কভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সামনে রেখে একাধিক ফোরামের পক্ষ থেকে উঠে এসেছে বিভিন্ন ধরনের বাধার পূর্বাভাস। এসব উত্তেজনায় নতুন প্রভাব ফেলেছে ইউক্রেন-রাশিয়া ও পরবর্তী গাজা-ইসরায়েল সংঘাত। এর মাঝে নতুন করে সামনে এসেছে দেশগুলোর রেকর্ড পরিমাণ ঋণ। এ অবস্থায় দেশে দেশে কৃচ্ছ্রসাধনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দ্য ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স (আইআইএফ)। সংস্থাটির  আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। খবর ইউরো নিউজ।

ভারত ও চীনের মতো উদীয়মান বাজারের ক্রমবর্ধমান ঋণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিষ্ঠিত বাজারের মূল্যস্ফীতি ও সুদহার বৈশ্বিক ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইআইএফের প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বিশ্বব্যাপী ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এতে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা একটি রেকর্ড।

পরপর টানা তিন প্রান্তিকে ঋণের পতনের পর বৈশ্বিক ঋণ-টু-জিডিপি অনুপাত জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। আইআইএফের তথ্যানুসারে, ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতায় মার্চে শেষ হওয়া প্রান্তিকে নেতৃত্বের আসনে রয়েছে উদীয়মান বাজারগুলো। এর মধ্যে সামনে রয়েছে চীন, ভারত ও মেক্সিকো।

প্রতিষ্ঠিত বাজারে এ প্রান্তিকে ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল কম। তবে এসব দেশে এখনো উদীয়মান অর্থনীতির তুলনায় ঋণের মাত্রা বেশি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরো জোন, জাপান ও যুক্তরাজ্যকে প্রতিষ্ঠিত বাজার হিসেবে বিবেচনা করে আইআইএফ। উন্নত অর্থনীতি বিবেচনায় নিলে মার্চে শেষ হওয়া প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান রেকর্ড ঋণ নিয়েছে। এরপর রয়েছে আয়ারল্যান্ড ও কানাডা। তবে সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিতে পতন লক্ষ করা গেছে।

উচ্চ সুদহার রাষ্ট্রীয় বাজেটে চাপ সৃষ্টি করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। উচ্চ সুদহার রাষ্ট্রীয় ঋণ বাড়িয়ে দেয়। কেননা এতে সরকারের ঋণ নেয়ার খরচ বেড়ে যায়, এর চাপ পড়ে বাজেটে। খাত বিবেচনা করলে, সাম্প্রতিক কালের মধ্যে সুদহার বেশি রয়ে যাওয়ায় মোট পরিমাণের হিসাবে ওই প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠিত বাজারে সরকারি ব্যয় ছিল সবচেয়ে বেশি। আইআইএফের তথ্যানুসারে, বেশ কয়েকটি উন্নত অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় ঋণ হ্রাসও করেছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রতিষ্ঠিত বাজারে মোট ঋণের মাত্রা প্রথম প্রান্তিকে ব্যাপকভাবে স্থিতিশীল ছিল। এ সময় সুদহারের কারণে গৃহস্থালি ও নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনের ঋণ হ্রাস পেয়েছে। এটি সরকারি ও আর্থিক খাতের ঋণের ক্রমাগত বৃদ্ধির সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করেছে।

তবে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক বাধা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্বব্যাপী ঋণ আরো বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইআইএফ। উদাহরণ হিসেবে চীন থেকে ইউরোপে ব্যাপকভাবে গ্রিন টেকনোলজি রফতানির কথা বলা যায়। চীন থেকে রফতানি বৃদ্ধির সঙ্গে স্থানীয় শিল্পকে প্রণোদনা দেয়ার চেষ্টা করতে পারে অঞ্চলটি, যা ঋণের প্রবণতা বাড়াতে পারে। আবার ইউরোপ যদি চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আমদানি ও দেশীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। ফলে সীমিত কাঁচামালের জন্য বিশ্বব্যাপী ব্যাপক মূল্যস্ফীতি হতে পারে।

আইআইএফ অনুসারে আরেকটি ঋণ ঝুঁকি হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন ডলারকে শক্তিশালী করতে পারে। এর অর্থ হলো ডলারের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া ঋণ পরিশোধ আরো ব্যয়বহুল হবে।

উচ্চ সুদহার বিশ্ব অর্থনীতিকে আরো বেশি ঋণের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলেও সতর্ক করেছে আইআইএফ। ঋণ যত বড় হবে সুদ খরচও তত বাড়বে, এর মাধ্যমে ঋণের একটি দুষ্ট চক্র তৈরি হতে পারে।

ক্রমবর্ধমান ঋণ নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ এবারই প্রথম নয়। এপ্রিলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ বিষয়ে সতর্ক করে দেয়। সংস্থাটি বলেছিল, দেশগুলোর টেকসই পাবলিক ফাইন্যান্স রক্ষা এবং বাজেট ও ঋণের মধ্যে ভারসাম্য পুনর্গঠনে চেষ্টা করতে হবে।