিয়ে চলে কলার গল্প।

এ ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর গান। ‘বিখারনেকা মুঝকো শওক হ্যায় যারা, সামিটেগা মুঝকো তু বাতা যারা’; বরুণ গ্রোভারের লেখা এ দুটি চরণই যেন অনেক কথা বলে যায়। যে কলা মায়ের মন পেতে এতদূর গিয়েছিল, সে কি আদৌ পেয়েছিল তা, আদৌ কি সে নিজেকে গুছিয়ে নিতে পেরেছিল? 

আরেকটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, সেটি হলো ছবির সিনেম্যাটোগ্রাফি। অন্বিতার আগের ছবি ‘‌বুলবুল’-এ‌র মতো এ ছবির চিত্রায়ণেও বিশেষ একটি রঙের প্রভাব চোখে পড়েছে, যা চোখকে আরাম তো দিয়েছেই, সেই সঙ্গে সৃষ্টি করেছে ভিন্ন আবহ। ত্রিশ-চল্লিশের দশকের ঘটনার সঙ্গে মানানসই গল্পের সঙ্গে সেট, পোশাক সবকিছুরই ছিল দারুণ সামঞ্জস্য। উর্মিলা চরিত্রে স্বস্তিকা মুখার্জি, কলা চরিত্রে তৃপ্তি ডিমরির মা-মেয়ের সম্পর্ক ও দূরত্বের উপস্থাপনে দুজন চমৎকার অভিনয় করেছেন। অভিষেক সিনেমায় জগন চরিত্রে ইরফানপুত্র বাবিল খানও মন জয় করেছেন।

কলা আমাদের জানায়, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়ার গুরুত্বের কথা, সন্তানের ওপর নিজের আকাঙ্ক্ষা চাপিয়ে না দিয়ে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে সম্মান দেয়ার কথা। কলার পোস্টারে ইংরেজি ‘কিউ’ অক্ষরটিতে ফুটে উঠেছে নারীকে চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত প্রতীক। কলা নারীর কথা বলেছে, নারীর সঙ্গে নারীর নানা সম্পর্কের কথা বলেছে, কলায় উঠে এসেছে নারীর নানা মনস্তত্ত্ব, যা আমরা দেখতে পাই কলার সঙ্গে তার মায়ের একান্ত সহকারী হিসেবে নারীকে নিয়োগ দেয়ার কিংবা বিখ্যাত পুরুষ সংগীত পরিচালকের বলয় থেকে বেরিয়ে একজন নারীর সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।