বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৪ সালসহ টানা তিন বছরের মতো কমেনি। বরং দুই বছর ধরে ২ দশমিক ৬ শতাংশে স্থির রয়েছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসের তুলনায় ভালো হয়েছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে সার্বিকভাবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার ২০২৬ সাল নাগাদ কভিড-১৯ মহামারীপূর্ব হারের তুলনায় কম থাকবে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্ট প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। খবর রয়টার্স।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, কভিড-১৯ মহামারীর পর ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়ে। ২০২৩ সালেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪ সালেও এ হার ২ দশমিক ৬ শতাংশে স্থির রয়েছে, যা জানুয়ারিতে দেয়া বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসের চেয়ে দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আগের পূর্বাভাস প্রস্তুত করা হয়েছিল।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ চাহিদা ও মূল্যস্ফীতির কারণে সুদহার কমানোর বিষয়ে ফেডারেল রিজার্ভ তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এর আগে দ্বিতীয় বছরের মতো দেশটির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। এমনকি চলতি বছরের শুরুতেও ১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু এখন বিশ্বব্যাংকই ওই পূর্বাভাস পরিবর্তন করে ২ দশশিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোশে জানান, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীল থাকার পূর্বাভাসের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮০ ভাগ ভূমিকা রেখেছে।
আয়হান কোশে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবশেষে আমরা একটা ভালো অবস্থানে পৌঁছেছি। মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদহার বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু স্বস্তির ব্যাপার, এতে বড় অর্থনীতির দেশগুলোয় বৃহদাকারে বেকারত্ব বা অন্য কোনো সমস্যা তৈরি হয়নি। ফলে প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল অবস্থানে এসেছে। কিন্তু সামনের দিনগুলোয় শ্লথগতিতে প্রবৃদ্ধি হতে পারে; এটাই এখনকার চ্যালেঞ্জ।
এর আগে বিশ্বব্যাংক ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জন্য ২ দশমিক ৭ শতাংশ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল, যা কভিড-১৯ মহামারীপূর্ব ৩ দশমিক ১ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। সংস্থাটি এখন বলছে, আগামী অন্তত তিন বছর সুদহার ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের গড় সুদহারের চেয়ে দ্বিগুণ হবে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর ঋণের বোঝা আরো বাড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ৮০ শতাংশ জনসংখ্যা এবং প্রবৃদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করে, এমন দেশগুলোয় ২০২৬ সাল নাগাদ করোনাপূর্ব সময়ের তুলনায় ধীরগতিতে প্রবৃদ্ধি হবে। এক্ষেত্রে গরিব দেশগুলোর ভবিষ্যৎ আরো নাজুক বলে জানান বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দারমিত গিল। তিনি বলেন, ‘এ সময়ের মধ্যে দেশগুলো মন্দ ঋণ, বাণিজ্য সংকোচন ও বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়বে। ফলে বারবার আন্তর্জাতিক সাহায্যের দ্বারস্থ হতে হবে।’
প্রতিবেদনে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় দীর্ঘ মূল্যস্ফীতির কারণে লম্বা সময়ের জন্য সুদহার বাড়িয়ে রাখার একটি বিকল্পের কথা বলা হয়েছে। এতে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মূল পূর্বাভাসের তুলনায় দশমিক ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট সুদহার বাড়িয়ে রাখার কথা বলা হয়, যাতে পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা যায়। তবে এতে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে চীনের প্রবৃদ্ধির আগের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ থেকে পরিবর্তন করে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ভারতের ৬ দশমিক ৪ থেকে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। তবে জাপানের প্রবৃদ্ধির হার দশমিক ৯ থেকে কমিয়ে দশমিক ৭ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোজোনের দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
গাজা, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।










