ভারতের প্রকৃতি ও মনুষ্য বৈচিত্র্যের ভূমি পাঞ্জাব। ফসলের জন্য এ অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার পাশাপাশি দেশভাগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অঞ্চলটি। কিন্তু কেবল ফসল, মানুষ আর পার্টিশন নয়, সংগীতেরও ভূমি পাঞ্জাব। ভারতের শাস্ত্রীয়সংগীতের সবচেয়ে পুরনো উৎসব হরবল্লভ সংগীত সম্মেলন আয়োজিত হয় পাঞ্জাবে। কণ্ঠসংগীতের দুটো ঘরানা তৈরি হয়েছে এখান থেকে। পাঞ্জাবের সংগীতে একদিকে আছে ধ্রুপদের প্রভাব, অন্যদিকে লোকগানে আছে রাগদারীর ছোঁয়া। তবু জনপ্রিয় ধারায় পাঞ্জাবী সংগীত মানেই ‘বল্লে বল্লে’ আর বলিউডি ‘ভাঙরা’। পাঞ্জাবের সংগীতের সমৃদ্ধি নিয়ে তাই এ ক্লিশে বয়ানের বাইরে কিছু পাওয়া যায় না।
পাঞ্জাবের দেড়শ বছরের ইতিহাসে নানা ধরনের পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তিত হয়েছে এর সংগীতও। শুরুটা হয়েছিল মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের দরবারে। তার শাসনকালে একদিকে মোগল, অন্যদিকে ব্রিটিশ ও উত্তরে আফগান, তুর্কমান ও পারস্যের সংগীত এসে মিশেছিল পাঞ্জাবে। মোটামুটি দেশভাগের আগ পর্যন্ত ছিল এ অবস্থা। রণজিৎ সিংয়ের জনপ্রিয়তা প্রয়োজন ছিল। অন্যান্য রাজা, মহারাজার মতো তিনিও তাই শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তার লাহোর দরবার তাই হয়ে উঠেছিল নাচ, গান, চিত্রকর্ম ইত্যাদির মিলনস্থল। দরবারে ‘আমাজোনিয়া’র একটি নাচের দল ছিল।
সম্প্রতি রাধা কাপুরিয়া তার বই ‘মিউজিক ইন কলোনিয়াল পাঞ্জাব: কোর্টেসানস, বার্ডস অ্যান্ড কনোসারস, ১৮০০-১৯৪৭’-এ পাঞ্জাবের সংগীত নিয়ে লিখেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, রণজিৎ সিংয়ের সময়কার দৈনিক ঘটনাবলি লেখকরা লিখেছেন, আত্তার খান নামে এক বাদকের বাঁশি পছন্দ করতেন রণজিৎ। এছাড়া গাকার গোত্রের সূচনাকারী বাহরাম খানও ছিলেন তার দরবারি। বাহরাম খানের উপাধি ছিল ‘আল্লামা আবুল-আওয়ান-এ-আরাব-এ-ইলম-এ-মওসিকি’। অর্থাৎ সংগীতে যার প্রতিভা ছিল অসামান্য। বাহরাম খান পরে জয়পুরে যান ও সেখানে গোকি বাইকে গান শেখান। পাতিয়ালা ঘরানার গায়িকা ছিলেন গোকি।
রণজিৎ সিংয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় তার দরবারে লোকগান, কাওয়ালি ও সুফি ধারার গান গাওয়া হতো। কিন্তু সে গান দরবারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গানগুলো গাওয়া হতো নানা মেলা, গুরবানি ও সুফিদের মাজারেও। কাওয়ালির অন্যতম কেন্দ্র হয়েছিল পাঞ্জাব। এছাড়া পাঞ্জাব বহু সুফি সাধকের কারণে তাদের গুণ ও সুফি গানের ভূমি হয়ে উঠেছিল। এদের মধ্যে আছেন ফরিদ উদ্দিন গঞ্জশক্কর ও বুল্লে শাহ। বিশেষত বুল্লে শাহ পাঞ্জাবে খুবই জনপ্রিয়। এখনো তার লেখা কবিতা থেকে পাঞ্জাবি গান তৈরি হয়। বুল্লে শাহর গানগুলো ছিল কাফি ঘরানার। এখানে একজন মুর্শিদ (গুরু) ও তার মুরিদের (শিষ্য) মধ্যে কথোপকথন বা নির্দেশনার কথা গানে আছে।
বাবা ফরিদ লিখেছিলেন,
কাগা কারাঙ ধাদোলিয়া সালগা খাইয়ো মাস
অ্যায় দো ন্যায়না মাত চুচো পির দেখান কি আঁস
এ অর্থ দাঁড়ায়, ‘কাক তুমি এসে আমার কংকালের ওপর থেকে ঠুকরে সব মাংস খাও/ এ দুই নয়ন ছুঁয়ো না শুধু আমার পিরকে দেখতে দাও’।
পরবর্তী সময়ে এ কবিতা থেকে স্টেজ এমনকি সিনেমায় গান তৈরি হয়েছে। ২০১৩ সালে এআর রহমানের সুরে রকস্টার সিনেমায় মোহিত চৌহান গেয়েছেন, ‘কাগা রে কাগা রে মোরি ইতনি আরাজ তো সে চুন চুন খাইয়ো মাস/ আরজিয়া রে খাইয়ো না দো ন্যায়না মোহে পিয়া কি মিলান কি আঁস।’ এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশে এন্ড্রু কিশোর গেয়েছিলেন, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি/ এই চোখ দুটো মাটি খেয়ো না। আমি মরে গেলেও তারে দেখার সাধ মিটবে না গো মিটবে না।’
এ প্রভাবের বাইরে পাঞ্জাবের সংগীত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাধা কাপুরিয়া বলেছেন, সে সময় কেবল দরবার নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও সংগীতের সমঝদারি ছিল। তিনি লিখেছেন, ‘নিশ্চিতভাবেই রাগদারী একটি অভিজাত ঘরানা, কিন্তু পাঞ্জাবের সাধারণ মানুষের মধ্যে এটিকে অনুভব করার মানসিকতা ছিল। কেবল দরবারের শিল্পী, বাইজিরাই নয়, ১৮৭৫ সাল থেকে হরবল্লভ উৎসবে সাধারণ মানুষও অংশ নিত। সংগীত শোনার মতো সংবেদনশীল কান তাদের ছিল।’
তাহলে সে পাঞ্জাবের সে সংগীত হারিয়ে গেল কেন? এ কথার প্রথম উত্তর হলো পঞ্জাবের সংগীত হারায়নি। কেবল জনপ্রিয় ধারায় আলোচিত হয় না। না হারানোর প্রমাণ হলো কাফি ঘরানার গান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এখনো কোক স্টুডিও পাকিস্তানে গান তৈরি হয়। কিন্তু জনপ্রিয় ধারায় আলোচনা না হওয়ার কারণ বিংশ শতাব্দীতে এক ধরনের হাইব্রিড সংস্কৃতি তৈরি হওয়া। ১৯২০ সালের পর থেকে সংগীতকাররা সংগীতের মূল থেকে সরে যেতে শুরু করেন। এরপর ১৯৪৭-এর দেশভাগের কারণে বহু শিল্পী ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে যান। ফলে পাঞ্জাবি সংগীতের ধারাটি কোনো না কোনোভাবে পাকিস্তানে ভালোভাবে আছে। ভারতে তৈরি হয়েছে মিশ্র ও নকল একটি ধারা।
বলিউড বরাবরই বিভিন্ন বিষয়ে ‘টাইপড’ ধারার উপস্থাপনায় বিশ্বাসী। বাণিজ্যিক ধারার জন্য এটিই লাভজনক। এছাড়া ‘পাঞ্জাবি’ বোঝাতে পাঞ্জাবি পোশাক, মাথায় পাগড়ি আর হাতে লাঠি দিয়ে ভাঙরা করানো দর্শকের কাছে পৌঁছার পথটা সহজ করে দেয়। কাবুলিওয়ালাদের উপস্থাপনারও এমন একটি মুখস্থ ধারা বাংলা সাহিত্যে ও ভারতের জনপ্রিয় ধারায় আছে। আর পাঞ্জাবের গানের ক্ষেত্রেও ক্যাসেট যুগে দালের মেহেন্দি ও তার ধারার হালকা গান জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ‘তুনাক তুনাক তুন’ ধারার গানকে ধরে একটু মজাদারভাবে উপস্থাপন করা হয় সিনেমায়। ফলে দর্শককে নতুন স্বাদ দেয়ার পাশাপাশি পাঞ্জাবের দর্শক ধরাও সহজ হয়।
এতে পাঞ্জাবি সংগীতের খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। তবে মূলধারার জনপ্রিয় গানের কারণে একটু একটু করে নেপথ্যে চলে যাচ্ছে পাঞ্জাবি শাস্ত্রীয় সংগীত। তবে এর মধ্যেই আবিদা পারভীন, আবরার উল হক, আতাউল্লাহ খান এশাকালভী, ওস্তাদ আতাউল্লাহ খান ও ওস্তাদ হামিদ আলী খানের মতো বহু গায়ক পাঞ্জাবি শাস্ত্রীয় সংগীতকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
স্ক্রল ডট ইন অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান










