দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে আকাঙ্ক্ষিত ফেরি সার্ভিস আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। স্বল্প দূরত্বের সমৃদ্ধ এই দ্বীপে যেতে জোয়ার-ভাটায় কাদা-পানি মাড়িয়ে যাওয়ার নিদারুণ কষ্ট লাঘবে নৌপথে ফেরির মতো আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থা চালুর দিনে একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সরকারের ৬ জন উপদেষ্টা।
উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার দুইজন বিশেষ সহকারী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিবসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগের ফলে এখন থেকে চট্টগ্রামের বাঁশবাড়িয়া থেকে সন্দ্বীপে সড়ক যান নিয়ে সরাসরি চলাচল করতে পারবে দ্বীপের প্রায় ৪ লাখ বাসিন্দা।
সোমবার ( ২৪ মার্চ) সকালে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে ফেরি সার্ভিস উদ্বোধনের পর উপদেষ্টারা ফেরিতে করে সন্দ্বীপে যান। সেখানে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে ভার্চুয়ালি অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুছ। এ সময় তিনি বলেন, ‘সন্দ্বীপের যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল মধ্যযুগীয়। চট্টগ্রামের সন্নিকটের একটি দ্বীপ হলেও ঐতিহাসিক স্থান ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এই দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য ৫০ বছরের মধ্যেও কোনো নিরাপদ যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি, কী লজ্জার কথা! ফেরি সার্ভিস চালুর মাধ্যমে আমরা একটি দীর্ঘ লজ্জা থেকে বাঁচলাম।’
ভিডিও কনফারেন্সে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু, অসুস্থ ও প্রবীণদের জন্য যাতায়াত ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। এখন থেকে সবাই সপরিবারে যাতায়াতের সুযোগ পাবে। সন্দ্বীপের মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ-আমেরিকা থেকে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। এ নতুন যাতায়াত ব্যবস্থার উদ্যোগ প্রবাসীদের অবদানের তুলনায় খুবই সামান্য।’ বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদ সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকাগুলোতে সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, রেলপথ, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, পানিসম্পদ, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা বীর প্রতীক ফারুক-ই-আজম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান।
অনুষ্ঠানে সন্দ্বীপের বিভিন্ন পেশাজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা উপকূলীয় জলবায়ু উদ্বাস্তু জীবনের গল্প তুলে ধরেন এবং উপকূলীয় সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র জানায়, সন্দ্বীপে যাতায়াত সুবিধা বাড়াতে ২০১৩ সালে সীতাকুণ্ডের কুমিরা অংশে ৭০০ মিটারের একটি জেটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে নৌপথটি পরিচালনা শুরু হয়। পরবর্তীতে উভয় সংস্থার দ্বন্দ্বের কারণে দীর্ঘ সময় ঘাট পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ৫ আগস্টের সরকার পরিবর্তনের পর ঘাট পরিচালনার দায়িত্ব জেলা পরিষদের কাছ থেকে নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ-কে দেয়া হয়। ২০২০ সালে প্রস্তাবিত ফেরি সার্ভিসের কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও বর্তমান সরকার দ্রুত এটি বাস্তবায়ন করেছে।
বাঁশবাড়িয়া থেকে সন্দ্বীপ যাতায়াতে সমুদ্র চ্যানেল পাড়ি দিতে হবে। বাংলাদেশে সমুদ্রে চলাচলকারী ফেরি না থাকায় বর্ষা মৌসুমে আপাতত সার্ভিসটি বন্ধ থাকবে। তবে আগামী মৌসুমের জন্য সমুদ্র উপযোগী ফেরি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। ফেরির ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে এক টন পর্যন্ত পণ্যবাহী যানবাহন ১,৩০০ টাকা, তিন টন পর্যন্ত পণ্যবাহী ছোট ট্রাক/লরি/কাভার্ড ভ্যান ১,৫০০ টাকা, পাঁচ টন পর্যন্ত ট্রাক, ট্যাংকলরি, কাভার্ড ভ্যান ১,৬০০ টাকা, আট টন পর্যন্ত পণ্যবাহী গাড়ি ২,০০০ টাকা, দশ চাকাবিশিষ্ট ৩০ টন পর্যন্ত পণ্যবাহী গাড়ি ৫,৭০০ টাকা, মিনিবাস ১,৭৫০ টাকা, মাঝারি বাস ২,৪৫০ টাকা, বড় বাস ২,৬৫০ টাকা, ব্যক্তিগত কার ও টেম্পো ৭৫০ টাকা, মোটরসাইকেল ১৫০ টাকা, সিএনজি/রিকশা/ভ্যান ৪০০ টাকা, বাইসাইকেল ৭৫ টাকা, ডিলাক্স শ্রেণীর যাত্রী জনপ্রতি ১০০ টাকা, সুলভ শ্রেণীর যাত্রী ৮০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
উদ্বোধনের দিন থেকে প্রথম তিন দিন উভয় দিকে দিনে দুবার ফেরি চলাচল করবে। এরপর দিনে একবার করে চলাচল করবে। জোয়ার-ভাটার সময় অনুযায়ী ফেরির সময়সূচি পরিবর্তন হবে।










