চলে গেলেন বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি নায়ক ফারুক। ১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট মানিকগঞ্জে তার জন্ম। মারা গেলেন গতকাল (১৫ মে, ২০২৩)। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন তিনি এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ২০২১ সালে তিনি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সিঙ্গাপুরে গেলে তার রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর সেখানে চিকিৎসা করানোর সময় তার মস্তিষ্কেও সংক্রমণ ধরা পড়ে। নিয়মিত চিকিৎসা নেয়ার মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।
চিত্রনায়ক ফারুকের ভালো নাম আকবর হোসেন পাঠান হলেও দর্শকের কাছে তার পরিচয় ফারুক নামেই। এছাড়া চলচ্চিত্র জগৎ ও দর্শকের কাছে তার পরিচিতি মিয়া ভাই। এ নামে তার একটি সিনেমা আছে। সত্তরের দশকে সিনেমা অঙ্গনে এসে তিনি বাংলাদেশের সিনেমায় নিজের স্থান তৈরি করেছিলেন তার স্বকীয়তা ও নিজস্ব অভিনয় দক্ষতা দিয়ে। ফলে তার অভিনীত সিনেমাগুলো একদিকে দর্শকনন্দিত ও অন্যদিকে ব্যবসায়িক সফলতাও পায়।
ফারুক চলচ্চিত্রে এসেছিলেন ১৯৭১ সালে। এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’তে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন কবরী। ১৯৭৩ সালে খান আতাউর রহমানের পরিচালনায় তিনি অভিনয় করেন ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সিনেমায়। এ সিনেমা ও এরপর নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ সিনেমায় ববিতার বিপরীতে দেখা যায় তাকে। সিনেমা দুটো এখনো বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে প্রশংসিত। ১৯৭৫ ও ১৯৭৬ সাল ফারুকের জন্য বিশেষ হয়ে উঠেছিল। অনেক সময় এমন হয়, একটি সিনেমা বা একটি চরিত্র একজন অভিনেতার নাম তৈরি করে দেয়। ফারুকের জন্য এমন একটি সিনেমা ছিল ‘সুজন সখী’। প্রমোদ কর পরিচালিত সিনেমাটিতে কবরীর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন ফারুক।
সুজন সখীতে সুজনের চরিত্রটি ফারুককে একটি নাম তৈরি করে দেয়। এরপর লাঠিয়ালে দুখু মিয়া, নয়নমণিতে নয়ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। নয়নমণি পরিচালনা করেছিলেন আমজাদ হোসেন। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে নয়নমণি একটি কাল্ট তৈরি করে দিয়েছিল। এরপর আরেকটি বড় সিনেমা ছিল আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সারেং বৌ’। সিনেমায় তিনি কদম সারেং চরিত্রে অভিনয় করেন। শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস থেকে নির্মিত সিনেমাটি আজও বাংলাদেশের দর্শকের কাছে প্রিয়। এরপর তিনি অভিনয় করেছিলেন আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমায়।
অভিনেতা ফারুকের অভিনয় জীবনে একটা প্যাটার্ন দেখা যায়। আশির দশকের পর তিনি নানা ধরনের সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা ছিল। সব সিনেমা যে মানের দিক থেকে ভালো ছিল তা বলা যাবে না। তবে এসবের মধ্যেই তিনি বেছে বেছে কিছু সিনেমায় অভিনয় করতেন। এর মধ্যে খান আতাউর রহমান, চাষী নজরুল ইসলাম ও আমজাদ হোসেনের সিনেমায় তাকে একাধিকবার দেখা গেছে। চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় অভিনয় করেছিলেন ‘মিয়া ভাই’ সিনেমায়। ১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি তাকে
একটি নতুন নাম দিয়েছিল। আবার চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায়ই অভিনয় করেন ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’য়। সামাজিক গল্পের সিনেমাটি ওই বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়।
১৯৯৭ সালে খান আতাউর রহমানের পরিচালনায় আবার ফেরেন ফারুক। সিনেমার নাম ‘এখনো অনেক রাত’। সিনেমাটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর দেশের পরিস্থিতির ওপর নির্মিত। এখনো অনেক রাত খান আতা নির্মিত সর্বশেষ সিনেমা। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পেলেও এর কাজ শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। শুটিং হয়েছিল এফডিসি ও পাবনা মানসিক হাসপাতালে।
ফারুক বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম রোমান্টিক নায়ক। তার প্রমাণ সুজন সখী, নয়নমণি, সারেং বৌ প্রভৃতি সিনেমা। এর বাইরে এক সময় তিনি ভিন্ন ধারার চরিত্রেও এসেছেন। নিজেকে নিয়ে একটা সময় এক্সপেরিমেন্ট করেছেন ফারুক। গোলাপী এখন ট্রেনে ও এখনো অনেক রাত সিনেমা দুটোর উদাহরণ দেয়া যায়। আবার অভিনেতা হিসেবে কাজ করার যাত্রায় এমন অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছেন যা হয়তো এখনই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
সে যা-ই হোক, নিজের সময়ে ফারুক ছিলেন অন্যতম ব্যস্ত, জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান অভিনেতা। অভিনয় জীবনে তিনি কবরী, ববিতা, রোজী সামাদ, অঞ্জনা, সুচন্দা, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, সুচরিতা প্রমুখের বিপরীতে অভিনয় করেছেন। সহঅভিনেতা হিসেবে পেয়েছেন আনোয়ার হোসেন, আলমগীর, প্রবীর মিত্র, বুলবুল আহমেদ, এটিএম শামসুজ্জামানসহ বহু গুণী অভিনেতাকে। কেবল তার সময়ের নয়, পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেতা, অভিনেত্রী ও নির্মাতাদেরও অনুপ্রাণিত করেছেন তিনি।
চিত্রনায়ক ফারুকের প্রয়াণে তার সহকর্মী ও শিল্পীরা তাকে নিয়ে নানা স্মৃতিচারণ করেছেন। এর মধ্যে অঞ্জনা রহমান লিখেছেন, ‘চলে গেলেন আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি চিত্রনায়ক আমার অসংখ্য সুপার বাম্পারহিট চলচ্চিত্রের জননন্দিত মাটি ও মানুষের সফল চিত্রনায়ক ফারুক ভাই। অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কত মধুময় স্মৃতি যা ভেবে চোখ বারবার অশ্রুসিক্ত হয়ে যাচ্ছে, কান্নায় বুক ভার হয়ে যাচ্ছে। ফারুক ভাই আপনি বেঁচে থাকবেন আপনার অনবদ্য শ্রেষ্ঠ কর্মের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রের স্বপ্নীল আকাশে কোটি দর্শকের হৃদয়ে অনন্তকাল।’
সুবর্ণা মুস্তাফা লিখেছেন, ‘আমাদের ফারুক ভাই...আপনি থাকবেন আমাদের হৃদয়ে, আমাদের ভালোবাসায়, আমাদের শ্রদ্ধায়। ফারুক ভাইয়ের আত্মার শান্তি কামনা করছি।’ এছাড়া তার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, বিজরী বরকতউল্লাহ, সাকিব খান প্রমুখ। চিত্রানায়ক ফারুক সম্পর্কে ওমর সানির কথা হয় বণিক বার্তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ফারুক ভাইয়ের সোজাসাপ্টা কথা বলার ধরনটা আমার ভালো লাগত। তার নয়নমণির রিমেকের পরিকল্পনা হলে আমাকে সেখানে কাস্ট করার কথা হয়েছিল। ‘ঢাকাইয়া ভাষায় আমাকে বলেছিলেন, ‘‘আরে কী অইচে? করো মিয়া।’’ কিন্তু তিনি এত বড় মাপের অভিনেতা, তার মতো অভিনয় আমি করতে পারব বলে মনে করিনি। তিনি আজ নেই। দোয়া করি আল্লাহ তাকে জান্নাত নসিব করুন।’










