বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘অনেকে কয়েক লাখ বা কোটি যুবককে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে বাকিদের বেকার ভাতা দেয়ার কথা বলছেন। আমাদের যুবকরা বেকার ভাতা গ্রহণ করুক, তা আমরা দেখতে বা শুনতেও চাই না। আমরা প্রতিটি যুবকের হাতকে দেশ গড়ার কারিগরের হাতে পরিণত করতে চাই; তাদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই, বেকার ভাতা নয়।’

গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলনে প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী মানুষের জীবনে শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই। এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যা যুবকদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে, শিক্ষার চূড়ান্ত উৎকর্ষে পৌঁছে দেবে এবং উন্নত চরিত্র ও দক্ষতা নিয়ে সমাজ গঠনে আত্মনিয়োগের জন্য প্রস্তুত করবে।’

আসন্ন নির্বাচনে যারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠন করতে চায়, তাদের তিনটি শর্তে একমত হতে হবে বলে জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ‘ইসলামী সংগঠনগুলো এবং দেশপ্রেমিক অন্যান্য সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে আমরা ইনসাফভিত্তিক ত্যাগের বাংলাদেশ গড়তে চাই। যারা আমাদের সঙ্গে আসবেন, তাদের প্রতি আমাদের বার্তা স্পষ্ট—আপনি দুর্নীতি করতে পারবেন না এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয় দিতে পারবেন না, সমাজের সব ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে, কোনো রাজনীতিবিদ বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। এবং সব জঞ্জালের কবর রচনার জন্য জনগণ যে সংস্কারের দিকে তাকিয়ে আছে, সে সংস্কারের সব সুপারিশকে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এই তিন প্রতিশ্রুতিতে যারা একমত, তাদের স্বাগত।’

ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আসুন আমরা সব ধর্ম, দল ও জাতি মিলে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ি। যে ঐক্য শুধু বাংলাদেশকেই নয়, দুনিয়ার বহু দেশকে পথ দেখাবে। সে দিনটির অপেক্ষায় আমরা লড়ে যাব। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করব।’

ছাত্রশিবির সম্পর্কে জামায়াত আমির বলেন, ‘২৪-এর বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আপামর ছাত্রসমাজ তাদের অন্তরের ভালোবাসা দিয়ে এ সংগঠনকে গ্রহণ করেছে। এর মধ্য দিয়ে তারা ছাত্রশিবিরকে ম্যান্ডেট দিয়েছে। এ সংগঠনকে ছাত্রসমাজের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে চরিত্র গঠন, নৈতিক শিক্ষা, আধুনিক শিক্ষা এবং গবেষণার পবিত্র ক্ষেত্রে পরিণত করতে হবে।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা দেখতে চাই—আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষক অপদস্থ হবেন না। বরং ছাত্র ও শিক্ষকের সম্পর্ক হবে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের মতো। বিগত দিনগুলোতে অনেক বেদনাদায়ক দৃশ্য আমরা দেখেছি। যারা এ কাজগুলো করেছেন, তারা নিন্দিত হয়েছেন। এ কাজের পুনরুত্থান বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ কখনই বরদাশত করবে না। আজ ছাত্রশিবিরের কাছ থেকে মানুষ যদি হতাশ হয়, তাদের যাওয়ার কোনো বিকল্প ঠিকানা এখনো তৈরি হয়নি। এ সম্মান ও দায়িত্ব উপলব্ধি করে ছাত্রশিবিরের প্রতিটি কর্মী ও সমর্থককে নিজেকে গড়তে হবে এবং সহপাঠীদের গড়ার দায়িত্ব নিতে হবে।’

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। দেশ নিয়ে একটি নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে—মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সামনে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তবে ঠিক এই সময়ে এই অগ্রযাত্রা রুখে দেয়ার জন্য একটি চক্র, একটি ষড়যন্ত্র দেখা যাচ্ছে। শিবির তথা আধিপত্যবাদবিরোধী ইসলামী জনতার এ সংগ্রামকে সন্ত্রাস দিয়ে তারা ঠেকাতে না পেরে এখন মিথ্যাচার-অপপ্রচারের মাধ্যমে জাতিকে বিভ্রান্ত করে আবার পেছনে ঠেলে দিতে চায়। কিন্তু জাতি কোনো মিথ্যাচার বিশ্বাস করবে না।’

অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে আরো বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনে দলের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, ইনকিলাব মঞ্চের প্রয়াত আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির বড় ভাই ওমর বিন হাদিসহ অন্যরা।

শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলামের সভাপতিত্ব ও সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম সাদ্দামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, সেক্রেটারি রেজাউল করিম, মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থীসহ জামায়াত ও শিবিরের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।

দিনের দ্বিতীয় অধিবেশনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২০২৬ সেশনের জন্য নতুন সভাপতি নির্বাচিত হন নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। সংগঠনটির সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি নির্বাচিত হন। এছাড়া সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হয়েছেন সিবগাতুল্লাহ। নুরুল ইসলাম সাদ্দাম আগের কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের সাবেক এ শিক্ষার্থী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে উদ্যোক্তা অর্থনীতিতে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করছেন।

নবমনোনীত সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে স্নাতকোত্তর করছেন। এর আগে তিনি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ছিলেন।