গত শতাব্দীতে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের অসাধারণ অগ্রগতির ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমান শতাব্দীকে জীববিজ্ঞানের শতাব্দী বলা হয়। জীবনের কোডগুলো অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে জীবের বৈশিষ্ট্যগুলোকে সফটওয়্যারের সাহায্যে পরিবর্তন করার ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। গত কয়েক দশকে জিনোমিক্স, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, জিনোম এডিটিং, সিনথেটিক বায়োলজি এবং সিস্টেম বায়োলজি জীববিজ্ঞানে নতুন বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। জিনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে জীবনের পুনর্লিখন শুরু হয়েছে, ফলে কল্পবিজ্ঞান বাস্তবে পরিণত হচ্ছে—যেমন জিন থেরাপি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জ্বালানি উৎপাদন। জীবপ্রযুক্তিকে বর্তমান শিল্প ও কৃষি বিপ্লবের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জীবনের সব তথ্য বিশ্লেষণে গণিতের অ্যালগরিদম এবং কম্পিউটার সায়েন্সের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিজ্ঞান ও মানবসভ্যতায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। এ যুগে বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণাগারে কৃত্রিম জীব সৃষ্টিতে সফল হয়েছেন। গবেষণায় সংশ্লেষিত ডিএনএ, আরএনএ ও প্রোটিনের সাহায্যে ব্যাকটেরিয়ার মতো এককোষী কৃত্রিম জীব তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের কৌতূহল এখানেই শেষ হচ্ছে না। একটি নতুন ধারণা হচ্ছে, ‘মিরর লাইফ’ বা আয়না জীবন তৈরি করার প্রচেষ্টা চলছে, যেখানে জীববৈজ্ঞানিক অণুগুলোর কাইরালিটির বিপরীত সংস্করণ নির্মাণ করার চেষ্টা চলছে। এ ধারণা আমাদের জীবনের মৌলিক গঠনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে—এটি বর্তমান জীবনের গঠন ও কার্যকারিতার বিপরীত হতে পারে। প্রযুক্তির অগ্রগতি নতুন সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি কিছু নতুন চ্যালেঞ্জও হাজির করেছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, মনুষ্যসৃষ্ট এসব ‘মিরর লাইফ’ পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানবসভ্যতার জন্য কতটা নিরাপদ? প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কৃত্রিম ‘মিরর লাইফ’ জীবন নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি হতে পারে। ‘মিরর লাইফ’ সৃষ্টিসংক্রান্ত সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা এবং সুরক্ষার জন্য সম্প্রতি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একটি দল সাপ্তাহিক ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। একজন জীবপ্রযুক্তির ছাত্র হিসেবে, এ সময়োপযোগী বিষয়টি নিয়ে আমার নিজস্ব মতামত ও গবেষণা তুলে ধরাই এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।
মিরর লাইফের মূল ধারণা হচ্ছে, সেই সব অণু, যা প্রকৃতিতে বিদ্যমান সাধারণ জীবের জন্য অপরিচিত। প্রতিটি জীবের মৌলিক অণু যেমন ডিএনএ এবং প্রোটিন একটি নির্দিষ্ট কাইরালিটি বা ‘হ্যান্ডেডনেস’ নিয়ে কাজ করে। ডিএনএ গঠন হয় ‘ডানহাতি’ নিউক্লিওটাইড এবং প্রোটিন তৈরি হয় ‘বামহাতি’ অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে। কিছু গবেষক সম্পূর্ণরূপে মিরর-ইমেজ জীববৈজ্ঞানিক অণু ব্যবহার করে নতুন জীবের সৃষ্টিতে সচেষ্ট হয়েছেন। এ ধরনের মিরর অর্গানিজমগুলো পরিচিত জীবনের বিপরীত উদাহরণ হবে এবং তাদের সৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ‘মিরর লাইফ’ তৈরি করতে চান, যেখানে এসব অণু বিপরীত কাইরালিটিতে থাকবে, যা শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, এর অনেক সম্ভাব্য শিল্প ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রয়োগ সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সঙ্গে কিছু বড় ঝুঁকি যুক্ত আছে, যা সঠিকভাবে মোকাবেলা করা না গেলে তা পরিবেশ, প্রাণিজগৎ এবং মানবসভ্যতার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
মিরর ব্যাকটেরিয়া, যা মিরর লাইফের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, এটি প্রাকৃতিক জীবের কাইরাল (হ্যান্ডেডনেস) ফাঁকগুলো থেকে রক্ষা পেতে সক্ষম হতে পারে। বিশেষত মিরর ব্যাকটেরিয়ায় মানব, প্রাণী ও উদ্ভিদের ইমিউন সিস্টেমের বিরুদ্ধে বা অতিক্রম করার একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকবে। এই ব্যাকটেরিয়া সহজেই পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং অনেক ইকোসিস্টেমে মহামারী আক্রমণকারী প্রজাতির মতো কাজ করতে পারে। মিরর ব্যাকটেরিয়ার বিপরীত কাইরালিটির কারণে এটি সহজেই শিকারি অণুজীব বা মাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক সিস্টেমকে সহজেই ফাঁকি দিয়ে আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। এটি এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে মিরর ব্যাকটেরিয়া মানুষের, প্রাণীর এবং উদ্ভিদের জন্য মারাত্মক সংক্রমণ তৈরি করতে পারে।
এ পর্যন্ত প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী মিরর ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য মিরর অর্গানিজমের সম্ভাবনা সৃষ্টি করা হলে তা সম্ভবত জীবের ইমিউন সিস্টেমের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে সম্পূর্ণ নতুন মহামারী রোগ জীবজগৎ এমনকি মানব প্রজাতিকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। আমাদের প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় এদের দমন বা ব্যবস্থাপনা একেবারেই অকার্যকর হতে পারে। সুতরাং মিরর লাইফের সম্ভাব্য ঝুঁকির দিক বিবেচনায় বৈজ্ঞানিকভাবে এদের গবেষণা, সৃষ্টি ও ব্যবহারে বিশ্বব্যাপী জীবনিরাপত্তা বিধান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আশু প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সব জাতির মধ্যে আলোচনা এবং ঐকমত্য প্রয়োজন। সঠিক মনোযোগ না দিলে এর বিরূপ প্রভাব বিপজ্জনক হতে পারে।
মিরর লাইফ ও তার সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে বহুমুখী আলোচনা প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়, নীতিনির্ধারক, গবেষণা তহবিল প্রদানকারী, শিল্পপতি, সিভিল সোসাইটির সদস্য এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে সমন্বিত আলোচনা হওয়া উচিত। যদি আমরা প্রাথমিক অবস্থাতেই ঝুঁকিগুলো মোকাবেলা না করি, ভবিষ্যতে অবস্থার অবনতি হতে পারে।
মিরর লাইফের ঝুঁকি সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলা করতে প্রতিটি রাষ্ট্রের একটি উচ্চ মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। সঠিক বায়োসেফটি ও বায়োকন্টেইনমেন্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। কারণ এসব ব্যাকটেরিয়া যখনই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশে চলে যাবে, তখন তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। যদিও বায়োকন্টেইনমেন্টের মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রিত ল্যাবরেটরি পরিবেশে রাখা যেতে পারে। তবুও বিজ্ঞানীরা বলছেন যে মানবিক ত্রুটি বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এর সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। যদিও মিরর ব্যাকটেরিয়ার একটি সংকীর্ণ হোস্ট পরিসর থাকে এবং শুধু সীমিত কিছু ইকোসিস্টেমে আক্রমণ করার ক্ষমতা থাকে, তবুও এটি অবিশ্বাস্য ও অপরিবর্তনীয় ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে। সুতরাং মিরর জীব সৃষ্টির যৌক্তিকতা নিশ্চিত না করে এ বিষয়ে গবেষণা ও ব্যবহারের অনুমতি প্রদান হবে না।
মিরর অ্যান্টিবায়োটিক, মিরর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধী শস্য এবং মিরর ফেজের মতো প্রতিকার ব্যবস্থা এসব মিরর ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার এবং বৈশ্বিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ বা প্রতিকার করতে যথেষ্ট হবে না বা জীবনহানি ও পরিবেশগত ক্ষতির প্রতিকার করতে পারে না যা তা সৃষ্টি করতে পারে। এ প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এগুলো পরিবেশের একেবারে সব অংশে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়, যাতে মিরর ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ও বিবর্তনীয় বৈচিত্র্য রোধ করা যায়। তাই এগুলো সম্ভবত শুধু একটি অংশিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে। মিরর ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্টি থেকে যে সম্ভাব্য সুবিধাগুলো পাওয়া যেতে পারে তা সীমিত। মিরর বায়োমলিকিউলগুলো বৈজ্ঞানিক এবং সম্ভাব্য চিকিৎসাগত প্রয়োগের জন্য অনুসন্ধানযোগ্য। যদিও মিরর ব্যাকটেরিয়া সম্ভবত এগুলো তৈরিতে সহায়তা করতে পারে, তেমন বায়োমলিকিউলগুলো অন্য পদ্ধতিতে তৈরি করা সম্ভব। আরো উদ্ভাবনীভাবে মিরর ব্যাকটেরিয়াগুলো জীবন্ত কোষের চিকিৎসার জন্য চ্যাসিস হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, তবে আবারো, বিকল্প পথগুলো উপলব্ধ। মিরর ব্যাকটেরিয়া তৈরির সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো তুলনামূলকভাবে সীমিত সম্ভাব্য সুবিধাগুলো দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
সাম্প্রতিক কভিড-১৯ মহামারী আমাদের দেখিয়েছে ক্ষুদ্র ভাইরাস কত দ্রুত পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। বিজ্ঞানীদের অনেকেই তখন বলেছেন যে কভিড-১৯ সৃষ্টিকারী নভেল করোনাভাইরাস জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে চীনের উহান শহরের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরি হতে কোনোভাবে বেরিয়ে এসেছে। তবে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে মিরর লাইফ নিয়ে কোনো গবেষণা না থাকলেও আমাদেরকে সক্রিয়ভাবে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আলোচনা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে হবে।
আমি মনে করি, মিরর লাইফ সৃষ্টি এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় একটি সুস্পষ্ট নীতিনির্ধারণ এবং সঠিক গবেষণা প্রয়োগের মাধ্যমে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। মিরর ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য মিরর অর্গানিজমের সৃষ্টি শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল থেকে নয়, বরং এর গভীর সামাজিক, পরিবেশগত এবং নৈতিক প্রভাবকেও বিচার করতে হবে। এ বিষয়ে উপযুক্ত সরকারি নীতি গ্রহণের মাধ্যমে গবেষকদের সহায়তায় আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি নিরাপদ এবং উন্নত পৃথিবী গঠন সম্ভব হবে। মিরর লাইফের বিপদ ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিনির্ধারণ ও দায়িত্বশীল গবেষণার মাধ্যমে আমাদের একটি নিরাপদ ও উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে হবে। আমি দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে আরো আলোচনার আহ্বান জানাই।
ড. তোফাজ্জল ইসলাম: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক ইনস্টিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফেলো বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি










