কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরগুলোতে গণহত্যা দিবস পালন
করেছেন জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা। আজ শুক্রবার
(২৫ আগস্ট) মিয়ানমারে সামরিক জান্তার চালানো
গণহত্যার ষষ্ঠ বার্ষিকী উপলক্ষে সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা
ও মানববন্ধন কর্মসূচি আয়োজন করেন তারা। সমাবেশে তারা যেন মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফিরতে পারেন,
সে ব্যবস্থা করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন
রোহিঙ্গা নেতারা। এ সময় আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের
প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান তারা।
উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরের খেলার মাঠে আয়োজিত সমাবেশে ২০ থেকে ২৫ হাজার রোহিঙ্গার সমাগম ঘটে। এসব
মানুষের অধিকাংশই তরুণ ও যুবক। ওই সমাবেশে
বক্তব্য দেন আরাকান রোহিঙ্গা পিস ফর হিউম্যান রাইটসের সভাপতি জুবায়ের আহমদ,
রোহিঙ্গা এফডিএমএন (ফোর্সিবলি ডিসপ্লেসড মিয়ানমার ন্যাশনালস) রিপ্রেজেনটেটিভ
মোহাম্মদ কামাল, রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার ছৈয়দ উল্লাহ,
মোহাম্মদ মুসা ও মোহাম্মদ সুয়াইবসহ
আরো অনেকে। এছাড়াও উখিয়ার কুতুপালং, মধুরছড়া,
বালুখালী, টেকনাফের মোচনী, জাদিমোরা, শালবাগান, নয়াপাড়া আশ্রয়শিবিরেও গণহত্যা দিবস উপলক্ষে রোহিঙ্গাদের পৃথক সমাবেশ,
শোভাযাত্রা ও মানববন্ধন হয়েছে।
জুবাইর আহমদ বলেন, আমরা দ্রুত মিয়ানমারে ফিরতে চাই। আমরা এজন্য
ঐক্যবদ্ধ। মর্যাদার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় ২০১৭
সালের ২৫ আগস্টের পর রোহিঙ্গারা যেভাবে দল বেঁধে বাংলাদেশ পালিয়ে এসেছিল, ঠিক সেভাবে আবার বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফিরে যেতে বাধ্য হবে।
রোহিঙ্গা নেতা ছৈয়দ উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের এই আশ্রয়শিবিরে আমরা ছয়টি বছর কাটিয়ে
দিয়েছি। এখন আমরা জন্মভূমিতে ফিরতে চাই। মর্যাদার সঙ্গে
স্বাধীনভাবে ফেরার পথ তৈরিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
এ
সময় মিয়ানমারে ফেরার বিষয়ে সবাই একমত কিনা তা জানতে চাইলে
উপস্থিত রোহিঙ্গারা হাত তুলে সম্মতি জানান।
একই সমাবেশে বক্তব্য দেন রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার আবুল কালাম। তিনি
২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, সেদিন
আরাকানে (রাখাইনে) মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যেভাবে নিপীড়ন,
হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা জীবনেও ভুলতে
পারব না। চোখের সামনে গুলি করে শত শত মা-বোন-ভাই-বন্ধুকে হত্যা করে গণকবর দিয়েছে।
তবু তারা আরাকানে ফিরতে চান। টেকসই, নিরাপদ ও
মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা চান। তারা বাংলাদেশে আর এক দিনও থাকতে চান
না। এ সময় উপস্থিত রোহিঙ্গারা হাত তুলে তার বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেন।
৬ বছর ধরে আট লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা
প্রকাশ করে সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মোহাম্মদ সোয়েব বলেন, এখানে দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ কমে আসছে। ঠিকানাবিহীন জাতি হিসেবে রোহিঙ্গারা আর ভিন্ন দেশে পড়ে থাকতে চান না।
রোহিঙ্গাদের বিবেক ও আত্মসম্মানবোধ আছে। রোহিঙ্গাদের উচিত
দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। আর সে জন্য দরকার রাখাইনে বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ
নিশ্চিত করা। তারা মর্যাদার সঙ্গে রাখাইনে ফিরতে চান।
কর্মসূচির শেষ দিকে রোহিঙ্গারা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে
সে দেশের সেনাবাহিনীর হাতে নিহত স্বজনদের ছবি,
পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। পরে
নিহতদের স্মরণে মোনাজাত করেন তারা।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার
সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ। এর মধ্যে আট লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক
মাসে। কিন্তু বিভিন্নভাবে চেষ্টার
পরেও বিগত ছয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব
হয়নি। এখন চীনের মধ্যস্থতায় পাইলট প্রকল্পের আওতায় এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে
প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চলছে।
রোহিঙ্গা নেতা জামাল হোসেন বলেন, ২৫ আগস্ট গণহত্যা দিবস পালনের উদ্দেশ্য হলো
রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন জানতে পারে, সেদিন রাখাইনে কী ঘটেছিল। দিবসটি পালনের
মাধ্যমে তারা রাখাইনে সংঘটিত নৃশংসতা, হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, গ্রাম ধ্বংস ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দাবি করছেন। আন্তর্জাতিক
বিচার আদালতে এ সংক্রান্ত যে মামলাটি চলমান, তার রায়ও দ্রুত কার্যকর চান
রোহিঙ্গারা।










