বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিকাশ মূলত বিএনপির সময়েই হয়। ফলে বিএনপি সরকারকে বলা হতো ব্যবসাবান্ধব সরকার। বিএনপি আমলের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমানের দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি দেশের অর্থনীতির ভিত তৈরি করে দেয়। ভ্যাট থেকে শুরু করে নতুন অনেক বিষয় বিএনপি আমলেই সূত্রপাত হয়। সেই বিএনপি আবার এ দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। বিএনপির ওপর মানুষে আস্থা ও প্রত্যাশা তাই অনেক বেশি।

এমন এক সময়ে নতুন সরকার দায়িত্বে, যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা প্রকট, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেড়ে আছে। অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই এক ধরনের স্থবিরতা, অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতা কাজ করছে, যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ সময়ে নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় ১ নম্বরে থাকা উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। জনগণের বড় চাওয়া থাকে জীবনযাত্রার ব্যয় বা মূল্যস্ফীতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। বর্তমানে এ হার ৮ শতাংশের ঘরে নামলেও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এখনো সর্বোচ্চ। এমনকি পাকিস্তানের চেয়েও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বেশি। নীতি সুদহার ১০ শতাংশে স্থির রেখে সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানির ওপর শুল্ক কমিয়ে বাজারের স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীর কবলে থাকা সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। দেশীর পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনে ইনসেন্টিভ দিতে হবে।

প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য বিএনপির অগ্রাধিকারে থাকা ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ মূল্যস্ফীতি থেকে ওদের মুক্তির একটি উপায় হতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন সঠিক পরিবারের হাতেই এ সুবিধা পৌঁছে। ফ্যামিলি কার্ড কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। প্রতিটি পরিবারের জন্য দরকার স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি করা, অর্থাৎ তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। বিনিয়োগ না থাকলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না, উৎপাদন বাড়ে না এবং অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে চাপে থাকে। সুশাসন নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

নতুন সরকারকে কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগের দিকেই সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন খুব জরুরি। এ ক্ষেত্রে ব্যবসা শুরুর খরচ কমিয়ে আনতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনা, দক্ষতা বাড়ানো, হয়রানি বন্ধ করা, দুর্নীতি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া কিছু সংস্কার অব্যাহত রাখা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিনিয়োগের পদ্ধতিকে সহজ করতে হবে। আইএমএফ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশের মধ্যে না নামলে নীতি সুদের হার কমানো যাবে না। মূল্যস্ফীতি বেড়ে এখন ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ঋণের সুদের হার কমাতে হবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তি সহজ করতে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের আওতা বাড়াতে হবে। ব্যাংকগুলো যাতে এ সেবা নিতে উৎসাহিত হয়, সেজন্য ক্রেডিট গ্যারান্টির নিষ্পত্তি সহজ করতে হবে। এক হিসাবে দেখা যায় বাংলাদেশের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি হার মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। নতুন সরকারকে রাজস্ব বাড়ানোর দিকে হাত দিতে হবে। লক্ষ্য পূরণে কর ফাঁকি কমানো এবং করজাল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির গবেষণায় দেখা যায়, কর ফাঁকি বন্ধ ও নতুন করদাতা বাড়াতে পারলে বছরে অন্তত দুই থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে সরকারের আয় বাড়ানোর দিকে দৃষ্টিপাত করা দরকার। ক্যাশের লেনদেন কমিয়ে সর্বক্ষেত্রে ডিজিটাল লেনদেন বাধ্যতামূলক করতে পারলে সরকারের আয় অনেক বাড়বে। লেনদেনে স্বচ্ছতা এলে মানুষের আস্থা এ সরকারের পক্ষে যাবে। ক্যাশ লেনদেন বন্ধ করতে পারলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে।

টাকা ছাপিয়ে আর ঋণ নিয়ে দেশ চালানো সামনের দিকে বিপদ বাড়তে পারে। এমনিতেই দেশী-বিদেশী মিলে সরকারের কাঁধে ২৪ লাখ হাজার কোটি টাকার ঋণ আছে বলে জানা যায়। ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধেই সরকারের আয়ের এক বিরাট অংশ চলে যায়। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ। খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি ও করপোরেট গভর্ন্যান্সের অভাবে খাতটি দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে। কেন্দীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বোর্ড কাঠামো গড়ে তোলা গেলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি শক্ত বার্তা যাবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে মনোযোগ বাড়াতে হবে এবং পাশাপাশি মামলার কারণে আটকে থাকা ঋণ আদায় বাড়াতে প্রয়োজনে অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। অচল কারখানা সচলের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্প্রীতি ছাড়া কোনো সংস্কার টেকসই হয় না। সবার আগে বাংলাদেশ এবং সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ এ স্লোগানকে সামনে রেখে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নেয়া হলে বিপক্ষ শক্তির কাছে একটি সমঝোতার বার্তা যাবে। এটি এ সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। এ শক্তিই এগিয়ে নিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে। প্রধানমন্ত্রী যেমন কম কথা বলে কাজের ওপর গুরুত্ব আরোপ করছেন, তেমনি মন্ত্রিসভার সবাইকে কম কথা বলে কাজ বেশি করে দেখাতে হবে।

আনোয়ার ফারুক তালুকদার: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক