আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচ্যাম) উদ্যোগে ‘টেকসই বিনিয়োগে সহায়তা’ শীর্ষক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রোববার (২০ জুলাই) রাজধানীর একটি হোটেলে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান পোশাকের চাহিদা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়াবে—তাই এখনই বিনিয়োগ কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হবে। তিনি তিনটি খাতে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন: বস্ত্র শিল্প টেকসই উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; ভূগর্ভস্থ পানির সংরক্ষণে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়াটার ইউজ পলিসি’ প্রণয়নের কাজ চলছে, যেখানে ব্যবহারের জন্য মূল্য নির্ধারণ থাকবে; এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বাধ্যতামূলক নীতিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

উপদেষ্টা বলেন, জ্বালানি খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার আওতায় সরকারি অফিসগুলোও ধাপে ধাপে রূপান্তরের পরিকল্পনায় রয়েছে। তিনি আরো বলেন, তামাক খাতে ভবিষ্যতের নীতিমালা হবে স্টেকহোল্ডার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে।

অর্থনীতিবিদ ও অ্যামচ্যামের সাবেক সভাপতি ফরেস্ট ই কুকসন বলেন, বৈশ্বিকভাবে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের তাপপ্রবাহ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এজন্য উত্তরাঞ্চলে জনসংখ্যা স্থানান্তর এবং নতুন ১৫টি শহর গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ঢাকার বিস্তার বন্ধ করে প্রধান খাত, প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। পাশাপাশি কুলিং প্রযুক্তি, দক্ষ প্রকৌশলী ও বিশ্বমানের কুলিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা, এবং ভবিষ্যতের শক্তি চাহিদা পূরণে পারমাণবিক জ্বালানি, বৈদ্যুতিক পরিবহন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক অবকাঠামো প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন, যার জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে একটি কৌশলগত রূপান্তর আনতে হবে।

অ্যামচ্যাম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, এলডিসি উত্তরণ এবং জলবায়ু প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও, পরিবেশগত অবক্ষয় স্বাস্থ্য, ব্যবসা ও বিনিয়োগ আস্থার ওপর গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। বেসরকারি খাতের সবুজ উদ্যোগের প্রশংসা করলেও তিনি বলেন, এখনো নীতিগত ফাঁকফোকর ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এই সংলাপের উদ্দেশ্য হলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ভিত্তি হিসেবে টেকসইতাকে প্রতিষ্ঠিত করা।

অনুষ্ঠানে অ্যামচামের তিনটি সদস্য প্রতিষ্ঠান তাদের সবুজ ও টেকসই বিনিয়োগ কার্যক্রম তুলে ধরে।

রিকভার- এর সিএফও ফেহমি মুহসিন ইউকসেল বলেন, বর্তমানে টেক্সটাইল শিল্পে টেকসইতা অপরিহার্য। ভারত ও চীন যেমন শক্তিশালী প্রণোদনার মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি পিছিয়ে থাকা দেশগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এরই মধ্যে অগ্রগতি করেছে, তবে আরো পদক্ষেপ প্রয়োজন—বিশেষ করে একটি শক্তিশালী নীতিকাঠামো, কাঁচামালের স্থিতিশীল জোগান এবং একটি জাতীয় সার্কুলারিটি কৌশল প্রণয়ন। বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশটি প্রায় পুরোপুরি কাঁচা তুলা আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, পুনর্ব্যবহৃত তুলার ব্যবহার বাড়ানো একটি বড় সম্ভাবনা, যা দেশেই ‘বাংলাদেশে তৈরি’ তুলা উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। উল্লেখযোগ্যভাবে, রিকভার-এর মালিকানাধীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও উন্নত তুলা পুনর্ব্যবহার কারখানাটি বাংলাদেশে অবস্থিত, এবং প্রতিষ্ঠানটি দেশের টেকসই উন্নয়নে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ লিমিটেডের কান্ট্রি ম্যানেজার রেজা মাহমুদ বলেন, ধূমপান স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবেশেরও ক্ষতি করে, তবে ই-সিগারেট ও হিটেড টোব্যাকো পণ্যের মতো কম ক্ষতিকর বিকল্প জনস্বাস্থ্যে সহায়তা করতে পারে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ কর্তৃক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত এসব পণ্যের উদাহরণ দিয়ে বলেন, নিষেধাজ্ঞা কোনো সমাধান নয়। বরং বাংলাদেশেও যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড ও সৌদি আরবের মতো বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত, যা জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং কিশোরদের প্রবেশাধিকার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

শেভরন বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর মোহাম্মদ ইমরুল কবীর বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টে শেভরনের ৩০ বছরের অঙ্গীকার দৃঢ়ভাবে অব্যাহত রয়েছে। দেশের সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক হিসেবে শেভরন বর্তমানে দেশীয় গ্যাসের ৬০ শতাংশ সরবরাহ করছে এবং এরই মধ্যে ৪.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে ৬৩৪ মিলিয়ন ডলার স্থানীয় চুক্তির আওতায়। শেভরনের ৯৭ শতাংশ কর্মীই বাংলাদেশী, এবং প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় সক্ষমতা উন্নয়ন ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রেখেছে—যার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা কেন্দ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সহায়তা, বৃক্ষরোপণ, প্রতিবন্ধী সহায়তা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং পরিবেশ সচেতনতা কার্যক্রম। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে শেভরন জাতিসংঘ ঘোষিত ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের মধ্যে ৯টি অর্জনে ভূমিকা রাখছে।

সংলাপ শেষে অংশগ্রহণকারীরা টেকসইতা, ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নীতিমালাভিত্তিক চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশ উপস্থাপন করেন। আলোচনার সারসংক্ষেপে বলা হয়, এ ধরনের সংলাপ আরো বাড়ানো জরুরি, যাতে বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো উন্মুক্তভাবে তোলা যায় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো সেগুলো বিবেচনা করতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ব্যবধান কমাতে এবং সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে পেতে এমন প্লাটফর্ম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

সমাপনী বক্তব্যে অ্যামচামের ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিক এম ওয়াকার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।