গত বছরের ১৫ জুলাই দেশের প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ। নারী শিক্ষার্থীসহ ২৯৭ জন শিক্ষার্থী ওই হামলায় আহত হন। সেদিনের নৃশংস হামলার সূচনা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে।
মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যায় এক বছর আগের সেই নির্মম ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন শিক্ষার্থীরা। হল অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘জুলাই অভ্যুত্থানে বিজয় একাত্তর হল: প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বিজয়গাথা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় শিক্ষার্থীরা এসব কথা বলেন।
তারা জানান, ১৫ জুলাই দুপুর ১২টার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অধিভুক্ত সাত কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন। বিকাল ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়ার দিকে মিছিল নিয়ে আসেন, ছাত্রলীগের চাপে হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে নিয়ে যেতে। জসিমউদ্দীন হলের মাঠে ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের বাঁধা দেয়। পাশেই বিজয় একাত্তর হলের সামনে সংঘর্ষের সূচনা হয়। তখন আশপাশের হল ও মধুর ক্যানটিন থেকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা এসে মল চত্বরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। ছাত্রলীগের হামলার মুখে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে ভিসি চত্বর এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তারা আরো জানান, এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রড, হকিস্টিক, রামদাসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ভেতর আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানেও তাদের মারধর করে রক্তাক্ত করা হয়। ছাত্রলীগের হামলায় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে দিগ্বিদিক চলে যান। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাত কলেজ ও মহানগর শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মহড়া দেয়। এ হামলায় অনেক নারী শিক্ষার্থীসহ প্রায় তিনশ শিক্ষার্থী আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নেন। বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হন।
হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। আলোচনায় অংশ নেন ঢাবি প্রক্টর সহযোগী সাইফুদ্দিন আহমেদসহ হলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। হলের আবাসিক শিক্ষক প্রভাবষক আরিফিন রহমান আলিফের সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিনিয়র আবাসিক শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল্লাহ।
এ সময় জুলাই অভ্যুত্থানে বিভিন্ন স্তরের শহীদ ও শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পার্থক্য ছিল এবং এখনো আছে। তারপরও আমরা একটি দাবিতে একতাবদ্ধ হয়েছিলাম; আর তা হলো ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া রক্তের বিনিময়ে আমরা মুক্তি পেয়েছি। কিন্তু আমরা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন হব না। যদি আমরা একতাবদ্ধ না থাকি তাহলে আবারো সেই পুরনো স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।’
আলোচনা সভার আগে বিজয় একাত্তর হল চত্বরে ‘জুলাই স্মৃতি উদ্যান’-এর উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। এ সময় তিনি বলেন, এই হলের একটা ঐতিহাসিক অবদান আছে। এই হলের প্রতি ভালো কিছুর প্রত্যাশা করি আমরা। এটা শিক্ষার্থীদের স্মরণে রাখতে হবে। নবযাত্রা শুরু হয়েছে। আমাদের সব সময় সেই চেতনা লালন করে ইনক্লুসিভ থাকতে হবে। কেউ যেন আমাদের এক্সক্লুসিভ করে ফেলতে না পারে। আজকে যে উদ্যান উদ্বোধন করা হলো, তা যেন আমাদের একতাবদ্ধ থাকার স্মারক হয়।
সমাপনী বক্তব্যে বিজয় একাত্তর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা বলেন, ‘অভ্যুত্থানে বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থীরা যে অবদান রেখেছেন, তার জন্য আমরা গর্ববোধ করি। জুলাই স্পিরিটকে ধারণ করে অচিরেই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। কাঙ্ক্ষিত এই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে অংশীজনদের মধ্যে ইস্পাত কঠিন ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে আর কখনো যেনো কোনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা না পায় তার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
এ সময় আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকার জন্য অতিথি, আলোচক, হলের আবাসিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ হলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানান তিনি। সভা সঞ্চালনা করেন আরেফিন রহমান আলিফ।










