আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের (ইউআরপি) আওতায় নগরীর চার শতাধিক স্থান থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর এ তথ্য জানা গেছে। বনশ্রী থেকে আফতাবনগর, মাদানি এভিনিউ হয়ে বসুন্ধরা ৩০০ ফিট সড়ক ধরে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় গত দুই দশকে লাখো মানুষের বসতি ও কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। এখন মাটির নমুনা পরীক্ষা করে জানা গেছে, এ এলাকার অবকাঠামো সাত মাত্রার ভূমিকম্পে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে। উদ্বেগ আপাতত ভৌগোলিক ব্যাপ্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ ঝুঁকির বিষয়টি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা দলিলে বহু আগে থেকেই চিহ্নিত। সংগতই প্রশ্ন উঠেছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবকাঠামো কেন নির্মিত হলো।

১৯৯৫ সালে প্রণীত ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে (ডিএমডিপি ১৯৯৫-২০১৫) নগরীর পাঁচটি এলাকাকে সংরক্ষিত জলাধার হিসেবে রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। এর তিনটিই ছিল বালু নদের অববাহিকার অন্তর্ভুক্ত। জলাশয় ও জলাভূমি হওয়ায় এসব এলাকা আবাসন এবং অবকাঠামো নির্মাণের অনুপযোগী বিবেচনা করে প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু সে সুপারিশ বাস্তবে কার্যকর হয়নি। রাজউক কর্মকর্তাদের ভাষ্যানুযায়ী, সংরক্ষিত এসব জলাধার ধীরে ধীরে ভরাট করেই সেখানে বসতি ও অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ যে এলাকাকে পরিকল্পনা দলিলে সুস্পষ্টভাবে নির্মাণের অযোগ্য চিহ্নিত করা হয়েছিল, বাস্তবে সেখানেই সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকাগুলোর একটি গড়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বণিক বার্তাকে ব্যাখ্যা করেছেন, এ এলাকার ভূমিগত দুর্বলতা দুই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। প্রথমত, নরম কাদামাটি ও আলগা বালির স্তরের কারণে ভূমিকম্পের কম্পন কয়েক গুণ বেশি (অ্যামপ্লিফিকেশন) অনুভূত হয়। দ্বিতীয়ত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকায় ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে বালি ও পানি মিশে (লিকুইফ্যাকশন) মাটি তার ভার বহনের সক্ষমতা হারাতে পারে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষণায় দেখা গেছে, বালু নদের অববাহিকার কোনো কোনো এলাকায় সাত মিটার পর্যন্ত লুজ বালি এবং তারপর অন্তত ৩৫ মিটার পর্যন্ত নরম কাদামাটির স্তর রয়েছে। অর্থাৎ ভূমিকম্প হলে এখানে অ্যামপ্লিফিকেশন ও লিকুইফ্যাকশন দুটোই একসঙ্গে ঘটার আশঙ্কা থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পৃথক গবেষণাও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে নগরীর মাত্র ৮ শতাংশ এলাকা তুলনামূলক শক্ত প্লাইস্টোসিন যুগের ভূমির অন্তর্ভুক্ত। আর বাকি অংশ বিশেষত বালু নদের অববাহিকার মতো সাম্প্রতিক প্লাবন সমভূমি নির্মাণের জন্য উপযুক্ত করে তুলতে বিশেষ প্রকৌশলগত ব্যবস্থা অপরিহার্য।

মূল প্রশ্নটি প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতির নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার। ভূমির প্রকৃতি সম্পর্কে সরকারি পরিকল্পনায় সুস্পষ্ট সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও রাজউক এসব এলাকায় ভরাট ও নির্মাণ ঠেকাতে পারেনি। জলাধার হিসেবে সংরক্ষিত ভূমি কীভাবে ধাপে ধাপে ভরাট হয়ে আবাসিক প্রকল্পে রূপান্তর হলো, তা দীর্ঘ সময় ধরে ঘটেছে এবং এর প্রতিটি ধাপে ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন, প্লট নিবন্ধন ও নির্মাণ অনুমতি দেয়ার এখতিয়ার ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর হাতে। সাম্প্রতিক ড্যাপেও (ড্যাপ ২০২২-৩৫) বালু নদের অববাহিকাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে মানচিত্রে চিহ্নিত করে বিশেষ নকশার ফাউন্ডেশন ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, অতীতে যখন এ এলাকা ভরাট হচ্ছিল, তখন তদারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজউক কী ভূমিকা পালন করেছিল এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে জবাবদিহিমূলক কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এখন যেহেতু বালু নদের অববাহিকার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত হয়েছে, ভবিষ্যৎ নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে রাজউককে দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। ইউআরপি ও ড্যাপে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র বাধ্যতামূলকভাবে সব নির্মাণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে, যাতে কোনো নকশা মাটি পরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়া অনুমোদন না পায়। এসব এলাকায় নতুন ভবনের ক্ষেত্রে গভীর ও প্রকৌশলগতভাবে উপযুক্ত পাইলিং, লিকুইফ্যাকশন-প্রতিরোধী ফাউন্ডেশন নকশা এবং সিসমিক কোড মেনে চলা বাধ্যতামূলক করতে হবে। অবশিষ্ট যেকোনো জলাশয় বা নিচু ভূমি অবিলম্বে সুরক্ষিত ঘোষণা করে তা রক্ষার জন্য আইনি বেষ্টনী শক্ত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণে ভূ-উপগ্রহ চিত্র ও নিয়মিত মাঠ জরিপের ভিত্তিতে স্বচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

যেসব আবাসন প্রকল্প ও অবকাঠামো এরই মধ্যে বালু নদের অববাহিকায় গড়ে উঠেছে, সেগুলো ভেঙে ফেলা বাস্তবসম্মত নয় এবং তা সমাধানও নয়, বরং প্রয়োজন ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রশমনের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। প্রথম উদ্যোগ হওয়া উচিত ভবনভিত্তিক কাঠামোগত নিরীক্ষা। ভবনগুলোর ফাউন্ডেশন নকশা, নির্মাণকালীন মাটি পরীক্ষার তথ্য এবং বর্তমান অবস্থা যাচাই করে সেগুলোকে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী শ্রেণীবদ্ধ করা দরকার। যেসব ভবনের কাঠামো তুলনামূলক দুর্বল প্রমাণ হবে, সেগুলোর জন্য রেট্রোফিটিং বা কাঠামোগত সংস্কারের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তার একটি রূপরেখা তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি সহজ ঋণ সুবিধার মাধ্যমে ভবন মালিকদের এতে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং সংস্কারের অযোগ্য বিবেচিত স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের জন্য স্পষ্ট ও মানবিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা থাকতে হবে। এলাকাভিত্তিক জরুরি প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। এ পুরো প্রক্রিয়া তদারকের জন্য রাজউক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী কারিগরি কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। বালু নদে অববাহিকার ঝুঁকি নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দীর্ঘদিনের শৈথিল্যের ফল। এ শৈথিল্য এড়াতে না পারলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি আরো বাড়বে। তাই বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য দিয়েই নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামো নির্মাণ অনুমোদন দিতে হবে।