চট্টগ্রাম অঞ্চলে কৃষকরা ধানের পরিবর্তে ডাল জাতীয় ফসল চাষে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ধানের উৎপাদন খরচ বেশি ও বাজারদর নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় কৃষকরা লাভজনক বিকল্প হিসেবে ডাল চাষ বাড়াচ্ছেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও প্রায় ৯৩ লাখ টন ডালজাতীয় ফসল উৎপাদিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় ৭৬ হাজার ৪৪৬ হেক্টর জমিতে ডাল চাষ হয়েছে। প্রধানত মসুর, ছোলা, মুগ, খেসারি, ফেলন, মাসকলাই, মটর ও অড়হর ডালের আবাদ হয় এখানে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চলতি অর্থবছরে ডালের আবাদ কিছুটা কমলেও মোট উৎপাদন ৮৫ হাজার টন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক দশক আগেও এ অঞ্চলে ডালের আবাদ ছিল ৫০ হাজার হেক্টরের নিচে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৫ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ২ হাজার ৮৯২ টন ডাল উৎপাদিত হয়েছিল। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবাদ বাড়লেও উৎপাদন কমে ৯৩ হাজার ৬৩১ টনে দাঁড়ায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত অর্থবছরে অনুকূল আবহাওয়া না থাকায় উৎপাদন কম হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে ফেনী, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের ভয়াবহ বন্যায় অনেক জমির আবাদ নষ্ট হওয়ায় ডালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয়েছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয় খেসারি ডালের। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৮৯২ হেক্টর জমিতে ৫৯ হাজার ৮৫৫ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১ হাজার ৬৭৯ হেক্টর জমিতে ৫০ হাজার ১২২ টন খেসারী উৎপাদিত হয়। চলতি অর্থবছরে ৪১ হাজার ৩৫১ হেক্টর জমিতে এ ডালের আবাদ হয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আবাদ হয় ফেলন ডালের। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২০ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে ২৪ হাজার ৩৩০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে ২৩ হাজার ৫৮৯ টন ফেলন ডাল উৎপাদিত হয়। চলতি অর্থবছরে ২০ হাজার ৫৪৬ হেক্টর জমিতে ফেলন ডালের আবাদ হয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩ হাজার ৩২৪ হেক্টর জমিতে মুগ ডাল চাষ হয় ও উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ৩৮৩ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩ হাজার ২১১ হেক্টর জমিতে ১৫ হাজার ৭১৯ টন মুগ ডাল উৎপাদিত হয়। চলতি অর্থবছরে ১২ হাজার ২৮৮ হেক্টর জমিতে মুগ ডাল আবাদ হয়েছে। এছাড়া মসুর ডালের গড় আবাদ ২ হাজার হেক্টর ও মটর ডালের গড় আবাদ ৭০০ হেক্টর।
জেলা ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নোয়াখালী জেলায় সর্বাধিক ডাল উৎপাদিত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ জেলায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে ৪৯ হাজার ৯৫০ টন খেসারি ডাল উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ৪০ হাজার ২০০ টন খেসারি ডাল উৎপাদিত হয়। এছাড়া ফেলন, মুগ ও মটর ডালের আবাদও সবচেয়ে বেশি হয় নোয়াখালীতে। চট্টগ্রামে ফেলন ও খেসারি ডালের আবাদ বেশি হয়, আর ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজারেও কৃষকরা ডাল চাষ বাড়াচ্ছেন।
মাঠপর্যায়ের কৃষকরা বলছেন, ধানের উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বাজারদর লাভজনক নয়। অন্যদিকে ডাল ও সবজি চাষে খরচ কম এবং লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা এসব ফসলে ঝুঁকছেন। এক দশক আগেও যেখানে এক গ্রামে ১০-১২ জন কৃষক ডাল চাষ করতেন, এখন সেখানে ৪০-৫০ জন কৃষক ডাল উৎপাদন করছেন। কৃষকদের মতে, বীজ ও সরকারি প্রণোদনা সহজলভ্য হলে ধানের পরিবর্তে ডাল ও সবজি চাষে আরো বেশি কৃষক আগ্রহী হবেন।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে কৃষকদের আগ্রহ ডাল চাষে বেড়েছে। এক দশক আগেও তারা ডাল চাষে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। এখন তারা ভালো ফলন পাচ্ছেন বলে আগ্রহ বাড়ছে। আমরা উৎপাদন আরো বাড়ানোর জন্য কাজ করছি এবং প্রণোদনা ও অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নিয়েছি।










