ইউনিয়ন পরিষদের দেয়া প্রত্যয়নপত্র বলছে, মোশাহিদ আলী মারা গেছেন ২০০০ সালে। ওই বছর বিধবা ভাতার জন্য উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করেন তার স্ত্রী জয়গুন বেগম। সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপকালে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৬নং দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়নের মহেষখেড় এলাকার বাসিন্দা মোশাহিদ আলী মৃত্যুর খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি মারা যাব কেন? কি আবোলতাবোল বলছেন? আমি মারা গেলে এখন আপনার সঙ্গে কথা বলছে কে? এসব তথ্য আপনারা কই পান?’
যদিও ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়নপত্র বলছে ভিন্ন কথা। ২০০০ সালের ২ জানুয়ারি তিনি মারা গেছেন উল্লেখ করে ২০২০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মৃত্যু সনদ প্রদান করা হয়। ‘ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মহেষখেড় এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা আব্দুল আলীর ছেলে মোশাহিদ আলীর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা’
করে এ প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর করেন দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান। এ প্রত্যয়নপত্র দেখিয়ে মোশাহিদ আলীর স্ত্রী জয়গুন বেগম সরকারি বিধবা ভাতার জন্য সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করেছেন।
এ ব্যাপারে কথা হয় জয়গুন বেগমের সঙ্গে। তিনিও এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। দরিদ্র জয়গুন বেগম বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, লিয়কাত নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা ভাতা দেয়ার কথা বলে তার ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে গিয়েছিলেন। এর পরের ঘটনা তিনি কিছুই জানেন না। একই এলাকারই আরেক দম্পতি আব্দুর রহমান ও জমসিদা খাতুন। তাদের ঘটনা ভিন্ন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জমসিদা খাতুনকে দেয়া প্রত্যয়নপত্রে লেখা রয়েছে, প্রায় ছয় বছর পূর্বে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিধায় তাকে স্বামী নিগৃহীত ভাতা দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
এ প্রত্যয়নপত্রের নিচেও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সিলমোহরসহ স্বাক্ষর করা হয়েছে।
অথচ জমশিদা খাতুনের ছেলে ইমাম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার মা-বাবা সুখে সংসার করছেন। তারা দুজনই অশীতিপর বৃদ্ধ। এ বয়সে তাদের বিবাহবিচ্ছেদের সুযোগ নেই। ইমাম বলেন, স্বাধীন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি মাকে সমাজসেবা থেকে ভাতা এনে দেয়ার কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন শুনছি এ ঘটনা। বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে ভাতা প্রদান করে সরকার। সিলেটে এ ভাতার আবেদনে এমন অনিয়ম ও মিথ্যা তথ্য প্রদানের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোম্পানীগঞ্জের দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়নের ১৩টি মিথ্যা আবেদন পাওয়া গেছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সিলেট জেলায় মোট ২৮ হাজার ৩১১ জন নারী বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত ভাতা পান। প্রতি বছরই এ ভাতার জন্য নতুন আবেদন গ্রহণ করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ভাতাপ্রত্যাশী নারীরা আবেদন করতে পারেন। আবেদনকারীদের প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে প্রদান করা হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক নিবাস চন্দ্র দাস বলেন, অনেক সময়ই আমরা এমন ভুয়া আবেদন পাই। মিথ্যা ও ভুল তথ্য দিয়ে অনেকে আবেদন করেন। পরে জালিয়াতি ধরা পড়লে আমরা তাদের আবেদন বাতিল করি। গত এক বছরে এ রকম কয়েকশ ভুয়া আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এবার কোম্পানীগঞ্জ থেকে ১৩টি ভুয়া আবেদন শনাক্ত করা হয়েছে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়ন থেকে বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত ভাতার জন্য এ বছর দেড় শতাধিক আবেদন জমা পড়ে।
তবে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বলছেন, ইউপি অফিস থেকে প্রত্যয়নপত্রের বাইরেও অতিরিক্ত আরো ১৩টি আবেদন জমা পড়েছে। এসব প্রত্যয়নপত্র ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেয়া হয়নি। এ ১৩টির মধ্যে সাতজন নারীর স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় মৃত দেখানো হয়েছে আর ছয়জন নারী স্বামীর সঙ্গে সংসার করলেও তাদের স্বামী পরিত্যক্তা দেখানো হয়েছে।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন অনুযায়ী প্রত্যয়নপত্র তৈরির ক্ষেত্রে ওয়ার্ড সদস্যের সত্যায়ন থাকার কথা থাকলেও এ ১৩ জনের প্রত্যয়নের ব্যাপারে কিছুই জানতেন বলে জানিয়েছেন ৫নং মহেষখেড় ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল মতিন মতি। তিনি বলেন, আমি বিষয়টি ধরতে পেরে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে জানিয়েছি। আমার অজান্তে স্বামী নিগৃহীত ও স্বামীর মৃত্যুর প্রত্যয়নপত্র তৈরি করা হয়েছে। আমি কিছুই জানি না।
জালিয়াতির মাধ্যমে ভুল তথ্য দিয়ে স্বামী নিগৃহীতা হিসেবে ভাতার জন্য আবেদন করেছেন মহেষখেড় এলাকার আব্দুর রহমানের স্ত্রী মোছা. জমসিদা খাতুন, ছমর আলীর স্ত্রী মোছা. মনোয়ারা বেগম, আব্দুল ওয়াহাবের স্ত্রী মোছা. নেহারুন নেছা ও আব্দুল আলীর মেয়ে ফুলবান বিবি। অথচ তারা সবাই স্বামীর সঙ্গে সংসার করছেন। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অন্যদিকে স্বামীকে মৃত দেখিয়ে বিধবা ভাতার জন্য আবেদন করেছেন মোশাহিদ আলীর স্ত্রী জয়গুন বেগম, জইন উদ্দিনের স্ত্রী আবেদা বেগম, কুতুব উদ্দিনের স্ত্রী হুসনা বেগম, হরমুজ আলীর স্ত্রী হামিদা বেগম, লিয়াকত আলীর স্ত্রী মহরম বেগম, আব্দুস সুবহানের স্ত্রী আফতারুন নেছা, আলকাস মিয়ার স্ত্রী আরিফা বেগম। তাদের প্রত্যেকের স্বামীও জীবিত আছেন বলে জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সিদ্দিকুর রহমান বলেন, যে প্রত্যয়নপত্রগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, মিথ্যে তথ্য দেয়া হয়েছে, এগুলোতে আমি স্বাক্ষর করিনি।
এ ব্যাপারে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন আচার্য বলেন, এসব ব্যাপারে কেউ অভিযোগ দিলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।










