তা নিয়ে কিছুটা আফসোস রয়েছে। বণিক বার্তার এ আয়োজন আমাদের সহযোগিতা করার জন্যই। তাতে আমাদেরও সুবিধা হয়। নানা ধরনের মতামতের ভিত্তিতে নিজস্ব কর্মপন্থা নির্ধারণ করা সহজ হয়। তাই প্রথম থেকে উপস্থিত থাকতে না পারলেও সংক্ষেপে আয়োজনের বক্তব্যগুলো সম্পর্কে জেনে নিয়েছি। এখানে বলে নেয়া ভালো, দীর্ঘ ১৭ বছর এক স্বৈরাচারী শাসন কাঠামো দেশের সব ধরনের ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে দিয়েছিল। বিচার বিভাগ শক্তিশালী নয়, আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই। প্রশাসনিক কাঠামোও একেবারে ধসে পড়েছে।

বিশেষত আমি যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছি, সেটির অবস্থা আরো নাজুক। মাত্র ছয় মাস হলো আমি এ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছি। এ কয়দিনে মনে হয়েছে, কোনো পরিকল্পনা করে মন্ত্রণালয়ের কাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্য অতীতে কাজ হয়নি। কারণ পাওয়ার স্টেশন হয়েছে। ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আমাদের নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু এ সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গেলে জ্বালানি প্রয়োজন। জ্বালানি সহজলভ্যতার অংশ হিসেবেই অনুসন্ধান বাড়াতে হয়। কিন্তু বিগত সময়ে তার ঘাটতিই বেশি দেখা গেছে। ১৭ বছরে জ্বালানি তেল-গ্যাস অনুসন্ধান হয়নি, এমনকি একটা কূপও খনন করা যায়নি। গোটা দেশই এখন আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আমদানি করা হলেও ব্যবস্থাপনা ও মজুদ পরিকল্পনাও তেমন হওয়া জরুরি ছিল। আমদানি নীতির অধীনে সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামো গড়লে অন্তত আমাদের এমন জটিলতায় পড়তে হতো না।

এলএনজি আমদানি ও তা খালাস করার জন্য ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) লাগবে। বর্তমানে দেশে মাত্র দুটো টার্মিনাল সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি একটিতে আগুন লেগেছিল। সৌভাগ্যক্রমে এলএনজিবাহী একটি জাহাজ সেখানে নোঙর করার আগেই সরে গিয়েছিল। না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনাই ঘটত। এ সমস্যার দরুন আমরা এলএনজি সরবরাহ করতে পারিনি। গ্যাসের ওপর চাপ পড়ে গেছে। ময়মনসিংহসহ অনেক জায়গায় গ্যাস মিলছে না। অনেক স্থানে গ্যাসের ভোগান্তি। সিএনজির দীর্ঘ সারি, তারা গ্যাস পাচ্ছে না। অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন, এমনটিও সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে। এটি এখন নিত্যদিনেরই চিত্র হয়ে উঠেছে।

খুলনায় গ্যাসচালিত তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। তিনটিই নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকার কারণও রয়েছে। ভোলায় গ্যাস পাইপলাইন হবে। সে পাইপলাইন দিয়ে নির্বিঘ্নে গ্যাস সরবরাহ করা হলে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সক্রিয় হতে পারবে। এদিকে ভোলায় পাইপলাইন নিয়েও আমাদের চিন্তাভাবনা করতে হচ্ছে। এ পাইপলাইন নির্মাণ টেকসই হবে কিনা, কতটা বিনিয়োগ করা জরুরি আবার এর সক্ষমতা কতটুকু—এসব ভাবতে হচ্ছে। পাইপলাইন নির্মাণের পর একসময় গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার পর আমাদের কোনো রিটার্ন আসবে কি, এ নিয়ে প্রতিদিনই আলোচনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এসব স্থবিরতার কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এখন জাদুঘর হয়ে গেছে। কয়লাচালিত বিদ্যুৎ"কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে খনিগুলোর সমন্বয় করা গেলে কিছুটা স্বস্তি মিলত। এখন আমরা সামান্য কয়লা পাচ্ছি। কারণ আমাদের উন্মুক্ত কয়লা খনি নেই। উন্মুক্ত কয়লা খনি না থাকলে ভূগর্ভস্থ খনি থেকে বেশি কয়লা আহরণ করা যায় না। সর্বোচ্চ ১০-১৫ শতাংশ আহরণ করা যেতে পারে। এর বেশি হয় না। এখন কয়লাখনির কাছাকাছি আমাদের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। চীনা বিদ্যুৎ কেন্দ্রও আছে। সেগুলোকে ব্যবহার করা হয় আবার মাঝেমধ্যে এ কেন্দ্রগুলো অচলও হয়ে যায়। ওই সময় কয়লার মজুদ বাড়ে, কিন্তু আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি না।

সবচেয়ে বড় সমস্যা, সরকারকে বিশাল অংকের ক্যাপাসিটি চার্জ বহন করতে হয়। সভরিন গ্যারান্টি দেয়ায় এ চার্জ সরকারকেই বহন করতে হচ্ছে। যারা ক্যাপাসিটি চার্জে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের জন্য নিশ্চয়তা ব্যাংক। এ ধরনের নিশ্চয়তা দেয়ায় অর্থ পরিশোধে রাষ্ট্র আইনগতভাবে বাধ্য। যত চেষ্টাই করা হোক না কেন, এটি এড়ানো যাবে না। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আমি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছি। জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায়ই আমাদের নিয়ে বৈঠক করেন। কীভাবে এ খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় সেসব বিকল্প অনুসন্ধানে আমরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কাজটি ভীষণ কঠিন। জ্বালানি বিষয়টিই জটিলতায় পরিপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জটিলতা আরো বেড়েছে ও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কাতার ও আবুধাবির সঙ্গে এলএনজি আমদানি প্রসঙ্গে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চুক্তিগুলো কার্যকর নেই। এজন্য আমাদের বিকল্প বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প বাজার খুঁজতে গেলে ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। এ কারণেই আমাদের চড়া দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি আলোচনাও উত্থাপিত হয়েছিল। এভাবে বাড়তি মূল্যে জ্বালানি পণ্য কেনা হলে বাজেটে এ খাতের জন্য বরাদ্দকৃত ভর্তুকিও শেষ হয়ে যাবে। বেশিদিন আমরা অব্যাহত রাখতে পারব না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সীমাবদ্ধতার কথাও বিবেচনা করা জরুরি। পরিস্থিতি এমন যে আমরা বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে অল্প দামে বিতরণ করছি। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এটি একটি প্রতিবন্ধকতা। এরই মধ্যে ৬৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া বিল রয়েছে। এগুলোর নিষ্পত্তি কীভাবে হবে তা আমারও জানা নেই।

বকেয়া ৬৭ হাজার কোটি টাকার বিল বর্তমান বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে যুক্ত করে কীভাবে আহরণ করা যায়, এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। এটা অনেক বড় চাপ। কিন্তু ভীত হওয়ার কিছু নেই। সংকট আমরা আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে সামলানোর চেষ্টা করছি। আমি নিজে ব্যবসা করে এসেছি। ব্যবসায়ীদের দুঃখ ও হতাশা সম্পর্কে আমার ভালোই মানসিক ধারণা রয়েছে। এমনকি ব্যাংকের সংকটও আমি অনুধাবন করতে পারি। বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা যেভাবে ব্যবসা করেছি ও শিল্প খাতকে গড়েছি তার নিরিখে বলা যায়, আমাদের চেয়ে সাহসী আর কেউ নেই। কারণ দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন করে অন্তত ৩০ শতাংশ ব্যাংককে ফেরত দিতে হয়, তারপর অন্যান্য ব্যয়ও নিয়মিত মেটাতে হয়। এসবের পর মুনাফা করার কাজটি বাঙালিই পারে। অন্য কেউ পারবে বলে আমার মনে হয় না। পৃথিবীর আর কোথাও এমনটি দেখা যায় না। আমাদের মধ্যে ওই মনোবল ও সাহস ঠিকই রয়েছে।

অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে হলে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। আমাদের পরিকল্পনা ও ভাবনায় বিষয়টিও রয়েছে। কনক্লেভে অনেকেই জানিয়েছেন ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ব্যাংকে ঋণ মিলছে না। টাকা ফুরিয়ে গেছে। ব্যাংকের সমস্যার কারণে অনেক মানুষের জীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে। আমার নিজেরই স্বজনদের অনেকে অবসরের পর কিছু টাকা ব্যাংকে সঞ্চয় করেছিলেন। বিশেষত ইসলামী ব্যাংকগুলোয়। এভাবে তারা একটা নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা ভাবতে পারতেন। কিন্তু ব্যাংকে অর্থের অভাব থাকায় তাদের কাছে কিছু নেই। এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এখন লুটপাট হয়ে যাওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার জন্য আশ্বস্ত করতে হচ্ছে। আমাদের বাজেটেও ওই প্রতিশ্রুতি রয়েছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমাদের নিয়মিত আমদানি করতে হচ্ছে। এসব সংকটের মধ্যেই কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবা অর্থাৎ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই দেশে উদ্যোক্তা তৈরি করেছেন। বাংলাদেশে উদ্যোক্তা বাড়ানোর সূচনা তার মাধ্যমেই। তিনি এক নির্দেশে উদ্যোক্তাদের ২০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করেন। বাঙালি উদ্যোক্তা হওয়ার কাজে উৎসাহিত হলো। এভাবেই বাংলাদেশের বাণিজ্য জগৎ অনেক দূর এগিয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। জিয়াউর রহমান যে চেষ্টা করেছিলেন, একই পদ্ধতিতে তার ছেলেও কাজ করছেন। ব্যাংক সুবিধা যাতে আরো সহজলভ্য হয়, সেজন্য কাজ করে চলেছেন।

সোলারের প্রসঙ্গে আসা যাক। বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সম্প্রতি আমরা একটি সোলার পলিসি ঘোষণা করেছি। এই প্রথম কোনো সোলার নীতিমালা ঘোষণার পর সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) প্রকাশ্যে এর প্রশংসা করেছে। সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়া সহজ বিষয় নয়, কিন্তু তারা আমাদের এ নীতিমালাকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছে। নীতিমালাটি পুরোপুরি বিনিয়োগবান্ধব। এখানে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ আমার বিশ্বাস, একজন বিনিয়োগকারী যদি তার বিনিয়োগের যথাযথ রিটার্ন না পান, তাহলে তিনি কেন বিনিয়োগ করবেন? পাকিস্তানের উদাহরণও এখানে এসেছে। পাকিস্তান একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সোলার সরঞ্জাম আমদানি করে মানুষের কাছে সহজলভ্য করে দিয়েছিল। মানুষ নিজেরাই সোলার স্থাপন করেছে এবং সেখানে সোলারের বিস্তার ঘটেছে। আমরা অবশ্য সেই মডেলে যাচ্ছি না। আমাদের পরিকল্পনা হলো ফিসক্যাল সাপোর্ট দেয়া। অর্থাৎ, কর-সুবিধার মাধ্যমে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা। আমরা সোলার খাতে বিদ্যমান বিভিন্ন কর কমিয়ে এনেছি, অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর নির্ধারণ করেছি এবং ট্যাক্স হলিডে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাংলাদেশে ট্যাক্স হলিডে বরাবরই শিল্পায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তান আমলেও এ ধরনের নীতির মাধ্যমে শিল্প খাতকে উৎসাহ দেয়া হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা সোলার খাতে একই ধরনের নীতিগত সহায়তা দিচ্ছি। এখন সারা বিশ্বেই সোলার বিদ্যুতের ট্যারিফ কমে আসছে। কারণ সূর্যের শক্তির জন্য কোনো জ্বালানির খরচ নেই। মূল ব্যয় হচ্ছে ব্যবস্থাপনা, ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোয়। আমার বিশ্বাস, আমরা যদি এ মডেলে এগোতে পারি এবং আমাদের উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসেন, তাহলে এ খাত দ্রুত সম্প্রসারণ হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে এ পুরো বিষয়টি সরকারের হাতে রাখতে চাই না। কারণ সরকারি প্রকল্পে প্রায়ই বিপুল অংকের বকেয়া তৈরি হয়। এটি বেসরকারি থেকে বেসরকারি মডেলে পরিচালিত হওয়াই ভালো। বাজারে যে সবচেয়ে ভালো সেবা ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য দিতে পারবে, সে-ই কাজ করবে। আর জমির বিষয়টি নিয়ে আমরা এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। এখন মূল লক্ষ্য হবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে রুফটপ সোলারের দ্রুত সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা।

আমরা বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তৈরির চেষ্টা করছি। প্রধানমন্ত্রীরও স্পষ্ট নির্দেশনা হলো, সরকারি অর্থে আর সবকিছু করার প্রয়োজন নেই। যেখানে সম্ভব, বেসরকারি খাতকে দায়িত্ব দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সবার সহযোগিতা পেলে আমার দায়িত্বের মেয়াদ শেষে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াটে নিয়ে যেতে চাই। এ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছি। ট্যাক্স হলিডেসহ আমরা যে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের তা গ্রহণের আহ্বান রইল। ভোক্তা পর্যায়ে যেসব বাড়িতে সোলার লাগানো হবে তাদেরও আমরা প্রণোদনা দেব। আবার যারা অনীহা প্রকাশ করবে তাদের উচ্চ কর দিতে হবে।

দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দেশের জ্বালানি খাতে কার্যকর পরিকল্পনার অভাব ছিল। এ সময় দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে গুরুত্ব দেয়া হলেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে জ্বালানি দরকার, সেই গ্যাস অনুসন্ধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ১৭ বছরে একটি গ্যাস কূপও খনন করা হয়নি। ফলে পুরো দেশ এখন আমদানীকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আবার আমদানিনির্ভর জ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও পর্যাপ্ত নয়, বর্তমানে দেশে মাত্র দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটি এখন দুর্ঘটনার কবলে পড়ায় গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ গ্যাস পাচ্ছে না, সিএনজি স্টেশনের গ্যাস পাচ্ছে না। অনেক জায়গায় মানুষ সড়ক অবরোধ করছে। এটি প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির অবকাঠামোও আরো শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়।

বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বটি দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিক এমনটাই চাই। এক্ষেত্রে ভারত আমাদের সামনে বড় উদাহরণ। কলকাতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সফলভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে। মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স, দিল্লিতে আদানির মতো কোম্পানিগুলো এ দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করছে। ভারত পারলে আমাদের উদ্যোক্তাদের পক্ষে তা অসম্ভব নয়। সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাইকারি পর্যায়ে সরকারের ব্যবসা পরিচালনা করা ঠিক হবে না। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন আর পাইকারি পর্যায়ে বিক্রি করতে পারে। খুচরা বিতরণ দক্ষ বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত। এমনটি আমার ব্যক্তিগত মত। আমার অধীনে যেসব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি রয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে আমি সেগুলোর বেসরকারীকরণ দেখতে চাই। বিদ্যুতের বিল আদায় করা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ সময়মতো বিল পরিশোধ করতে চায় না। এ কারণেই আমি মনে করি, এসব ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে আরো বেশি সম্পৃক্ত করা উচিত। কারণ বেসরকারি খাতে জবাবদিহি বেশি থাকে। বিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতাও ভালো। এভাবে সরকারের আর্থিক দায় কমে আসে এবং গোটা ব্যবস্থাপনা আরো কার্যকর করা যায়। সরকারের ওপর থেকে চাপটা কমাতে হবে।

যাদের ফ্যামিলি কার্ড আছে, তারা প্রতি মাসে একটি করে এলপিজি সিলিন্ডার কনসেশনাল রেটে পাবেন। অর্থাৎ, একজন কৃষক বা সুবিধাভোগী তার ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করে বাজার মূল্যে সিলিন্ডার কিনবেন। এরপর ভর্তুকির যে পার্থক্য থাকবে, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। আমরা মডেলটি নিয়ে কাজ করছি। ভারতে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং তারা এক্ষেত্রে খুবই সফল হয়েছে।

আমি এমন একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে, যেটি অন্য যেকোনো মন্ত্রণালয় থেকে ভিন্ন। এটি এমন মন্ত্রণালয় নয়, যা অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে। বরং মন্ত্রণালয়টি অর্থব্যয়ের মাধ্যমে আমদানি করে। তারপর আবার অর্থ ফেরত আনতে হয়। তাই এ মন্ত্রণালয়ের কাজ অনেক কঠিন। একসময় আমি ব্যবসায়ী, পার্টটাইম রাজনীতিবিদ ছিলাম। এখন পুরোপুরি রাজনীতিবিদ, ব্যবসায় নেই। আমি তাই আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা সৌরবিদ্যুতে আরো বিনিয়োগ করুন। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা করুন।

বর্তমানেও ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে বিভিন্ন ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ব্যাংকিং সুবিধা আরো সহজ করা, উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সহজলভ্য করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে আমরা দেশকে একটি ওয়েলফেয়ার স্টেট হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। সে লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন আমরা প্রবাসী আয় প্রেরণকারী (রেমিট্যান্স) কর্মীদের জন্যও একটি বিশেষ কার্ড চালুর বিষয়ে চিন্তা করছি, যাতে তারা দেশে এসে বিভিন্ন ধরনের সেবা ও সুবিধা সহজে পেতে পারেন।

ইকবাল হাসান মাহমুদ: মন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়

[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে]