বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন করতে হলে দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ জরুরি। সেদিক বিবেচনায় বলা যায়, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পর্যাপ্তসংখ্যক নারী থাকা আবশ্যক। কেননা দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি বর্তমানে নারী। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব, বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রাপ্ত নারীর সংখ্যায় এর বিপরীত চিত্রই প্রতিফলিত হয়। যদিও দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রচারণায় বিশেষভাবে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করে থাকে। কিন্তু নারীর প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সেই অঙ্গীকার পূরণের চর্চা দেখা যায় না। ফলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের যেসব ক্ষেত্রে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে সেখানে নারীরা সবচেয়ে কম প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণের সুযোগ পান। যে কারণে রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে কর্মস্থলে সমতা প্রতিষ্ঠা পায়নি। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ ছাড়া এ পরিস্থিতির রূপান্তর সম্ভব নয়।

নারীরা কেবল বৃহৎ জনগোষ্ঠী নয়, তারা নানা সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ছিলেন। যে কারণে নির্বাচিত সরকার কে হবে তার অনেকাংশ নির্ভর করেছে তাদের ভোটের ওপর। এছাড়া তারা অর্থনীতিরও অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কৃষি, তৈরি পোশাক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রায় সব খাতে নারীর শ্রম ও উদ্যোগ দেশের অগ্রগতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। কিন্তু সত্য হলো কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়লেও তাদের সংখ্যা বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের প্রাণিসম্পদ ও কৃষি খাতে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ। যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। আবার জাতীয় জনসংখ্যা এবং শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, গত ৪৭ বছরে কৃষিতে নারীর সংখ্যা শতকের ঘর থেকে কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এর বাইরে সবচেয়ে বেশি নারী কর্মরত আছেন পোশাক শিল্প খাতে। ৬০-৮০ শতাংশ নারী এ খাতে জড়িত। কিন্তু এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোয়। অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও সরকারি বিভাগ এবং সংস্থায় নারী কর্মীর সংখ্যা ২০ শতাংশেরও নিচে বলে বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে উঠে আসে। এছাড়া সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয়ও নারীর অংশগ্রহণ কম দেখা গেছে। অর্থাৎ সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের সংখ্যা সীমিত।

এ ধরনের বৈষম্য এক ধরনের কাঠামোগত সমস্যা। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের বৈষম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। সংসদ, মন্ত্রিসভা, গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটি, প্রশাসনের শীর্ষ স্তর—সব খানেই নারীর উপস্থিতি ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়। ফলে নীতি প্রণয়নের সময় নারীর অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও বাস্তবতা বিবেচনার বাইরে থেকে যায়। যার প্রভাব দেশের সর্বস্তরেই পড়ে; বৈষম্য প্রকট হতে থাকে। প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণের বিষয়টি তাই এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার কেবল সংখ্যা বাড়িয়ে প্রতিনিধিত্ব রক্ষা করলেই সমতা রক্ষা হয়, এমন না। মূলত প্রয়োজন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা ও সক্ষমতা। যে কারণে দেশের সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন থাকার পরও তা কখনই নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। আর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় এসব প্রতিনিধির রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রভাব দুর্বল থাকে। তারা উপস্থিত থাকেন, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে নারীর অধিকার, বৈষম্য বা সহিংসতার মতো বিষয়গুলো নীতিতে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ কেন জরুরি তার বড় একটি কারণ হলো অভিজ্ঞতা। সমাজের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, ঝুঁকি, দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা অন্য লিঙ্গের মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন। ঘর থেকে শুরু করে বাইরে, কর্মক্ষেত্রসহ আরো বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা, শ্রম শোষণ— এসব বাস্তবতা নারীর জীবনের অংশ। আইন প্রণয়ন বা নীতিনির্ধারণে এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় না রাখলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা বাস্তবতাবিমুখ হয়। আবার নারীর প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ জবাবদিহিতাও বাড়ায়। যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীরা থাকেন, তখন সমতা বা নিরাপত্তা আর ‘সহানুভূতির বিষয়’ থাকে না, তা রাজনৈতিক দায়ে পরিণত হয়। বাজেটে বরাদ্দ, প্রকল্পের অগ্রাধিকার, আইন বাস্তবায়নের নজরদারি—সব ক্ষেত্রেই তখন চাপ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ যত বেশি, সামাজিক সুরক্ষা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন তত বেশি টেকসই হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ প্রয়োজন আরো বেশি। কারণ এখানে বৈষম্য কেবল সামাজিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও বটে। শ্রমবাজারে মজুরি বৈষম্য, সম্পদে নারীর সীমিত অধিকার, নারীর ওপর সহিংসতার ঊর্ধ্বমুখী হার—সবকিছু মিলিয়ে নারীরা কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। এসব সমস্যার সমাধান কল্যাণমূলক কর্মসূচি দিয়ে নয়, ক্ষমতার সমবণ্টনের মাধ্যমে করতে হবে। আর ক্ষমতার বণ্টনে সমতা আনতে হলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অবস্থান শক্ত করতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর দায়ও এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি। নির্বাচন এলেই নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়, কিন্তু মনোনয়নে তার প্রতিফলন নেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখের বেশি—মোট ভোটারের প্রায় ৪৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। অথচ প্রার্থী তালিকায় নারীর উপস্থিতি প্রায় ৪ শতাংশ। অর্থাৎ যারা ভোট দিয়ে সরকার গঠন করেন, তারাই সরকার গঠনের প্রতিযোগিতায় প্রায় অনুপস্থিত। অথচ প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ মানে কেবল নারীদের সুযোগ দেয়া নয়; এটি গণতন্ত্রকে কার্যকর করার পূর্বশর্ত। যে দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে, সেখানে সুষম গণতন্ত্রের বিকাশ কখনই সম্ভব নয়।

স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি হলেও সেখানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সীমিত। আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নারীদের প্রভাব কম থাকায় তারা নিজেদের এলাকার বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না। ফলে প্রতিনিধিত্ব থাকলেও অংশগ্রহণ পূর্ণাঙ্গ হয় না। এসব ক্ষেত্রে এ ব্যবধান দূর না হলে নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আর এক্ষেত্রে অবশ্যই রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। নারীদের এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও বিবেচনায় বিষয়টি থাকা প্রয়োজন।