দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে আজ দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রেড, ইয়েলো ও হোয়াইট—এ তিন জোনে ভাগ করে সাজানো হয়েছে নিরাপত্তা বলয়। তারেক রহমানের জন্য দলের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে ৫০ লাখ মানুষ জমায়েতের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। গতকাল মধ্যরাত পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ঢাকায় এসে জড়ো হন। অনেকে ছিলেন পথে। প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখতেই এ আগমন বলে জানিয়েছেন তারা।

পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, দেশে ফেরার পর তারেক রহমান এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গমনাগমনের সময় পাবেন পুলিশ প্রটেকশনসহ বিশেষ নিরাপত্তা। এছাড়া তারেক রহমানের বাসভবন ও অফিসেও থাকবে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়া কাউকে তার ধারেকাছে ভিড়তে দেবে না পুলিশ। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও গোয়েন্দারা তারেক রহমানের নিরাপত্তার দিকটি দেখভাল করবেন। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং বিএনপির পক্ষ থেকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত একাধিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভা থেকে তিনটি জোনে ভাগ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এগুলো হলো রেড, ইয়েলো ও হোয়াইট জোন।

পুলিশ সদর দপ্তর আরো জানায়, রেড জোনে যারা প্রবেশের সুযোগ পাবেন, তাদের বিশেষ সিকিউরিটি কার্ড দেয়া হচ্ছে। ওই কার্ড ছাড়া কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন না। ইয়েলো জোনের জন্য থাকছে আলাদা কার্ড। যারা এ কার্ড পাবেন, তারাই কেবল ইয়েলো জোনে যেতে পারবেন। রেড ও ইয়েলো জোনের বাইরে যে এলাকা থাকবে, সেটা বিবেচিত হবে হোয়াইট জোন হিসেবে। এ জোনে প্রবেশ করতে পারবেন সাধারণ মানুষ। তারেক রহমানের আগমনের দিন পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থার প্রায় দুই হাজার সদস্য মোতায়েন থাকতে পারে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসভবন ও তারেক রহমানের বাসভবন দেয়ালঘেঁষা হওয়ায় দুটি বাসা এবং তারেক রহমানের অফিসকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে। বাসা ও অফিসের মাঝখানের দূরত্ব ও চলাচলের পথকে অতিগুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকেই পুলিশের বিশেষ নজরদারি শুরু হয়েছে। এছাড়া বিশেষ এসকর্টসহ একাধিক চেকপোস্ট থাকবে। সাধারণত গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় নয়টি চেকপোস্ট চালু থাকে। যেখানে সার্বক্ষণিকভাবে ১৫০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে তার বাসভবনের আশপাশেও। তারেক রহমান বিমানবন্দর থেকে গুলশানে আসার পথে কয়েক হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তার চলাচলের সম্পূর্ণ রুটে ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ করেছে ডিএমপি। এছাড়া ওইদিন তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাঠে থাকবে ঢাকা মহানগর পুলিশের সোয়াত টিম, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা। তার বাসা ও অফিস ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপিংয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে পুলিশ।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, তারেক রহমান ও তার পরিবার গতকাল লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দেশের উদ্দেশে রওনা হন। সিলেট হয়ে ফ্লাইটটি আজ বেলা ১১টা ২০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা তাদের। তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠক করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট এবং চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ)। তারেক রহমানের নিরাপত্তার জন্য বুলেটপ্রুফ গাড়ি কিনেছে বিএনপি, যা এরই মধ্যে দেশে পৌঁছেছে। এছাড়া টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো এলসি ২৫০ মডেল গাড়ি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে এবং বাংলাদেশে নিবন্ধিত হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো বিবেচনা করা হয়। সে অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে কঠোর নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

এদিকে তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। কেবল যাত্রীরাই এ সময়ে সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন।

গতকাল দুপুরে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কমিটির আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানাবেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। এরপর সড়কপথে এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন তিনি। যাওয়ার পথে তিনি ৩০০ ফিটে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এটি সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান হবে। এরপর তিনি চলে যাবেন এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। সেখান থেকে তিনি গুলশানের বাসায় যাবেন।

ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) রওনক আলম বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও একটা নিরাপত্তা নির্দেশিকা দেয়া হয়েছে। ডিএমপি সদর দপ্তরের সেন্ট্রালি একটা নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে।

তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. বাহারুল আলম বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তার সুরক্ষায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পোশাকে ও সাদা পোশাকে মোতায়েন থাকবেন। এছাড়া বিএনপির পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।