বাংলাদেশের অটোমোবাইল শিল্পের স্বনামধন্য ব্র্যান্ড মিতসুবিশি জাপানি প্রযুক্তি ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য বরাবরই গ্রাহকদের পছন্দের তালিকায় থাকে। গুণগত মান, আধুনিক ফিচারস, ওয়্যারেন্টি ও আফটার-সেলস সার্ভিস ইত্যাদি বিভিন্ন সেবা দিয়ে মিতসুবিশি গ্রাহক সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের অটোমোবাইলস সেক্টরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সম্প্রতি এই ইন্ডাস্ট্রির পরিবর্তন, মিতসুবিশির চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ, অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়ন ও ভবিষ্যতে টেকসই শিল্প গড়তে বিনিয়োগ ইত্যাদি নানা বিষয়ে কথা বলেছেন র্যানকন হোল্ডিংয়ের অটোমোটিভ ১ ডিভিশনের মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন হেড মোহাম্মদ ফাহিম হোসেন।
মোহাম্মদ ফাহিম হোসেন দীর্ঘসময় ধরে অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে এখানে কী কী পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাপানিজ গাড়ি এতো দীর্ঘসময় যাবত বাংলাদেশের মার্কেটে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার প্রধান কারণ নির্ভরযোগ্যতা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। আগে গ্রাহকদের কাছে ব্র্যান্ড বলতে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির গাড়িই ছিল। তবে বর্তমানে চাইনিজ ও ইউরোপিয়ান কিছু ব্র্যান্ডও দেশী মার্কেটে প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। আগে গাড়ি কেনা কার ডিলার বা বিক্রেতাদের পরামর্শ ও পরিচিত মানুষদের রিভিউ নেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর এখন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় গ্রাহকরা আরো সচেতন হয়েছে এবং গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে নানা দিক বিবেচনা ও পর্যাপ্ত রিসার্চ করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন আকর্ষণীয় ও অত্যাধুনিক ফিচারস দিয়ে গ্রাহকদের নতুন গাড়ি কিনতে আকৃষ্ট করছে। আমরাও তাদের ওয়ারেন্টি এবং ফ্রি আফটার-সেলস সার্ভিসের মতো সুবিধা দিচ্ছি।
র্যানকন হোল্ডিংয়ের অটোমোটিভ ১ ডিভিশনের মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন হেড হিসেবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাজের নানা দিক রয়েছে। তাই বিভিন্ন দিকে খেয়াল রাখতে হয়। বর্তমানে আমি র্যানকন-এর চারটি বিভাগের দায়িত্বে আছি— প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড মিতসুবিশি মোটরস (ফোর হুইলার কার), র্যাংগস ওয়ার্কশপ (অফটার-সেলস), সুজুকি (মোটরবাইক) ও মাহিন্দ্রা (এগ্রো মেশিনারিজ)। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এই বিভাগগুলোর উন্নয়নে কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন মার্কেট সেগমেন্ট সম্পর্কে বিভিন্ন নতুন ধারণাও নিচ্ছি। তাই কাজের চাপ থাকলেও দায়িত্বটা আমি এনজয়ও করছি। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাথে ক্রস-প্রোমোশনের সুযোগও তৈরি করছি। যদিও মার্কেটিং ইন্ডাস্ট্রিতে আমার ২১ বছরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তবুও এই দায়িত্ব আমাকে নিয়মিত নতুন কিছু শিখতে এবং চ্যালেঞ্জের থেকে উত্তোরণে সাহায্য করছে।
বর্তমানে দেশে এসইউভি বা সেভেন-সিটার গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। গ্রাহকদের চাহিদার এই পরিবর্তন্ন নিয়ে মতামত জানতে চাইলে ফাহিম হোসেন বলেন, গাড়ি কেনা এখন আর বিলাসিতা নেই, বরং প্রয়োজনীয়তা। ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও এসইউভি ও মাল্টিপারপাস কার বা ফ্যামিলি কারের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে গাড়ি কেনা একটি বড় সিদ্ধান্তও বটে। গ্রাহকরা একটি গাড়ি দিয়ে বিভিন্ন রকম কাজ সারতে পারবে সেই চিন্তা থেকেও গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। একটি গাড়ি দিয়ে অফিস যাতায়াত, বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়া-আসা, শপিং বা বাজার করা, গুরুত্বপূর্ণ ভারী মালামাল বহন অথবা পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে বা উইকেন্ড ট্রিপ প্ল্যান করে ভ্রমণ করা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানো যাবে এমন অপশনই গ্রাহকরা এখন খুঁজছে। একই সঙ্গে তারা এখন খরচ সম্পর্কে আরো সচেতন হয়েছে। তাই টাকা খরচ করে সেরা মানের পণ্যটিই তারা চাচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই মানুষ কার্যকারিতা ও ব্যবহারিকতার ভালো সমন্বয় চায়। এসব দিক বিবেচনা করে মাল্টিপারপাস কার হিসেবে গ্রাহকরা দিন দিন এসইউভি বা সেভেন সিটার গাড়ি কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশে নতুন গাড়ি, বিশেষ করে মিতসুবিশির মতো প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের কী কী চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ রয়েছে বলে তিনি জানান, মিতসুবিশি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অন্যতম প্রিমিয়াম কার ব্র্যান্ড। নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে মিতসুবিশি বরাবরই গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। আর ব্র্যান্ড যত প্রিমিয়াম ও জনপ্রিয় হবে, ব্র্যান্ডের পণ্যের প্রতি গ্রাহকদের প্রত্যাশাও দ্বিগুণ হয়ে যায়। তাই গ্রাহকদের বিভিন্ন রকম চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী সেরা পণ্যটি ডেলিভার করা অবশ্যই চ্যালেঞ্জের। তবে মিতসুবিশি বরাবরই সেই চ্যালেঞ্জ সাফল্যের সাথে অতিক্রম করেছে বলে আমি মনে করি। মিতসুবিশি সবসময় আধুনিক জাপানি প্রযুক্তির গাড়ি বাজারে এনেছে, যা মূল্য অনুযায়ী মার্কেট লিডার হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে বিশ্ব যত উন্নত হচ্ছে, গ্রাহকরাও আরো উন্নত প্রযুক্তির গাড়ি চাচ্ছে। এজন্য আমাদের নতুন এসইউভি মডেল আউটল্যান্ডার স্পোর্ট মার্কেট ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। আমরা বিভিন্ন মার্কেট সেগমেন্ট ও গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী মডেল বাজারে আনছি। আপনি যদি দুর্দান্ত একটি ফ্যামিলি কার চান তাহলে আপনার জন্য আছে মিতসুবিশি এক্সপ্যান্ডার; যদি স্টাইলিশ লুকিং, মেইড-ইন-জাপান প্রিমিয়াম গাড়ি চান আপনার জন্য আছে মিতসুবিশি এক্লিপ্স ক্রস; আর এসইউভি গাড়ি নিয়ে অফ-রোডিংয়ের অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে আছে মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার। সম্প্রতি লঞ্চ হওয়া স্টাইল, পারফর্মেন্স ও লেটেস্ট টেকনোলজি নিয়ে একটি অলরাইন্ডার মিড-সাইজ এসইউভি হিসেবে আছে আউটল্যান্ডার স্পোর্ট। আরো আছে, এল২০০ পিকআপ, এরই মধ্যে বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্যারামিলিটারি ও এনজিও প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং পজিটিভ ফিডব্যাক আমরা পাচ্ছি। এছাড়া আমরা প্রতিটি গাড়িতে পাঁচ বছর ওয়্যারেন্টি এবং তিনটি ফ্রি সার্ভিসিং সুবিধা দিচ্ছি।
মিতসুবিশি বরাবরই গুণগত মান নিশ্চিতে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়। আর গুণগত মানের সেরকম দামও থাকে। নিশ্চয়ই বর্তমানে অনেক সস্তা বিকল্প অপশন রয়েছে, অনেক গ্রাহক বাজেটের কারণে সেগুলোকেই নির্বাচন করেন, যা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যার সমাধানেও আমাদের কিছু পরিকল্পনা রয়েছে।
অটোমোবাইল সেক্টরে র্যানকনের ভিশন কী এবং এই ভিশনে মিতসুবিশি কেমন ভূমিকা রাখবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে র্যানকন একটি জনপ্রিয় নাম। র্যানকন বাংলাদেশে অনেক বিশ্বখ্যাত অটোমোটিভ ব্র্যান্ড বাংলাদেশে এনেছে। র্যানকন বাজারে সেরা মান ও দামের গাড়ি সরবরাহ করে আসছে। আমাদের মূল ভিশন হল দেশের অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিকে টেকসই করা। বাংলাদেশে অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলিং শুরু করা অন্যান্যদের মধ্যে র্যানকন অন্যতম। আমরা মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে অ্যাসেম্বল করছি। আগামী বছরগুলোতে আমরা এমন একটি ইন্ডাস্ট্রি গড়তে চাই, যেখানে আমাদের সব গাড়ি স্থানীয়ভাবে অ্যাসেম্বল বা তৈরি করা সম্ভব হবে। র্যানকন বর্তমানে এই লক্ষ্যেই কাজ করছে। এই লক্ষ্য অর্জনে গাজীপুরে অবস্থিত আমাদের আন্তর্জাতিক মানসম্মত ফ্যাক্টরিতে আমরা ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করছি।
বাংলাদেশের অটোমোবাইল সেক্টর আরো উন্নত করতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে সে বিষয়ে তিনি বলেন, আমার মতে, এই সেক্টর আরো উন্নত করতে শিল্পের উন্নয়নের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন গাড়ির উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। এর ফলে স্থানীয় বাজারে গাড়ির দাম কমানো সম্ভব হবে। সরকারী বিধি-নিষেধ আরও অটোমোবাইল-সেন্ট্রিক হওয়া উচিৎ। ট্যাক্স ও শুল্ক কাঠামো সহজ ও উৎসাহমূলক করা প্রয়োজন, যাতে নতুন ব্র্যান্ড ও প্রযুক্তি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া, অন্যান্য ব্র্যান্ডগুলোর গ্রাহক সেবা আরো উন্নত করা উচিৎ, বিশেষ করে আফটার-সেলস সার্ভিসের ক্ষেত্রে। মানসম্মত সার্ভিস ও ওয়্যারেন্টি গ্রাহকদের আস্থা ও সন্তুষ্টি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সর্বশেষ, এই ইন্ডাস্ট্রিতে আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন, বিশেষ করে স্থানীয় উৎপাদন সুবিধা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবলে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বাংলাদেশের অটোমোবাইল সেক্টরের আরো উন্নতি করবে এবং টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে।
তরুণ প্রজন্মের যারা এই ইন্ডাস্ট্রিতে ক্যারিয়ার গড়তে চায় তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, যেসব তরুণরা এই ইন্ডাস্ট্রিতে ক্যারিয়ার গড়তে চান, শুরুতেই তাদের ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি, ট্রেন্ড ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা বাড়াতে হবে। এছাড়া অটোমোবাইলের প্রতি আগ্রহ ও প্যাশন থাকতে হবে এবং গ্রাহকদের চাহিদা ও ক্রমাগত পরিবর্তনের প্রয়োজন বুঝতে হবে। এটি একটি বিশেষায়িত সেক্টর। একে ভালোভাবে বোঝার জন্য গভীর আগ্রহ প্রয়োজন। তরুণদের জন্য আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, তরুনরা নিজেকে এমনভাবে তৈরি করবে যাতে ডিসিশন-মেকিংয়ে তারা পারদর্শী হতে পারে। আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতে অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রিতে সফল ক্যারিয়ার গড়তে পারবে বলে আমি মনে করি।










