ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট উপজেলার বিলডোরা ইউনিয়ন। একটু নিচু এলাকায় হওয়ায় বর্ষাকালে অধিকাংশ সময় এখানে পানি জমে থাকে। দারিদ্র্যপীড়িত এ এলাকার বেশির ভাগ মানুষের প্রধান পেশা কৃষিকাজ হওয়ায় এ সময়টাতে তেমন কোনো কাজও থাকে না। তাই অনেকেই বর্ষাকালে শীতল পাটি বুনে জীবিকা নির্বাহ করেন। 

স্বাধীনতার আগে থেকেই বিলডোরা ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামের বেশির ভাগ পরিবার শীতল পাটি তৈরি করে। পাশাপাশি এ উপজেলার স্বদেশী ইউনিয়নের পিকা বন্যাপাড়া এলাকার কিছু পরিবারও শীতল পাটি বুননের সঙ্গে সম্পৃক্ত। 

বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের নারীরা শীতল পাটি বুনে অবসর সময় পার করেন। পাশাপাশি পুরুষরা তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন। যে কারণে সংসারে বাড়তি আয় হয়। ফলে স্থানীয়দের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। অথচ এক সময় প্লাস্টিকের দাপটে এ শিল্পটি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হিসেবে শীতল পাটি মানুষের ঘরে ঘরে সমাদৃত। গ্রাম কিংবা শহরের সৌখিন মানুষদের কাছে শীতল পাটির বেশ কদর ছিল। এক সময় গ্রামের বাড়িতে অতিথিদের বসার জন্য দেয়া হতো শীতল পাটি। বিয়ে, সুন্নতে খতনাসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। 

স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্লাস্টিক ও রেক্সিনের পাটির দাপটে ও দাম বেশি হওয়ায় শীতল পাটির চাহিদা কমে গিয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর আবারো চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। অগ্রিম অর্ডার দিয়েও তীব্র গরমের সময় চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। 

শীতল পাটি বুননের প্রধান কাঁচামাল মুর্তা বেত। বাড়ির পুরুষরা সীমান্তবর্তী পাহাড় ঘেরা উপজেলা হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মুর্তা গাছের ঝোপ কিনে নিয়ে আসেন। শুষ্ক মৌসুমে গাছ পরিপক্ব হলে কেটে বেত করা হয়। প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়ার কারণে এ পাটি স্বাস্থ্যসম্মত বলেও দাবি কারিগরদের।

হালুয়াঘাটের দাসপাড়া গ্রামের শীতল পাটির কারিগর লক্ষ্মী রানী সরকার বলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই আমি এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছি। আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় ১৫ বছর। এর আগে শীতল পাটি কীভাবে তৈরি করতে হয় জানতাম না। আমার শাশুড়ির কাছেই বুননের হাতেখড়ি।’

তিনি জানান, প্রথমে বেতগুলো ভালোভাবে পানিতে সেদ্ধ করে নেয়া হয়। নকশা ফুটিয়ে তুলতে সেগুলো রোদে শুকিয়ে বাজার থেকে নিয়ে আসা রঙ মিশিয়ে আবারো সেদ্ধ করা হয়। তারপর হয় বুননের কাজ।

এভাবে মাপ ও নকশাভেদে ছোট আকারের একটি পাটি বুনতে ছয়-সাতদিন সময় লাগে। বিছানায় ব্যবহারের বড় মাপের পাটি তৈরি করতে ১৫-২০ দিন সময় লেগে যায়, যা দেড় হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। 

লক্ষ্মী রানী সরকার আরো বলেন, ‘আগে পাটির চাহিদা একেবারেই কম ছিল, তাই বাড়ির কাজের ফাঁকে ফাঁকে করতাম। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অন্য কাজ বাদ দিয়ে এখন শুধু শীতল পাটির কাজই করি।’

দাসপাড়া গ্রামের আরেক কারিগর ইতি রানী সরকার জানান, কয়েক বছর ধরে শীতল পাটির চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনাকালে শীতল পাটি তৈরির কাজ এক রকম বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। বাজারে প্লাস্টিক ও রেক্সিন পাটির কারণে বেশি দাম দিয়ে কেউ নিতে চাইত না। কিন্তু হঠাৎ কয়েক বছর ধরে গরম বেড়ে যাওয়ার কারণে এ পাটির চাহিদাও বেড়ে গেছে। 

হালুয়াঘাটের কারিগররা নামাজের পাটি, সাধারণ পাটি, পিট্ট বেতির পাটি ও বোক্কার বেতির পাটি তৈরি করেন। 

স্থানীয় কারিগর কমল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘আমার দাদী, মা ও স্ত্রী সবাই এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটি আমাদের বংশগত পেশা।’

তিনি আরো জানান, তার গ্রামে ৫০টি পরিবারের নারী সদস্যরা সবাই এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে মাঝে কয়েক বছর চাহিদা কম থাকলেও সাম্প্রতিককালে তা ব্যাপক হারে বেড়েছে। ফলে এখানকার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই পাইকার ও সাধারণ মানুষ শীতল পাটি নেয়ার জন্য হালুয়াঘাটে আসেন। তবে চাহিদামতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ শীতল পাটি হাতে বুনতে অনেক সময় লাগে। পাশাপাশি চাহিদা বাড়লেও কারিগর সেভাবে বাড়েনি।

এছাড়া আগে শীতল পাটি তৈরির মুর্তা গাছের বেত এই এলাকাতেই পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে এসব জমি ফসলের আওতায় নিয়ে আসার কারণে বিভিন্ন উপজেলায় খুঁজে খুঁজে বেত গাছ কিনে আনতে হচ্ছে। ফলে খরচও কিছুটা বেড়ে গেছে।

সুভাষ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘শীতল পাটি তৈরির প্রক্রিয়াটি সময় ও শ্রমসাপেক্ষ। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কৃষিকাজ না থাকায় বাড়ির নারীরা বেশির ভাগ সময় শীতল পাটি তৈরিতেই ব্যস্ত থাকেন। আর তাদের সহায়তা করেন পুরুষরা।’

শীতল পাটির পাইকার বাদন বসাক বলেন, ‘আমি হালুয়াঘাট থেকে শীতল পাটি কিনে ঢাকার একটি দোকানে বিক্রি করি। সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়।’

তিনি জানান, কারিগরদের কাছে থেকে আগে একটি শীতল পাটি ৩০০-৪০০ টাকায় কেনা যেত। এখন সেটা হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। 

হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবিদুর রহমান বলেন, ‘আমি খোঁজ নিয়ে এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্তদের আর্থিক অনুদান কিংবা ঋণের ব্যবস্থা করে দেব।’