শিল্প কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত না হওয়ায় দিনদিন ক্যাপটিভ জ্বালানির ওপর উৎপাদকদের নির্ভরতা বাড়ছে। উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে ও ব্যবসায়িক ক্ষতি থেকে বাঁচতে ক্যাপটিভের ওপর জোর দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। অন্যদিকে সরকার ক্যাপটিভ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করছে। এ প্রেক্ষিতে ক্যাপটিভ নির্ভরতা কমাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টগুলো সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না।

রোববার (১২ জানুয়ারি) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এসব বিষয়ে কথা বলেন বক্তারা। সেমিনারটির আয়োজন করে ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইইএসডি)।

সেমিনারে ক্যাপটিভ পাওয়ারের ওপর গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. আমান উদ্দীন।

‘‌ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশন ফর ইন্ড্রাস্ট্রিজ ইন বাংলাদেশ: ওভারভিয়্যু অ্যান্ড রিকমেন্ডেশনশ’ শিরোনামে পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টের বিদ্যুতের গড় কার্যকারিতা প্লান্টগুলোর সক্ষমতার ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ৬৭টি শিল্পের গ্যাস পরিচালিত ২১২টি প্লান্টের ওপর এ গবেষণা করা হয়। মোট ৩৩২ দশমিক ১২ মেগাওয়াট সক্ষমতার এ প্লান্টগুলোর সর্বোচ্চ কার্যকারিতা দেখা গেছে ৪০ শতাংশ।

তিনি বলেন, প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ শিল্পে গ্যাস নিঃসরিত তাপ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা নেই এবং ৬১ দশমিক ২ শতাংশ শিল্প-কারখানা জ্যাকেট ওয়াটার তাপ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা ব্যবহার করে না। এ ব্যবস্থাগুলো প্রয়োগ এবং কার্যকর জেনারেটর ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যাপটিভের সামগ্রিক সক্ষমতা ৭৩ শতাংশেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন কিউবিক ফিট (বিসিএফ) প্রাকৃতিক গ্যাস সাশ্রয় করা যাবে।

সেমিনারে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ২০০৯ সালে যখন জ্বালানি খাত নিয়ে মাস্টার প্ল্যান করা হয়, তখন প্রত্যাশিত জাতীয় উৎপাদন চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি দেখানো হয়েছিল। আমরা প্রাইমারি জ্বালানিতে বিনিয়োগ না করে সেকেন্ডারি জ্বালানিতে বিনিয়োগে উৎসাহী বা আগ্রহী ছিলাম। এর ফলে একটার পর একটা পাওয়ার প্লান্ট নিয়ে এসেছি। তাদেরকে তিন বছরের জন্য নিয়ে আসা হলেও এখনো ক্যাপাসিটি চার্জসহ ইত্যাদি দিয়েই যাচ্ছি। ওই সময়ে আমরা যদি প্রাইমারি এনার্জিতে মনোযোগ দিতাম, তাহলে সেকেন্ডারি এনার্জিতে পরবর্তী সমস্যাগুলো হতো না। এ ভর্তুকির বোঝা আমাদেরকে এখনো বহন করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্র কখনো সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার কাজে লাগাতে পারে না। কিন্তু সেখানে ঠিকই প্রচুর জ্বালানি ব্যবহার হয়। আমরা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারলে ক্যাপটিভ শুরুই হতো না। ক্যাপটিভ নির্ভরশীলতা কমাতে চাইলে অবশ্যই নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে হবে।

সেমিনারে বুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বলেন, আমাদের মূল সমস্যা ফুয়েলের সংকট, এটা না বলে বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলা ঠিক নয়। ক্যাপটিভ খাতের বিদ্যুৎ দিয়ে প্রস্তুতকৃত পণ্য রপ্তানি করা হয়। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি ইউরোপ-আমেরিকার ভোক্তাদের জন্য এ খাতে ভর্তুকি দিচ্ছি? তাদের জন্য আমি কেন ভর্তুকি দেব? আমার এ ভর্তুকিটা দিতে হচ্ছে। পিডিবির ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকা দেনা হয়ে আছে, এর সবটাতো লুট হয়ে যায়নি। নানাভাবে ভর্তুকি দেয়াওতো এটার একটা কারণ।

অধ্যাপক হাসিব বলেন, আমাদের ফোকাস ছিল ১০০ ভাগ বিদ্যুৎ দিয়ে দেব। কিন্তু সেটা কতটুকু মানসম্পন্ন সেদিকে তাকানো হয়নি। সে বিদ্যুৎ কয়ঘণ্টা থাকছে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়নি। এখন আমাদের এ নির্ভরযোগ্যতার দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার।

বুয়েটের আইইএসডির পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আলী আহাম্মদ শওকত চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে আরো অংশগ্রহণ করেন শিল্প ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা।