রাজধানীর বিজয়নগরে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সন্ধ্যায় এ সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। আহত হয়েছেন আরো কয়েকজন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
নুরুল হক নুরকে রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হয় বলে জানিয়েছেন তার দলের নেতারা।
এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। রাতে পৃথক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানায় তারা। রাত ১১টার দিকে বাংলামোটর মোড়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এনসিপি। নুরুল হক নুরকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সহযোদ্ধা আখ্যা দিয়ে মিছিল করে তারা।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নুরুল হক নুরকে দেখতে এসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘নুরের ওপর আঘাত খুবই ন্যক্কারজনক ঘটনা। আমরা এটার নিন্দা করি। এই পুরো জিনিসটা আমরা তদন্ত করব।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে প্রথমে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানের নেতৃত্বে বিজয়নগর হয়ে দলীয় মিছিল কাকরাইলের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় আতঙ্কে পথচারীরা ছোটাছুটি করতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ উভয় পক্ষের কর্মীদের নিবৃত করার চেষ্টা করে। পরবর্তী সময়ে পুলিশের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সদস্যরা যুক্ত হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এতে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরসহ উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। পরে নুরকে উদ্ধার করে কাকরাইলে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা গণঅধিকার পরিষদের মিছিলে অতর্কিত হামলা করেছে।’
এদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালী দাবি করেন, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। শুনতে পাচ্ছি ফের জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা চালানো হতে পারে। তবে সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে আছেন।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘গণঅধিকার পরিষদের হামলায় আমাদের বেশকিছু নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এখন অনেকে হাসপাতালে আছেন। হামলার একপর্যায়ে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তখন গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা সরে যান। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি শান্ত করে।’
জাপা মহাসচিব আরো বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক ও নিবন্ধিত দল হওয়ার পরও বারবার জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা করা হচ্ছে। পার্টি অফিসে আগুনও দেয়া হয়েছিল।’
বর্তমান সরকার রাজনৈতিক দল ও জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে শামীম হায়দার বলেন, ‘এ সরকার দেশ পরিচালনার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। যার কারণে বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের নিজেদের স্বার্থে বেআইনি কাজ করে যাচ্ছে।’
গণঅধিকার পরিষদের দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামান বলেন, ‘আমাদের পূর্বনির্ধারিত শান্তিপূর্ণ মিছিলটি নাইটিংগেল মোড়ে যাওয়ার পথে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে হামলা করেন। এতে আমাদের কমপক্ষে ২০ জন নেতাকর্মী আহত হন। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’
হামলার নিন্দা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিএনপি সব শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাকে ব্যাহত করে এমন কোনো কর্মকাণ্ডকে বিএনপি সমর্থন করে না এবং সুস্থ ধারার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলাকেও আমরা নিন্দা জানাই।’
মির্জা ফখরুল তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার সর্বাত্মক পদক্ষেপের পাশাপাশি দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি ও তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। সেই সঙ্গে আমরা আহতদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি এবং তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।’
ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘যদি আমরা নুরুল হক নুরের ওপর এ ন্যক্কারজনক হামলার প্রতিবাদ না করতে পারি, জাতীয় পার্টিকে দিয়ে ফ্যাসিবাদ ফেরানোর এ চেষ্টা প্রতিহত না করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশটাই আবার নুর ভাইয়ের মতো রক্তাক্ত হয়ে যাবে। নুরুল হক নুরের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। ভারতের প্রেসক্রিপশনে বিপ্লবীদের রক্তাক্ত করে আওয়ামী লীগ ফেরানোর এ চেষ্টা আমরা সফল হতে দেব না।’
এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হান্নান মাসউদ ফেসবুকে এক পোস্টে বলেছেন, ‘নুরুল হক নুরের ওপর হামলা পক্ষান্তরে জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর হামলা। এ হামলার জবাব দিতেই হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবেই দিতে হবে।’
ফেসবুকে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এক পোস্টে লেখেন, ‘আওয়ামী লীগ যেভাবে অপরাধী, তার দোসর, বি টিম এবং বৈধতা দানকারী জাতীয় পার্টিও একইভাবে অপরাধী। জাতীয় পার্টিকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি একই পথের পথিক। তাদের পরিণতিও একই হবে।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ও মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ এক যৌথ বিবৃতিতে এ হামলার নিন্দা জানান।
এদিকে রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআরের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ঘটনার শুরুতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং শান্তিপূর্ণভাবে স্থান ত্যাগ করার জন্য ও দেশের বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করার অনুরোধ জানায়। তবে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও কতিপয় নেতাকর্মী তা উপেক্ষা করে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে। তারা সংগঠিতভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায় এবং আনুমানিক রাত ৯টার দিকে মশাল মিছিলের মাধ্যমে সহিংসতা আরো বৃদ্ধি করে। এ সময় তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেয়ারও চেষ্টা চালায়। এছাড়া বিজয়নগর, নয়াপল্টন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সাধারণ জনগণের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শান্তিপূর্ণ সমাধানের সব চেষ্টা তারা অগ্রাহ্য করে। ফলস্বরূপ, জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, আজকের উদ্ভূত ঘটনায় সেনাবাহিনীর পাঁচজন সদস্য আহত হয়।’










