অনেকদিন আগেই মুক্তি পেয়েছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি। সিনেমাটির নামেই আছে এর গল্প—কিছুটা জীবন আর কিছুটা ফিকশন। এ সিনেমার অনেক কিছুই নতুন বা প্রথম বলা যেতে পারে। যেমন ফারুকীর প্রথম অভিনয়, ওটিটিতে মুক্তি, তিশার সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার ইত্যাদি। সেসব বাদ দিয়ে সিনেমার মূল গল্পের দিকে তাকালেও মনে হয় ফারুকী নিজের নির্মাণের ধারায়ও নতুন কিছু আনতে চেয়েছেন। প্রথমেই সেখানে গল্পের বিষয়টা থাকে। এরপর আসে অন্যান্য আলাপ। ফারুকী তার অন্যান্য সিনেমার গল্পে যে হাস্যরস ও সমাজচিত্র রাখেন, সেখান থেকে সরে এসে এ সিনেমার পুরোটাই এক দম্পতি ও তাদের পারিপার্শ্বে সীমাবদ্ধ করেছেন।
সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি শুরু হয় তিশার বিদেশ সফর থেকে। বাস্তব জীবনের মতো এখানেও তিশা অভিনেত্রী ও ফারুকী পরিচালক বা নির্মাতা। সিনেমার শুরুতেই বোঝা যায়, তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা খুব ভালো। কিন্তু সে বোঝাপড়া এরপর কোথায় যাবে, তা নিয়ে দর্শকের চিন্তা জাগবে। এরই মধ্যে দেখা যায়, দেশের বাইরে থাকা তিশার সঙ্গে একটা ঘটনা ঘটে। তার ব্যাগ ছিনতাই হয়। কিন্তু সেখানেই দেশীয় আরেক প্রবাসী ব্যক্তি তিশার ব্যাগ উদ্ধার করার পাশাপাশি জানায়, সে অভিনেত্রীর একজন ভক্ত। এর পরই আসে আরেকটি বিষয়। সে ব্যক্তি জানায়, প্রিয় অভিনেত্রী সন্তান ধারণ না করায় তার অভিযোগ আছে। এখান থেকেই শুরু হয় অটোবায়োগ্রাফির আরেকটি দিক।
সিনেমা বা সেলিব্রিটি জীবনের অনেক কিছুই বিব্রতকর। মানুষ তাদের দেখে নানাভাবে। তারা কখনো কখনো মনে করে, সেলিব্রিটিরা নিজ জীবনযাপন করবেন ভক্তদের হিসেবে। আজকের দিনে এসে মানুষ যখন পরমতসহিষ্ণুতা থেকে লিবালিজমের দিকে যাচ্ছে সে সময়ও তারকাদের শুনতে হয় নানা কথা। বাস্তব জীবনে আমরা এ চিত্র দেখি নানা সময়। অভিনেতা থেকে ক্রিকেট তারকাদের ছবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকে নানা কমেন্ট। সে রকম একটি বিষয়কেই সামনে এনেছেন ফারুকী। বুঝতে সমস্যা হয় না, এটা তার জীবন থেকেই নেয়া। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত এ ঘটনা ঘটছে আমাদের চারপাশে।
সিনেমার এ বিষয়গুলোর পাশে আসে দম্পতি হিসেবে এক নির্মাতা ও অভিনেত্রীর জীবন। তাদের কর্মব্যস্ত জীবনে দাম্পত্য কেমন করে কাটে, সে চিত্র দেশীয় দর্শকের উপযোগী করে তুলে ধরেছেন ফারুকী। তিনি কোনো অন্তরঙ্গ দৃশ্য রাখেননি, কিন্তু সম্পর্কের রসায়ন বোঝাতে ব্যবহার করেছেন সংলাপ, মুখোমুখি দৃশ্য। এছাড়া সিনেমায় সেট ডিজাইন ও আলোর ব্যবহার ভালো লাগার মতো। আনন্দ ও বিষণ্নতা প্রকাশে তিনি ভিন্ন রকম আলো ব্যবহার করেছেন।
এ সিনেমার প্রধান একটি বিষয় বাস্তবতা। সিনেমার দুটি চরিত্র সেলিব্রিটি হলেও তারা এ শহরেই মোটামুটি সাধারণ জীবনযাপন করেন। সে জায়গা থেকে ফারুকী হয়তো দর্শককে বোঝাতে চান, তারকারাও আর দশজনের মতো সাধারণ মানুষ। তাদেরও আছে সাধারণ জীবনযাপন। এর মধ্যেই কিছুটা সমাজ সচেতনতার কাজও করেছেন নির্মাতা। সন্তান গ্রহণজনিত সমস্যার বেশকিছু বিষয় তুলে এনেছেন। এখনো আমাদের দেশে সিনেমা বা নাটকে এগুলো নিয়ে স্পষ্ট করে তেমন কথা হয় না। ফারুকী বলতে চেয়েছেন।
তিশা ও ফারুকীর পাশাপাশি এ সিনেমায় ছিলেন ডলি জহুর, ইরেশ যাকের, শরাফ আহমেদ জীবন, মনোয়ার হোসেন ডিপজল প্রমুখ। অভিনয়ের ক্ষেত্রে বলতেই হয়, প্রথমবার ক্যামেরার সামনে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বেশ ভালো কাজ করেছেন। কিন্তু তিশার অভিনয়গুণ ও পেশাদারত্বের কারণে তিনিই অনেকটা সময় দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখেন। এর মধ্যে ইরেশ যাকের রঙ্গভূমিতে এলে দর্শকের বিচিত্র অনুভূতি আসতে পারে, কেননা তার চরিত্রটিই সে রকম। তাকে ভালো লাগার কোনো কারণ নেই, আবার খারাপও লাগে না। এর মধ্যে একটি দৃশ্য অকারণ রেখেছেন ফারুকী, না রাখলেও চলত। মনোয়ার হোসেন ডিপজল তার নিজের চরিত্রে সাবলীল। এ রকম চরিত্র করে তিনি অভ্যস্ত।
সন্তান গ্রহণের শারীরিক জটিলতা, রাজনীতিবিদের পাওয়ার প্র্যাকটিস, নতুন বছরে অকারণ শব্দদূষণ ও তারকা জীবনের গোপনীয়তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মানসিকতা ইত্যাদি বিষয় ছুঁয়ে যাওয়া ফারুকীর এ সিনেমা অবসরে একবার দেখার মতো। কতটা সিনেমা হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে তর্কে না গিয়ে বলা যায় বহুল আলোচিত ‘শনিবার বিকেল’-এর তুলনায় অটোবায়োগ্রাফি এগিয়ে থাকবে।










