অবশ্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘বি প্লাস’ ও স্বল্পমেয়াদি ঋণমান ‘বি’ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে বড় উদ্বেগের বিষয় সংস্থাটির পূর্বাভাস বলছে, দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান সংকটগুলোর আশু সমাধান না হলে ঋণমানে আরো অবনমন ঘটবে। এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। সরকারের উচিত এ সতর্কতা বিবেচনায় নিয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নে কাজ করা, যাতে ঋণমান পূর্বাভাস ইতিবাচক করা যায়।

আন্তর্জাতিক সংস্থার ক্রেডিট রেটিং আউটলুক দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে প্রকাশ করে। এ চিত্র ইতিবাচক না হলে দেশের অর্থনীতি কতটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তা আন্তর্জাতিক পরিসরে গ্রহণযোগ্যতায় প্রভাব ফেলে। বিদেশী বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ঋণমান পূর্বাভাস পরিস্থিতি ইতিবাচক করতে সরকারের গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ করার কারণগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলো বেশ পুরনো। সংস্থাটি তাদের সিদ্ধান্তের যুক্তি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা, তৈরি পোশাক রফতানিতে অনিশ্চয়তা, প্রবাসী আয় কমার ঝুঁকি ইত্যাদি প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে চলতি বছরের মে মাসে আরেকটি আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংসও দেশের ক্রেডিট রেটিং আউটলুক নেতিবাচক করার কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে আগে থেকে বিদ্যমান সংকটগুলো তুলে ধরেছিল। যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণে নিম্নমুখিতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক শাসন ইত্যাদি। ফিচ রেটিংসয়ে দেশের ঋণমান পূর্বাভাস নেতিবাচক হওয়ার প্রায় দুই মাসের মধ্যে আরো একটি সংস্থার ঋণমান অবনমন করা অর্থনীতির ঝুঁকি কমার পরিবর্তে যে গভীর হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে সেটি প্রকাশ করছে। সুতরাং সরকারকে অবশ্যই কার্যকর ও টেকসই সমাধানের দিকে অর্থনীতিকে নিয়ে যেতে হবে। অর্থনীতির সাময়িক চাপ মোকাবেলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। অর্থনীতির ভিত শক্ত হলে ঋণমান উন্নয়নে তা সহায়ক হবে।

এসঅ্যান্ডপি তাদের প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল সম্পদমান, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং পুনর্গঠন উদ্যোগে অগ্রগতি কম হওয়ায় আর্থিক খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব থাকলে শুধু ঋণপ্রবাহই ব্যাহত হয় না, বেসরকারি বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

সংস্থাটি আরো উল্লেখ করেছে, তিন বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং আগামী তিন বছরে গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে। প্রবৃদ্ধির এ মন্থরতা দেশের মাথাপিছু আয় বাড়ানোর গতিকেও কমিয়ে দিচ্ছে। অতীতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের তুলনামূলক কম মাথাপিছু আয়ের সীমাবদ্ধতাকে অনেকটাই আড়াল করেছিল। কিন্তু সে সুবিধা এখন ক্রমেই কমে আসছে। ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরো কার্যকর নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই।

এসঅ্যান্ডপি বৈদেশিক খাত নিয়ে একদিকে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির মতে, শক্তিশালী প্রবাসী আয়, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা এবং নতুন আইএমএফ কর্মসূচি বাংলাদেশের বৈদেশিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, তৈরি পোশাক রফতানির দুর্বলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বহিঃখাতের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে চলতি হিসাবের ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে। এসব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে রফতানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক আয়ের উৎস সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে।

প্রতিবেদনে রাজস্ব আহরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং ব্যবসার পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। এলডিসি উত্তরণের প্রাক্কালে এসব দুর্বলতা দ্রুত দূর করা না গেলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এসঅ্যান্ডপির প্রতিবেদনে শুধু দুর্বলতার চিত্রই উঠে আসেনি। সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং সরকার ঘোষিত ব্যাংকিং, রাজস্ব ও অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরো শক্তিশালী হতে পারে। অর্থাৎ পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ এখনো রয়েছে। কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন আবশ্যক।

আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন সবসময় চূড়ান্ত সত্য নয়। তবু বৈদেশিক ঋণ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, ট্রেড ফাইন্যান্স এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে এসব মূল্যায়নের প্রভাব বাস্তব। অতীতেও এসঅ্যান্ডপি, ফিচ ও মুডি’স বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে সতর্ক করেছে। এবারো সে একই বিষয়গুলো নতুন করে সামনে এসেছে। ফলে এ মূল্যায়নকে অর্থনীতির বাস্তব চ্যালেঞ্জের একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হিসেবে নেয়া এবং সে অনুযায়ী পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ করাই সমীচীন হবে। এতে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বৃদ্ধির প্রত্যাশা রয়েছে।