রাজধানীতে ‘যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক প্রভাব ও করণীয়’ শীর্ষক অ্যামচ্যাম সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (১৩ এপ্রিল) ঢাকার একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) এ সংলাপের আয়োজন করে।
গোলটেবিল আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিকারক ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিকারক শীর্ষস্থানীয় বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান, অ্যামচ্যাম সদস্য, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়, এনবিআর, ইপিবি, বিডা, ট্যারিফ কমিশন ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গবেষক এবং অর্থনীতিবিদরা অংশগ্রহণ করেন। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের বাণিজ্যিক উপদেষ্টা জন ফে এবং অন্যান্য দূতাবাস কর্মকর্তারাও সংলাপে অংশ নেন।
অ্যামচ্যাম সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের শীর্ষ রফতানি বাজার ও প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে উল্লেখ করেন, যারা পুঁজি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বীমা, আতিথেয়তা ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষতা সরবরাহ করছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের ৫০ বছরের সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পারস্পরিক শুল্ক সমন্বয় এবং বাণিজ্য বাধা দূরীকরণের লক্ষ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আহ্বান জানান। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা মোকাবেলায় গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন এবং বলেন যে অর্থনৈতিক কূটনীতির পর্যায়ে এখনো অনেক কাজ বাকি আছে। তিনি সরকারের কর্মকর্তা ও যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ এবং সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান।
এলএফএমইএবি’র সভাপতি ও অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের শীর্ষ রফতানি গন্তব্য এবং প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে ৬৭ শতাংশ অর্থনীতি ভোক্তাচাহিদা নির্ভর। তিনি বলেন, বৈচিত্র্য আনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি যথেষ্ট নয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ২ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করা বেসবল গ্লাভসের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন এবং ব্যক্তি-পর্যায়ের সম্পর্ক, সাপ্লাই চেইনের সুযোগ যেমন জুতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রগামী কাঁচামাল (চামড়া), এবং মূল্য নির্ধারণের সমস্যা সমাধান সাপেক্ষে সয়াবিনভিত্তিক ভোজ্যতেলে সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা বলেন।
তিনি জানান, এনবিআর ২০টি কম রাজস্ব আয়কারী পণ্যের (প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার) ওপর শুল্ক পর্যালোচনা করছে এবং অশুল্ক বাধা দূর করতে কাজ করছে। চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বিশেষ করে ২১ এপ্রিল নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ ইউএসটিআর বৈঠক সামনে রেখে।
তিনি বলেন, অশুল্ক বাধার মধ্যে ২৪/৭ কাস্টমস অপারেশন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকারের (আইপিআর) কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। হালনাগাদ পেটেন্ট আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতি ইউএসটিআর বৈঠকে উপস্থাপন করার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করেন, ৯০ দিনের শুল্ক বিরতির সময়—যা ছুটির মৌসুমের অর্ডারগুলোর সঙ্গে মিলে গেছে—যদি বাণিজ্য সংক্রান্ত স্পষ্টতা না থাকে, তাহলে বাংলাদেশ মৌসুমটি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে, যা কারখানার স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থপ্রদানে বিলম্ব ও ক্ষুদ্র কারখানার নগদ প্রবাহ সংকট বড় ধরনের অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। ৩৭ শতাংশ সম্ভাব্য শুল্কের প্রভাব মোকাবেলায় একটি পরিকল্পনা প্রয়োজন, কারণ প্রতিযোগী দেশগুলো এরই মধ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও ২৫২ মিলিয়ন ডলার রফতানি সত্ত্বেও, জুতা খাত গতি হারাতে পারে। এজন্য তিনি একটি সাপ্তাহিক অগ্রগতি ট্র্যাকার প্রস্তাব করেন, যা সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তার নেতৃত্বে ও বেসরকারি খাতের সহযোগিতায় পরিচালিত হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে কেবল শুল্কেই সীমাবদ্ধ না থেকে শুল্ক ছাড়াও অন্য দিকগুলোতেও"নজর দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে অধিকাংশ রফতানিযোগ্য পণ্যে এরই মধ্যে শূন্য বা প্রায় শূন্য শুল্ক আছে, কিন্তু অতিরিক্ত শুল্কের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় এবং এর একটি স্পষ্ট স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বিলুপ্তি প্রয়োজন।
অংশগ্রহণকারীরা ৯০ দিনের শুল্ক বিরতিকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগানোর ব্যাপারে সমর্থন জানান। ১০ শতাংশ ভিত্তিগত শুল্ক মার্জিন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা আস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে—এটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আবার ৩৭ শতাংশ শুল্ক ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। চীনের পোশাক রফতানিতে উচ্চ শুল্কের কারণে বাংলাদেশের সামনে বিশেষ করে সিনথেটিক পণ্যে একটি বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা দ্রুত কাজে লাগাতে হবে। এলডিসি উত্তরণের আগে গভীর ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ গড়ে তোলারও তাগিদ দেয়া হয় ও বেসরকারি খাতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়।
বাংলাদেশের স্পেশালিটি সোয়েটার খাতের চ্যালেঞ্জগুলোর কথাও উঠে আসে, যেখানে ১০ শতাংশ শুল্ক মার্জিন ক্ষয় করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো ও সিনথেটিকসের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী তিন মাসকে মার্কেট শেয়ার বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পণ্যে শুল্ক বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের রফতানিযোগ্য পোশাক কারখানাগুলো প্রতিযোগিতামূলক হলেও, শুল্ক প্রক্রিয়া সহজীকরণ, কাঁচামালের সংকট ও মূল্য চাপ মোকাবেলায় সরকারের সমর্থন জরুরি।
অংশগ্রহণকারীরা অপ্রয়োজনীয় রেডিও অ্যাকটিভিটি পরীক্ষার মতো অশুল্ক বাধা দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, যা বৈশ্বিক সনদ থাকা সত্ত্বেও আমদানি বিলম্বিত করছে। এ ধরনের বাধা, উচ্চ আমদানি শুল্ক ও কঠোর প্রক্রিয়া বিদেশী বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে, যার ফলে নীতিগত সহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকারিতা বাড়ানো জরুরি বলে জানানো হয়। কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ, বন্ডেড গুদাম চালু করা এবং চীন থেকে কাঁচামাল, বিশেষ করে তুলা আমদানির ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক।
বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তিন ধাপের কৌশল প্রস্তাব করা হয়: (১) রফতানির প্রকৃত শক্তি ও সুবিধা মূল্যায়ন, (২) লজিস্টিকস ও বন্দর খরচ কমিয়ে উৎপাদন ও শিপিং খরচ হ্রাস, (৩) প্রতিযোগীদের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে অবতরণকৃত পণ্যের খরচে শুল্ক ও বাণিজ্য বাধার প্রভাব বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে অনেক পোশাক রফতানি করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বাজারে তার অংশ মাত্র ১০ শতাংশ — যেখানে বাংলাদেশের মোট রফতানির ২০ শতাংশ পোশাক খাত থেকেই আসে। প্রশ্ন তোলা হয়, কেন সয়াবিন, এলএনজি ও স্ক্র্যাপ মেটালের মতো মূল আমদানি পণ্যগুলো শুল্ক না থাকলেও বাড়েনি — যার পেছনে অশুল্ক বাধা ও অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দায়ী। এসব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদভাবে অপসারণ করা উচিত যাতে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস পায় এবং তথ্য-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতির প্রসঙ্গে, উচ্চ মানসম্পন্ন মার্কিন তুলা দিয়ে উৎপাদিত পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধার প্রস্তাব দেয়া হয়, যা দুই দেশের জন্যই লাভজনক হবে। ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ শুল্ক কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, তবে বিশেষ করে ক্ষুদ্র কারখানার জন্য মূল্য চাপ এখনো রয়ে গেছে, যাদের জন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি ৪৭ শতাংশ বেড়েছে—মূলত শুল্ক প্রভাবের পূর্বাভাসে অগ্রিম অর্ডারের কারণে। সাময়িক পতন আসলেও বছর শেষে ইতিবাচক প্রবণতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, খরচ হ্রাস ও চীনের পরিবর্তিত বিশ্ব বাণিজ্য ভূমিকাকে কাজে লাগাতে হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রযুক্তি খাতে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়, যেখানে এনবিআরকে পুরনো এইচএস কোড হালনাগাদ করতে বলা হয়, কারণ এর ফলে ভুল কর বসানো হচ্ছে। হার্ডওয়্যার আমদানিতে ১৫.৫ শতাংশ এবং সফটওয়্যারে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত কর বসানো হচ্ছে, যা ডিজিটাল অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এইচএস কোড হালনাগাদে বিলম্ব ও আইটি পার্ক বিনিয়োগকারীদের জন্য কর ছাড়ের অসঙ্গতিও উল্লেখ করা হয়। এ সমস্যাগুলোর সমাধানে এনবিআরের সঙ্গে একটি ওয়ার্কশপ আয়োজনের প্রস্তাব দেয়া হয়।
এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি) মোহাম্মদ বেলাল হোসেন চৌধুরী জানান, সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউসের জন্য খসড়া আইন প্রণয়নের কাজ চলমান আছে, যা দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানে সহায়ক হবে। তিনি বাংলাদেশের শক্তিশালী বন্ড সংস্কৃতির কথা তুলে ধরেন এবং এনবিআরের সংস্কারমূলক সহায়তা ও লিড টাইম কমানোর উদ্যোগের কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্র অর্থায়িত প্রকল্প এবং বৈশ্বিক আমদানি পথ ব্যবহার করে আমদানিনির্ভরতা থেকে রফতানির সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান। আসন্ন আইন অনুযায়ী, আরো খাতে বন্ডেড সুবিধা সম্প্রসারিত করা হবে এবং এর জন্য প্রশিক্ষিত একটি দল থাকবে যারা ব্যতিক্রমধর্মী কার্গো পরিচালনা করবে। বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো বন্ড সিস্টেম এখন চালু, এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও ইনভয়েসিং চ্যানেল কাজে লাগাতে আরো গভীর সহযোগিতার আহ্বান জানান। অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারাও আলোচনায় অংশ নেন এবং যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।










