ঘোষণা অনুযায়ী ২৩ জুলাই মধ্যরাত থেকে নদীতে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। সরকারি নিষেধাজ্ঞায় ৬৫ দিন বন্ধ থাকার পর পুরোদমে শুরু হয়েছে মাছ শিকার। দুই মাসের বেশি অলস সময় কাটানোর পর মাছ ধরতে নামেন লক্ষাধিক জেলে। এর ফলে স্বস্তি ফিরে এসেছে জেলে পরিবারগুলোতে। উৎসবমুখর পরিবেশে বিনা বাধায় মাছ ধরা শুরু করেছেন তারা। প্রচুর মাছ ধরা পড়ায় কমেছে মাছের দাম। আড়ৎগুলোতে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য, ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন জেলে ও ইলিশ ব্যবসায়ীরা। প্রতিটি ট্রলার ও জেলেপল্লীতে চলছে সাগর যাত্রার উৎসব।

কর্তৃপক্ষের ধারণা, নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি সফল হওয়ায় এ বছর ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। তবে কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, বরাবরের মতো এবারো জেলেদের মধ্যে জলদস্যু বিরাজ করছে। অবশ্য জেলেদের নিরাপত্তায় কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুক্রবার (১৮ আগস্ট) সকালে কক্সবাজারের ফিশারি ঘাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে দেখা গেছে, ট্রলার ভর্তি মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছেন জেলেরা। বেশি মাছ ধরা পড়ায় দামও একটু কমেছে। এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার টাকার আশপাশে। কয়েকদিন আগেও একই আকারের ইলিশ বিক্রি হতো ২ হাজার টাকায়।

কক্সবাজার ফিশারি ঘাটের ব্যবসায়ী কুতুব উদ্দিন বলেন, নিষেধাজ্ঞার পর থেকে এ মৌসুমে আজ অনেক বেশি মাছ ধরা পড়েছে। মাছ বেশি পড়ায় দামও কিছুটা

ব্যবসায়ী আব্দুল করিম বলেন, অনেক বেশি মাছ পড়েছে। প্রতিটি ট্রলার ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা করে মাছ বিক্রি করছে আজকে। কোনো ট্রলারই খালি আসছে না। সব ট্রলারে মাছ পড়ায় দাম কিছুটা কমেছে। এভাবে মাছ পড়লে দাম আরো কমতে পারে।

এদিকে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে ট্রলার থেকে মাছ নামিয়ে বেচা-কেনার পর মাছগুলো বরফের সঙ্গে ককসিট ও ঝুড়ি ভর্তি করে পরিবহন যোগে দেশের নানা প্রান্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ইলিশ ছাড়াও কক্সবাজারের প্রতিটি নৌঘাট সয়লাব হয়েছে অন্যান্য প্রজাতির মাছে। লইট্যা, ফাইস্যা, চাপিলা ও পোয়াসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ বোঝাই করে সাগর থেকে ফিরছেন জেলেরা। ট্রলার ভর্তি মাছ ধরা পড়ায় হাসি ফুটেছে জেলেদের মুখে। তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা থাকায় সাগরে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ বেড়েছে। এভাবে মাছ পড়লে এবং দাম ভালো থাকলে আমাদের ঘরের অভাব দূর হবে।

কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান জানান, জেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন প্রায় ৪২ হাজার। এছাড়া নতুন জেলেদেরও নিবন্ধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক ফিশিং বোটের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৭০০।

অবশ্য বোট মালিক ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, কক্সবাজারে জেলেদের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও সদর উপজেলার পুরোপুরি এবং পেকুয়া ও টেকনাফের কিছু এলাকা জেলে অধ্যুষিত। এসব এলাকায় অন্তত লক্ষাধিক জেলে পরিবারের বসবাস।

এদিকে সামুদ্রিক উৎস থেকে আহরিত মাছ শুকিয়ে শুটকি হিসেবে রফতানি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও কক্সবাজারের শুটকি মাছের কদর রয়েছে। কক্সবাজারে সামুদ্রিক উৎস্য থেকে শুটকি উৎপাদনের স্থান রয়েছে ২০টিরও অধিক। এসব শুটকি পল্লীগুলোতেও চলছে প্রস্তুতির ধুম। কক্সবাজারে সবচেয়ে বড় শুটকি পল্লী সমিতিপাড়া এলাকার নাজিরারটেক শুটকি মহাল। এ শুটকি মহালে ব্যবসায়ী রয়েছেন ২ হাজারের মতো। আর এখানে নারী পুরুষ ও শিশু মিলে প্রায় ২০ হাজারের মতো শ্রমিক কাজ করেন। আগামী কয়েক সপ্তাহ পর শুটকি পল্লীতে মাছ সংগ্রহ শুরু হবে।

নাজিরারটেক এলাকার জেলে এহসান উল্লাহ জানান, টানা ৬৫ দিন মাছ ধরতে না পারায় তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। এবার সমুদ্রে জলদস্যুদের হামলা, লুণ্ঠন এবং মুক্তিপণ ‘‌বাণিজ্যে’ লাগাম টানতে সরকারের ভূমিকা কামনা করেন তিনি।

সাগরে নিরাপত্তা বাড়লে অতীতের তুলনায় এবার প্রান্তিক জেলের সংখ্যা বাড়বে বলে মনে করেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার উপকূলে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে আসছে কক্সবাজারের জেলে ও ফিশিং বোট মালিক সমিতি।

কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি ওসমান গণি টুলু বলেন, গত কয়েকদিন থেকেই মাছ ধরা শুরু হয়েছে। বরাবরের মতো এবারো জলদস্যু আতঙ্ক কাটছে না। গত বছরের মতো এবারো জলদস্যুদের তাণ্ডব অব্যাহত থাকলে সাগরের মৎস্য আহরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে বোট মালিক ও জেলেরা। তাই জলদস্যু দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।