আগ্নেয়াস্ত্র হলিউডের বেশির ভাগ ব্লকবাস্টার ছবির অপরিহার্য অংশ। হলিউডের অনেক সমালোচক বলেন, এটা দর্শকদের চাহিদা দিয়ে পরিচালিত হওয়ার মতো ব্যাপার।

সম্প্রতি হলিউডের ছবি রাস্টের সেটে অভিনেতা অ্যালেক বাল্ডউইনের হাতে থাকা বন্দুকের গুলিতে নিহত হয়েছে তরুণ সিনেমাটোগ্রাফার হ্যালেইনা হাচিনস। এ ঘটনায় দুনিয়ার নানা প্রান্তের সিনেমাপ্রেমীরা মর্মাহত হয়েছেন। আর এ ট্র্যাজেডি হলিউডে উসকে দিয়েছে অনেকগুলো বিতর্ক। একটি হলো শুটিং সেটে সত্যিকার আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ মেক্সিকোর জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, যদি হলিউডে সত্যিকার আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ না হয় তাহলে তারা ব্যবস্থা নেবেন। অন্য বিতর্কটি আরো গভীর, বিস্তৃত ও তাত্পর্যপূর্ণ—হলিউডের সিনেমায় বন্দুকযুদ্ধের দৃশ্যের আধিক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সমালোচকরা বলছেন, পর্দায় বন্দুক সহিংসতার দৃশ্যের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে সমাজে। ভ্যারাইটির কনটেন্ট বিশেষজ্ঞ স্টিভেন গেডোস মনে করেন, বড় পর্দায় বন্দুকযুদ্ধের দৃশ্য বাড়ছে: ‘প্রযোজক হিসেবে আপনি যদি কোনো টাকা ঢালেন, তাহলে দেখতে পাবেন হরর, বন্দুক নয় সুপারহিরোদের দিয়ে হত্যার দৃশ্য না থাকলে সে ছবি নিয়ে কেউ এগোতে রাজি নন।’ বিষয়টি যে আবার শুধু হলিউডের ইচ্ছাই প্রাধান্য পাচ্ছে এমনটা নয়: ‘কম্পিউটার প্রযোজকদের মুনাফা আনার জন্য যে পরামর্শ দেয় তাতেই এ প্রাধান্যের বিষয়টি থাকে আর সেটা হচ্ছে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে তা দর্শক পর্দায় দেখতে পছন্দ করে।’

জেমস বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজির বড় আকর্ষণ এর সহিংসতা-মারামারির অ্যাকশন দৃশ্য। অনানুষ্ঠানিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জেমস বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজিতে খুনোখুনির সংখ্যা বাড়ছে। নো টাইম টু ডাইয়ের আগের একটি হিসাব বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এ ছবির আগে ড্যানিয়েল ক্রেগ যে কয়টি ছবিতে বন্ড হয়েছেন, সেগুলোতে পর্দায় মোট হত্যার দৃশ্য ছিল ২৩৫টি। অন্যদিকে ক্রেগের চেয়ে দুটি বেশি বন্ড ছবিতে কাজ করেছেন রজার মুর, সেগুলোতে মোট হত্যার সংখ্যা ১২১। বৃদ্ধির হারটা যে বিরাট তা এ পরিসংখ্যান থেকে সহজেই বোঝা যায়। ক্রেগের বন্ড মুভিগুলোর প্রতিটিতে বড় পর্দায় গড় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৫৯টি, সেখানে পিয়ার্স ব্রসনানের ছবিতে ২৬ এবং তাদের আগে রজার মুরের ক্ষেত্রে ১৭ ও শন কনোরির ১১। অর্থাৎ ২০০০ সালের পরের বন্ড ছবিগুলোতে সহিংসতার মাত্রা অনেক বেড়েছে।

শুধু বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজি নয়, হলিউডের সিনেমায় সহিংসতার দৃশ্য ১৯৫০ সালের তুলনায় এখন দ্বিগুণের বেশি। ১৩ বছরের বেশি বয়সের শিশুরা যেসব ছবি দেখতে পারে সেগুলোতে সহিংসতা ১৯৮৫ সালের তুলনায় বেড়েছে তিন গুণ। ২০১৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব শিশু আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার আছে এমন ছবি দেখেছে তাদের আচরণ যারা দেখেনি তাদের তুলনায় আক্রমণাত্মক এবং তারা সহসাই বন্দুক চালানোর ভঙ্গি নকল করে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনও বহু আগে এ বিষয়ে মত প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতার যে ঘটনা ঘটে সেগুলোর পেছনে অনেকে হলিউডের ছবিতে দেখানো সহিংসতার দৃশ্যের সম্পর্ক খোঁজেন।

তবে এতকিছুর পরও হলিউডের বড় তারকা ও অভিনেতাদের অনেকেই বড় পর্দার সহিংসতাকে নিরুৎসাহিত করতে রাজি নন। ২০১৩ সালে আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার বলেছিলেন, পর্দার বন্দুকযুদ্ধ-সহিংসতার বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করা উচিত। বাস্তব দুনিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে গোলাগুলির যে সহিংসতা তার সঙ্গে হলিউডের ছবিকে সম্পর্কযুক্ত করাটা তার মতে যথাযথ নয়। শোয়ার্জনেগারের কথায়, ‘আমাদের মনোযোগ দেয়া উচিত কীভাবে আমরা মানসিক অসুস্থতাকে মোকাবেলা করব, কীভাবে বন্দুক আইন নিয়ে কাজ করব কিংবা সন্তানদের দেখাশোনা করব।’ এজন্য হলিউডের ছবিকে দায়ী করতে শোয়ার্জনেগার মোটেও রাজি নন।

হলিউডের পরিচালক কোয়েন্টিন টারান্টিনোর ছবিতে সহিংসতার দৃশ্যের ছড়াছড়ি দেখা যায়। তিনিও বলেন, বিষয়টা অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২০১৩ সালে ওবামা যখন বন্দুক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তখন হলিউডের অনেক প্রভাবশালী সদস্য তখনকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা ছবির কনটেন্ট নিয়ে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ মানতে নারাজি জানান।

বন্দুক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মিস স্লোয়ান নামে একটি ছবিও নির্মিত হয়েছিল কয়েক বছর আগে, কিন্তু বক্স অফিসে সাফল্য পায়নি। স্টিভেন গেডোস তাই বলেছেন, সহিংসতার প্রতি দর্শকদের আকর্ষণকে মাথায় রেখেই ছবি নির্মিত হচ্ছে। জন উইক সিরিজ থেকে স্কুইড গেম—সবই দর্শকদের জন্য।

 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান