দুদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কক্সবাজারে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পাহাড় ধসে চকরিয়ায় দুই শিশু নিহত হয়েছে। নিহত দুই শিশু চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের বলে জানা গেছে। তবে তাৎক্ষণিক পরিচয় পাওয়া যায়নি।

এদিকে পাহাড় ধসে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মা-মেয়ে নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন আরো ৪ জন। সোমবার (৭ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-৯ এই ঘটনা ঘটে। নিহত মা-মেয়ে ক্যাম্প ৯ এর এ/৬ ব্লকের আনোয়ার ইসলামের স্ত্রী জান্নাত আরা (২৮) ও তার মেয়ে মাহিম আক্তার (২)। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ৮-এপিবিএন-এর কমান্ডিং অফিসার আমির জাফর।

অনবরত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় ধসের শঙ্কাও। এদিকে বাঁকখালী নদীসহ বঙ্গোপসাগরে জোয়ারের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করছে। বৃষ্টির এ তীব্রতা ১০ আগস্ট পর্যন্ত থাকলে ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। গত রবিবার বেলা ১২ থেকে থেকে সোমবার (৭ আগস্ট) বেলা ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে কক্সবাজারে ফের দেখা দিয়েছে পাহাড় ধসের শঙ্কাও। এতে জেলার প্রায় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে কক্সবাজার সদর উপজেলার ১০ গ্রাম, মহেশখালী উপজেলার ১৫ গ্রাম, কুতুবদিয়া উপজেলার ১৫ গ্রাম, চকরিয়ার ২০ গ্রাম, উখিয়ার উপজেলার ১০ গ্রাম, রামু উপজেলা ২০ গ্রাম, টেকনাফে ১০ গ্রাম ও প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রায় ১৪টি গ্রাম। এতে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন।

এছাড়াও ঢল ও বৃষ্টির পানিতে নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। রাস্তাঘাট ভেঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে জেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। তলিয়ে গেছে কৃষি ফসল ও বিভিন্ন মাছের প্রজেক্ট।

তবে যেকোনো দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসন প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিভীষণ কান্তি দাশ।

আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজার স্টেশনের সিনিয়র সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুর রহমান পাহাড় ধ্বসের শঙ্কা রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, শনিবার রাত থেকেই অতি ভারি বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। শনিবার রাত ১২ থেকে রবিবার রাত ১২ টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে ৯৮ মিলিমিটার। বৃষ্টির তীব্রতা থাকতে পারে ১০ আগস্ট পর্যন্ত।

তিনি আরো বলেন, টানা বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়গুলো কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কয়েকদিন ধরে যে ধরনের বৃষ্টিপাত হচ্ছে তাতে পাহাড় ধসের সম্ভাবনা আছে।

এদিকে গত কয়েকদিনের ভারি বর্ষণ ও ঝড়ো বাতাসে জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। লোকজনকে সরে যেতে মাইকিং করছে প্রশাসন। স্বেচ্ছায় না সরলে অভিযানের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেয়া হচ্ছে।

অতি বর্ষণে জেলার মিঠাপানির তিন নদী চকরিয়ার মাতামুহুরি, ঈদগাঁওর ফুলেশ্বরী ও কক্সবাজারের বাঁকখালীতে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পাহাড়ি ঢলের পানি। ঢলের তীব্রতায় ভেঙ্গে যাওয়া ঈদগাঁওর রাবার ড্যাম এলাকা দিয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে ঈদগাঁও উপজেলার জালালাবাদ, ঈদগাঁও, চৌফলদন্ডী, পোকখালী ও ইসলামাবাদ এলাকার অর্ধশত গ্রামের রাস্তা-ঘাট, বাসা-বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ফসলের মাঠ। ভেঙ্গে গেছে আঞ্চলিক সড়কগুলো।

এছাড়া কক্সবাজার শহরসহ টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, রামুসহ বেশ কয়েক উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ঢলের পানির সঙ্গে বৃষ্টির পানিতে ওইসব এলাকাগুলোতে কোমর সমান পানি জমে গেছে।

প্রবল বর্ষণের মাতামুহুরীর নদীর পানি বেড়ে চকরিয়া উপজেলার পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড এবং সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর, বরইতলী, হারবাং, কোনখালী, ঢেমুশিয়া, খুটাখালী, ডুলাহাজারা, সাহারবিল পুরোসহ ১৭ ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেপি দেওয়ান বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে চকরিয়া উপজেলায় মাঝারি বৃষ্টির ফলে পাহাড়ি ঢলের পানিতে বন্যা ও নদী ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া ভূমি ধসের আশঙ্কাও রয়েছে। ইতোমধ্যে উপকূলের মৎস্য ঘেরের স্লুইচ গেটগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে চকরিয়া উপজেলাতে সর্বোচ্চ পানি বৃদ্ধি ও ক্ষয়ক্ষতির আশংকা করছেন তিনি।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের চকরিয়া শাখার কর্মকর্তা জামাল মোর্শেদ বলেন, টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া উপজেলার মাতামুহুরী নদীতে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, যেসব এলাকা প্লাবিত হয়েছে সেখানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত খাদ্য দ্রব্য সরবরাহ করা হবে। যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসন পক্ষ থেকে সবরকম প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করা হচ্ছে। সর্বশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসার জন্য জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।