রিডলি স্কট গড়ে তুলেছেন ‘এলিয়েন’ ফ্র্যাঞ্চাইজি। এর সর্বশেষ কিস্তি ‘এলিয়েন: রোমুলাস’। তার আগে মুক্তি পাওয়া ‘এলিয়েন: কোভেনেন্ট’ দর্শককে আশাহত করলেও রোমুলাস সে স্মৃতি ভুলিয়ে দিয়েছে। এটি নতুন প্রজন্মকে আবারো পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে এলিয়েন জগতের সঙ্গে।

একদল তরুণ-তরুণী সাহস করে পরিত্যক্ত, জনমানবহীন এক স্পেস স্টেশনে প্রবেশ করে, আবিষ্কার করে অন্ধকারাচ্ছন্ন, বুকে কাঁপন তুলে দেয়ার মতো গা ছমছমে এক পরিবেশ। টের পায়, এ স্পেস স্টেশনে শুধু তারা নয়, আছে অন্য কেউ, অন্য কিছু।

মোটামুটি সংক্ষেপে বললে রোমুলাসের কাহিনী এটুকুই। সর্বপ্রথম এলিয়েন (১৯৭৯) সিনেমা ও এলিয়েনস (১৯৮৬) বা এলিয়েন টুয়ের মধ্যবর্তী সময়ের ঘটনা এটি। কিন্তু তার মানে এই না যে ওই সিনেমাগুলো নতুন দর্শককে দেখে আসতে হবে। এলিয়েন ইউনিভার্স নিয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান না থাকলেও পপকর্ন সঙ্গে করে বসে যেতে পারেন সিনেমাটা দেখতে। তবে যারা এ জগতের পাঁড় ভক্ত, তাদেরও দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

রোমুলাসের প্রতিটা দৃশ্য, ব্যবহৃত সেট, যন্ত্রপাতি—সবকিছুতেই প্রথম এলিয়েন সিনেমার প্রতি নিখাদ ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। সেই আগের সিনেমায় ব্যবহৃত CRT মনিটর, বাটন চেপে কম্পিউটারে কাজ করা (টনি স্টার্ক থাকলে বিরক্ত হতো সন্দেহ নেই!), বিজ্ঞান অফিসার হিসেবে কাজ করা অনুভূতিহীন অ্যান্ড্রয়েড, ফেস-হাগার, জিনোমর্ফ নামের সে নিখুঁত প্রাণী—কী নেই এ সিনেমায়? রোমুলাসের ভুতুড়ে পরিবেশ, পদে পদে টানটান উত্তেজনা আর অস্থিরতা পুরনো দর্শককে আগের সেই এলিয়েন সিনেমার কথা মনে করিয়ে দিতে বাধ্য। অনেক সমালোচক তো এমন রায়ও দিয়েছে যে বছরের সেরা হরর সিনেমা এটি!

এলিয়েন: রোমুলাসের গল্প একদল তরুণ-তরুণীকে কেন্দ্র করে হলেও মূল চরিত্র হিসেবে আমরা দেখতে পাই দুজনকে, রেইন আর তার ভাই অ্যান্ডি। অ্যান্ডি অবশ্য মানুষ নয়, সে কিন্তু অ্যান্ড্রয়েড; তবে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় শিশুর মতো আচরণ করে সে। রেইনের বাবা অ্যান্ডিকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করে দিয়েছিলেন, যাতে সে রেইনকে নিরাপদে রাখে সবসময়। রেইন তার ভাই অ্যান্ডিকে নিয়ে নতুন এক বাসস্থান খুঁজে বেড়াচ্ছিল, পালাতে চেয়েছিল তাদের বর্তমান বাসের অযোগ্য গ্রহ থেকে। রোমান মিথোলজি অনুযায়ী, রোমের প্রতিষ্ঠাতা দুই ভাই ছিল রোমুলাস আর তার ভাই রেমাস। তারাও নতুন এক বাসস্থানের খোঁজে নিজেদের জন্মস্থান থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। হয়তো এ কারণেই এলিয়েন ফ্র্যাঞ্চাইজির এ সিনেমার নাম দেয়া হয়েছে এলিয়েন: রোমুলাস। একই সঙ্গে রেনেসাঁ নামের সেই স্পেস-স্টেশনে দুটো ল্যাবরেটরি ছিল দুপাশে—রোমুলাস আর রেমাস।

‘রেইন’ চরিত্রে অভিনয় করা কেইলি স্পেইনি দর্শকের কাছে বাহ্বা পেলেও সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছেন ‘অ্যান্ডি’ চরিত্রে অভিনয় করা ডেভিড জনসন। মুহূর্তের মধ্যে শিশু থেকে পরিণত, পরিণত থেকে মায়া-দয়াহীন অনুভূতিশূন্য এক রোবটে পরিণত হওয়া—সিনেমাজুড়ে মনে হয়েছে তাকে যেন একই সঙ্গে তিন-চারটা চরিত্রের অভিনয় করতে হয়েছে এবং সেটায় সে সফল। সাধারণত তরুণ-তরুণীদের কেন্দ্র করে যেসব হরর সিনেমা তৈরি হয়, সেসবে কিছু উচ্ছৃঙ্খল আর একগুঁয়ে চরিত্র থাকে, যাদের সিদ্ধান্তের ভুলের কারণেই সিনেমাগুলো এগিয়ে যেতে থাকে। এলিয়েন রোমুলাসেও এর ব্যতিক্রম হয়নি, কয়েকটা চরিত্রের ক্ষেত্রে তো আপনি নিজেই ক্ষেপে গিয়ে বলতে শুরু করবেন, জিনোমর্ফ ওদের ধরছে না কেন?

ডিরেক্টর ফেডি আলভারেজ নাকি সিনেমাটা বানানোর পর সবার আগে রিডলি স্কটকে দেখিয়েছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে রিডলি স্কট জানিয়েছেন, সেটাকে তার খুব বেশি দীর্ঘ মনে হয়েছিল। এরপর সম্পাদনা হয়ে বর্তমান চেহারা পেয়েছে।

এলিয়েন ফ্র্যাঞ্চাইজি অনেক ভিডিও গেমের জন্ম দিয়েছে, বেশির ভাগই গেমারদের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়নি। তবে ‘এলিয়েন: আইসোলেশন’ এর ব্যতিক্রম। সারভাইভাল জনরার এ হরর গেমটা খেলার সময় এমন মুহূর্তও এসেছে, যখন মনে হবে বুকের খাঁচা থেকে কিছু একটা বেরিয়ে আসতে যাচ্ছে আপনার! বোদ্ধারা সবাই এ বিষয়ে একমত। আইসোলেশন এ ফ্র্যাঞ্চাইজির শ্রেষ্ঠ গেম। কেন এ গেমের কথা তুললাম? কারণ এলিয়েন: রোমুলাসের পরিবেশ, দমবন্ধ করা টানটান উত্তেজনাময় পরিস্থিতি, মোড়ে মোড়ে আতঙ্ক—সবই এর মধ্যে পাবেন। যদি সিনেমাটা দেখার পরও সাধ না মেটে, তবে গেমটা খেলে দেখতে পারেন।

সিনেমাবোদ্ধা ও এলিয়েন ফ্র্যাঞ্চাইজিপ্রেমীরা একটা বিষয়ে একমত, অনেক দিন পর কোনো এলিয়েন সিনেমা হরর সিনেমার সিংহাসনে বসার সুযোগ পেয়েছে। ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে এর সামনে? ‘প্রমিথিয়াস’ ও ‘কোভেনেন্ট’-এর সঙ্গে জোড়া লাগার কোনো সম্ভাবনা আছে? পুরনো কোনো চরিত্রকে কী আমরা দেখতে পাব সামনে? কে জানে। ভবিষ্যৎই এর উত্তর দেবে।

সিনেমাটা হয়তো জেনোমর্ফদের মতো নিখুঁত কোনো ‘সিনেমা’ হতে পারেনি, কিন্তু এটুকু জোর দিয়ে বলা যায়, ১৯৮৬ সালের পর এলিয়েন ফ্র্যাঞ্চাইজির নিখুঁতের কাছাকাছি যদি কোনো সিনেমা বের হয়ে থাকে, তবে সেটি হলো এলিয়েন: রোমুলাস। জেনোমর্ফরা যেভাবে বারবার নতুন করে জন্ম নিতে নিতে নিখুঁত সত্তায় পরিণত হয়, বলা যায় না, রোমুলাস হয়তো নিখুঁত সে সত্তার আগের ধাপ।