বিশ্বের বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদকুলের প্রতি সাধারণ মানুষের গণসচেতনতা তৈরি করা দিবসটির মূল লক্ষ্য। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো—ঔষধি ও সুগন্ধি উদ্ভিদ: স্বাস্থ্য, ঐতিহ্য ও জীবিকার সংরক্ষণ (Medicinal and Aromatic Plants: Conserving Health, Heritage and Livelihoods)। পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে সমগ্র পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যই হুমকির সম্মুখীন। বন্যপ্রাণী ও বনভূমি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হলে বনভূমি নষ্ট হবে, যা সরাসরি মানুষের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীদের অপরিহার্য মূল্যবান ভূমিকা ও বিভিন্ন অবদান গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

সাধারণত বন্যপ্রাণী বলতে বোঝায় মানুষ এবং গৃহপালিত পশু ছাড়া প্রাকৃতিক পরিবেশে (যেমন বনভূমি, নদী, পাহাড়, জঙ্গল ইত্যাদি) স্বাধীনভাবে বসবাসকারী এবং মানুষের কোনো ধরনের সাহায্য ছাড়াই প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীগুলোকে বোঝায়। বনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাদ্যগ্রহণ থেকে শুরু করে প্রজনন পর্যন্ত সব কার্যক্রম এরা বনেই সম্পন্ন করে। বন ছাড়াও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল অভ্যন্তরীণ জলাশয় ও জলাভূমিগুলো। জলাভূমি যেমন বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বসবাস তেমনি বিভিন্ন স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, উভচরের বাসস্থান। জলাভূমিসংলগ্ন স্থলভাগেও রয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর অবাধ বিচরণ। এসব প্রাণী নিজেদের টিকিয়ে রাখতে জলাভূমি ও স্থলভাগ ব্যবহারের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদ্ভিদ তথা বৃক্ষ ও প্রাণিকুল আমাদের বিশাল এক প্রাকৃতিক সম্পদ, যা স্রষ্টার অকৃত্রিম উপহার। এ বিশাল আকারের প্রাকৃতিক সম্পদের উপযুক্ত ও নিরাপদ আবাসস্থল হলো বনভূমি। বনভূমিগুলোয় উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীদের মধ্যে রয়েছে চমৎকার এক নিবিড় বন্ধন। প্রাকৃতিক নিয়ম মেনেই কোনো বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রকারের নির্দিষ্টসংখ্যক গাছপালা ও বন্যপ্রাণী বিদ্যমান থাকে। এছাড়া বঙ্গোপসাগর বন্যপ্রাণীর বিশেষ করে জলজ বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। বিশেষ কোনো কারণে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংখ্যা অতিরিক্ত পরিমাণে হ্রাস পেলে সেখানে বড় ধরনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পৃথিবীব্যাপী বনাঞ্চলের দ্রুত হারে উজাড় হওয়ার ফলে মূল্যবান বৃক্ষসম্পদের বিলুপ্তি ঘটছে এবং বনাঞ্চলে বসবাসকারী বিচিত্র রকমের পশুপাখির নিরাপদ আবাস নষ্ট হওয়ায় বন্যপ্রাণীর বিলুপ্তির হার ক্রমাগত বাড়ছে।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের তথ্যানুসারে, ১৯৭০ সাল থেকে পৃথিবীব্যাপী এখন পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের থেকে হারিয়ে গিয়েছে ৩১ প্রজাতির প্রাণী। এছাড়া দেশে অন্তত ২১৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিপন্ন। এ তালিকায় রয়েছে উভচর সরীসৃপ ও পাখি ছাড়াও স্তন্যপায়ী প্রাণী। বাংলাদেশ বনবিভাগের হিসাবে ৪২ প্রজাতির উভচরের মধ্যে বর্তমানে আটটি, ১৫৮ প্রজাতির সরীসৃপের মধ্যে ৬৩টি, ৭৩৬ প্রজাতির পাখির মধ্যে ৪৭টি, ১২৪ স্তন্যপায়ী প্রণীর মধ্যে ৪৩টির অস্তিত্ব হুমকির মুখে রয়েছে। জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশে সংরক্ষিত প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের গাছ ও পরনো প্রাকৃতিক গাছ আহরণ বন্ধ রয়েছে। এজন্য বন অধিদপ্তর বেশ কয়েক বছর কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করেছে যেমন ২০১২ সালে অনুমোদন করা হয়েছে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন; বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত মানুষের জীবন-সম্পদের ক্ষতিকর নীতিমালা ২০১০ অনুমোদনের মাধ্যমে হ্রাস করা হয়েছে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত; প্রণয়ন করা হয়েছে নতুন টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৮-২৭; বিশ্বব্যাংকের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ’স্ট্রেংদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ডলাইফ প্রোটেকশন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে; সুন্দরবনের রক্ষিত এলাকা সংরক্ষণ ও বাঘ সংরক্ষণে ভারতের সঙ্গে প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক সম্পদিত হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের তথ্য বিনিময় এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ প্রণয়নের মাধ্যমে ১৯৭৪ সালের পুরনো আইন বাতিল করা হয় এবং বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরো কঠোর বিধান চালু করা হয়। এ আইনে ৬৫০টির বেশি বন্যপ্রাণীকে সংরক্ষিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংরক্ষিত প্রাণী হত্যা, ক্রয়-বিক্রয়, পাচার বা ক্ষতি সাধন করলে দুই-সাত বছর কারাদণ্ড ও ১-১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে। সুন্দরবন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সীতাকুণ্ড ইকোপার্কসহ বেশকিছু সংরক্ষিত এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশে সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশে সুন্দরবনের মোট আয়তনের মধ্যে বনভূমি ৪ হাজার ৮৩১ বর্গকিলোমিটার এবং জলাভূমি ১ হাজার ১৮৬ বর্গকিলোমিটার। এখানে বাস করে ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ ও ২১৯ প্রজাতির জলজপ্রাণী সমগ্র বাংলাদেশে মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর আনুমানিক প্রজাতির সংখ্যা ১১ হাজার ৮০০-এর মধ্যে সুন্দরবনে রয়েছে ২ হাজার ২০০ প্রজাতি। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে সুন্দরবনের অনেক বন্যপ্রাণীই এখন ভালো নেই। ২০১৮ সালে সর্বশেষ শুমারিতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪। বাঘ শিকার হ্রাস পেলেও থেমে নেই নিয়মিত হরিণ শিকার। সম্প্রতি সুন্দরবনের শরকির খালসংলগ্ন বনে অবৈধ হরিণ শিকারের জন্য পাতা ফাঁদে আটকে পড়া একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে প্রায় ৩০ ঘণ্টা চেষ্টার পর উদ্ধার করা হয়। এ বন্যপ্রাণী উদ্ধার ঘটনার মাধ্যমে আমাদের বনের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সংকট, আইনের প্রয়োগে অক্ষমতা ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সংঘাত তুলে ধরে। এর আগে সুন্দরবন থেকে বিলুপ্ত হয়েছে গণ্ডার, চিতা বাঘ, চার প্রজাতির পাখি ও এক প্রজাতির হরিণ। মাছ ধরতে গিয়ে জেলেদের জালে আটকা পড়ে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে ডলফিন, শুশুক, কুমিরের বাচ্চা ও বিরল প্রজাতির কাছিম।

জলবায়ু পরিবর্তন সংকটসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং মানুষের নানাবিধ অত্যাচারে সুন্দরবনে কয়েক প্রজাতির প্রাণী এখন সংকাটপন্ন। সুন্দরবনে গত ২০ বছরে প্রায় ৩২ বার আগুনের দুর্ঘটনায় পুড়ে গেছে প্রায় ১০০ একর বনভূমি। এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বনভূমির গাছপালা, লতাগুল্ম পুড়ে নষ্ট হয়েছে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ মারা গেছে বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু। ফলে আবাসস্থল হারিয়ে ফেলেছে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী। সুতরাং দেখা যাচ্ছে বন্যপ্রাণীরা তাদের আবাসস্থল বনেও নিরাপদ নয়। বাংলাদেশ সরকার বন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে নানাভাবে গুরুত্ব প্রদান করেছে। বাংলাদেশ সংবিধানের-১৮(ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের কথা গুরুত্বের সঙ্গে ব্যক্ত করা হয়েছে। সংবিধানে বলা হয়, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন। বাংলাদেশে মোট ৫৩টি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে, যা বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে রয়েছে, ১০টি জাতীয় উদ্যান, ১৯টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, চারটি ইকোপার্ক, একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন, দুটি সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা এবং দুটি বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা। এসব সংরক্ষিত এলাকার মাধ্যমে বন্যপ্রাণীর টেকসই সংরক্ষণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণের অংশ হিসেবে সময়ে সময়ে বিভিন্ন আইন, বিধি ও অধ্যাদেশ তৈরি ও আপডেট করেন। যেমন বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২, বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৬, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ ২০২৬, পোষা পাখি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২০, কুমির লালন পালন বিধিমালা ২০১৯, বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা ২০২১ ইত্যাদি।

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয় বরং টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় বিশ্বের সব দেশকে বনভূমির পরিমাণ ৩০ শতাংশ করার লক্ষ্য বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করার কর্মসূচি তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে উল্লেখ করেছেন। আশা করা যায়, এ উদ্যোগ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বৃদ্ধি পাবে। সরকারের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষ সচেতন হলে বন্যপ্রাণী সুরক্ষার কাজটি সহজ হবে। বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে ব্যাপক আকারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে। বন বিভাগকে আধুনিক প্রযুক্তি, জনবল ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যথাযতভাবে গড়ে তুলতে হবে। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটকে বন্যপ্রাণী পাচার রোধে সর্বোচ্চ সক্রিয় থাকতে হবে। বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়নে ব্যাপক আকারে নজরদারি প্রয়োজন। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর টেকসই ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতে বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন।

ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম