ভোটার তালিকায় নাম তোলা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল বেলা ১টার দিকে তিনি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের পেছনে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনে যান। সেখানে ছবি তোলা, চোখের আইরিশ (মণি) ও ১০ আঙুলের ছাপ দেয়া এবং স্বাক্ষর করার কাজ করেন। তারেক রহমানের সঙ্গে একই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন তার মেয়ে জাইমা রহমানও।
এ বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, আজ কমিশনে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারেক রহমান ও জাইমা রহমানের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি চূড়ান্ত হবে।
এছাড়া এদিন তারেক রহমান ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি, ভাই আরাফাত রহমান কোকো, শ্বশুর সাবেক নৌবাহিনী প্রধান মাহবুব আলী খান ও পিলখানায় নিহত সেনা কর্মকর্তাদের কবর জিয়ারত করেন।
তারেক রহমান ২৭ ডিসেম্বর ভোটার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করবেন, তা আগেই জানিয়েছিল বিএনপি। নির্বাচন কমিশনও সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা এরই মধ্যে চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে ভোটার তালিকা আইনে বলা আছে, ইসি যেকোনো সময় ভোটার হওয়ার যোগ্য যেকোনো ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
এক-এগারো পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরি হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান কারামুক্ত হয়ে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন। বিদেশে থাকায় তখন ভোটার তালিকায় তিনি অন্তর্ভুক্ত হননি। এর পরপর আওয়ামী লীগের শাসনকালে তিনি দেশে আসেননি, ভোটারও হননি।
তারেক রহমান ও জাইমা রহমান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার হতে আবেদন করেছেন বলে জানান ইসি সচিব আখতার আহমেদ। গুলশানে যেখানে থাকছেন, সেখানেই ভোটার হতে আবেদন করেছেন তিনি। এ ওয়ার্ডটি ঢাকা-১৭ আসনের অন্তর্ভুক্ত।
তারেক রহমান ও জাইমা রহমানের ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকে নিবন্ধন প্রক্রিয়া যেটা আছে ফরম-২, ওই ফরম ফিলআপ করে ওনারা ছবি তুলেছেন, বায়োমেট্রিকস দিয়েছেন। ওনারা আবেদন করেছেন যে ওনাদের যেন ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’
এ আবেদন নিয়ে আগামীকাল (আজ) পূর্ণাঙ্গ কমিশন বৈঠকে বসবে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিবন্ধনটা চলমান প্রক্রিয়া। নিবন্ধনের প্রক্রিয়া কমপ্লিট করেছেন তিনি। ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি যেটা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সে ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত লাগবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত দুইভাবে পাওয়া যায়। একটা হচ্ছে আনুষ্ঠানিক সভা করে, আরেকটা হচ্ছে নথির মাধ্যমে।’
ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পেতেও নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সারেন তারেক রহমান। এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) এএসএম হুমায়ুন কবীরের কাছে সকালে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, তারেক রহমানের নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি শেষ হতে কত সময় লাগতে পারে? জবাবে তিনি জানান, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। এটা ৫ ঘণ্টা, ৭ ঘণ্টা, ১০ ঘণ্টা, কারো কারো ক্ষেত্রে আরো বেশি লাগে, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে একটু কম লাগে।
এর আগে সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে গুলশানের বাসা থেকে বের হন তারেক রহমান। তবে গত দুই দিনের মতো আজ লাল-সবুজ রঙে সাজানো বাসে যাননি। সাদা রঙের একটি গাড়িতে (এসইউভি) চড়ে যান তিনি, গাড়িটি ছিল ফুল দিয়ে সাজানো। এ গাড়িতে সামনে চালকের পাশের আসনে বসেছিলেন তারেক রহমান। পেছনের আসনে ছিলেন তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান।
সকালে বেরিয়ে নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যান তারেক রহমান। বেলা সাড়ে ১১টার একটু আগে সেখানে পৌঁছে তিনি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেন। পরে তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরও জিয়ারত করেন। প্রথমে ওসমান হাদির কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর মোনাজাত করেন। পরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরে ফুল দেন ও মোনাজাত করেন। মোনাজাত পরিচালনা করেন শরিফ ওসমান হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানসহ অন্যরা। শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন।
এদিন শ্যামলীতে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) পরিদর্শন কর্মসূচি বাতিল করেন তারেক রহমান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের দেখতে সেখানে যাওয়ার কথা ছিল তার। বিএনপির মিডিয়া সেল সকালে এক ফেসবুক পোস্টে জানায়, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আহত না থাকায় তারেক রহমান পঙ্গু হাসপাতালে যাবেন না।’
পরে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে যান তিনি। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা সেরে তিনি বেলা ২টার দিকে বনানী কবরস্থানে যান। সেখানে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেন। পরে ভাইয়ের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। তিনি কবরের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে মারা যান কোকো। একদিন পর কোকোর মরদেহ দেশে এনে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। ওই সময়ে লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন তারেক রহমান।
এরপর তারেক রহমান যান বনানীর সামরিক কবরস্থানে। সেখানে তার শ্বশুর সাবেক নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কবর জিয়ারত করেন।
বেলা ৩টার দিকে বনানীর সামরিক কবরস্থানে ঢাকার পিলখানায় হত্যার শিকার সেনা কর্মকর্তাদের কবর জিয়ারত করেন তিনি। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।
এদিকে গতকাল বিকাল ৫টায় ঢাকার ধানমন্ডিতে শ্বশুরবাড়ি ‘মাহবুব ভবনে’ গিয়ে সময় কাটিয়েছেন তারেক রহমান। বাড়িটি প্রয়াত নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের। তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান মাহবুব আলীর ছোট মেয়ে। ওই বাড়িতে তারেক রহমানের শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু ও জুবাইদার বড় বোন শাহিনা জামান বিন্দু ছিলেন।
বিএনপির মিডিয়া সেলের কর্মকর্তারা জানান, মাহবুব ভবনে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটান তারেক রহমান। মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে ‘প্রাণিপ্রেমী তারেক রহমান’ শিরোনামে একটি ছবিও পোস্ট করা হয়। ছবিতে দেখা যায়, ছোট একটি ঘরে কয়েকটি বিড়াল। ঘরটির সামনের দিক নেট দিয়ে আটকানো। নেটের ফাঁকা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বিড়ালগুলোকে আদর করছেন তারেক রহমান।
এদিন রাত ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে অসুস্থ মা খালেদা জিয়াকে দেখতে যান তারেক রহমান। তিনি স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছান বলে জানান বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।
এদিকে দেশে ফেরার দিন উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাতে ফেসবুকে এক পোস্ট দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার দিনটা সারা জীবনের জন্য আমার হৃদয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আমি আবার আমার মাতৃভূমির মাটিতে পা রেখেছি। আপনাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা, ঢাকার রাস্তাজুড়ে মানুষের ঢল, আর লাখো মানুষের দোয়া… এই মুহূর্তগুলো আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। সবার প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা।’
স্বদেশে ফেরার ঐতিহাসিক মুহূর্তটি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে তার দেশে ফেরার সময় এবং সার্বিকভাবে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার আমি শুধু কোনো স্বপ্নের কথা বলিনি, আমি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি বাস্তব পরিকল্পনার কথা বলেছি; যে বাংলাদেশে শান্তি ও মর্যাদা থাকবে, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজেকে নিরাপদ ও সম্মানিত মনে করবে, আর প্রতিটি শিশু আশার আলো নিয়ে বড় হবে।’










