যশোরের শার্শায় আফিল জুট মিলে গত ২৬ নভেম্বর আগুন লাগে। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান। এতে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে জানান আফিল গ্রুপের পরিচালক মাহবুব আলম লাভলু।
শুধু আফিল জুট মিল নয়, গত তিন বছরে যশোরে ৮২৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৪৬ লাখ টাকার। যশোর ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল ২৬১টি। যার আর্থিক ক্ষতি ছিল ২ কোটি ৬৯ লাখ ৭১ হাজার ৬৮৭ টাকা। ২০২১ সালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল ২৪৬টি। আর্থিক ক্ষতি ছিল ৫ কোটি ৭৬ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ টাকা। গত বছর যশোর জেলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ৩২২টি। যাতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল ২ কোটি ১১ হাজার টাকা। কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও ঘনবসতি এলাকায় বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আবার কিছু বহুতল ভবনেও আগুন লাগছে। তবে এসব বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণের সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের। কেননা বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণের জন্য যে টার্ন টেবল লেডার (টিটিএল) গাড়ি প্রয়োজন, সেটি তাদের নেই। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ও পানিস্বল্পতা অগ্নিনির্বাপণে বড় অন্তরায় হয়ে উঠছে বলে মত দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা। তাদের মতে তিন বছরে জেলায় শতাধিক পুকুর বা জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। এতে পানিস্বল্পতা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
যশোর পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ সাজিয়া সুলতানা জানান, তিন বছরে আড়াই শতাধিক ভবন অনুমোদন দিয়েছেন তারা। ছয় তলা পর্যন্ত ভবন অনুমোদন দিয়ে থাকে পৌরসভা। সেখানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে কী পরিমাণ পুকুর বা জলাশয় ভরাট হচ্ছে তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। কেননা রাতারাতি অনেকে পুকুর ভরাট করে ফেলা হয়েছে। পুকুর ভরাট করতে হলে অবশ্যই পৌরসভার অনুমোদন লাগবে বলে জানান পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফ হাসান। কেউ অনুমোদনবিহীন জলাশয় ভরাট করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে যশোর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সহকারী পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, ‘তিন বছরে যশোরে ৮২৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ১০ কোটি ৪৬ লাখ ১৪ হাজার ৪৮৭ টাকা। যেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে সেখানে আমরা ছুটে যাই। তবে শহরের বড় বাজার, কালেক্টরেট মার্কেটসহ অনেক বহুতল ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ঘনবসতি এলাকায় আমাদের গাড়ি প্রবেশ করতে পারেনি। বিকল্পভাবে যেতে হয়, তখন ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়। আগুন নেভানোর জন্য আমাদের গাড়িতে যে পরিমাণ পানি থাকে তা দিয়ে চেষ্টা করা হয়। তবে গাড়ির পানি ফুরিয়ে গেলে পানি পাওয়া যায় না। তিন বছরে জেলায় শতাধিক পুকুর বা জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে বলে জেনেছি। এটা আমাদের জন্য অশনি সংকেত। কেননা এভাবে পুকুর ভরাট হয়ে গেলে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে সেটা সামাল দেয়া কষ্টকর ব্যাপার। আবার বহুতল ভবনের মালিকরা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখে না। সেটাও পীড়াদায়ক।’
এ ব্যাপারে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ছোলজার রহমান জানান, যশোর ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা রয়েছে চারতলা পর্যন্ত আগুন নেভানোর, কিন্তু শহরে ৮-১৪ তলা ভবন নির্মাণ হচ্ছে। আবার সরকারি-বেসরকারি পুকুর, জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদীগুলো আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। সেখান থেকে পানি পাওয়া যাবে না। পৌরসভাগুলো যেসব বাড়ি অনুমোদন দিচ্ছে সেখানে চওড়া রাস্তা রাখছে না। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের কিছু করার থাকে না। কারণ তারা গাড়ি নিয়ে সেখানে যেতে পারছেন না। এতেই প্রতি বছর অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির হার বাড়ছে। অগ্নিকাণ্ড থেকে বাঁচতে পরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ গড়ে তুলতে হবে।










