মামুন রশীদ, প্রথিতযশা ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। প্রায় ৪০ বছর কাজ করেছেন তিনটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকে, বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোয়। বর্তমানে আর্থিক খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্সের চেয়ারম্যান। বাজেট কাঠামো তৈরি, প্রাধিকার নির্ণায়ন ও বাজেটে ব্যক্তি খাতের স্বার্থ সংরক্ষণ নিয়ে অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে বিভিন্ন ভূমিকায় কাজ করছেন প্রায় ৩৫ বছর। আসন্ন বাজেট নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

আসন্ন বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে দেখছেন? কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে বাজেটে যে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, তা কতটা কার্যকর বলে মনে হয়?

রাজস্ব আয়ের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় বা হয়েছে তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়নযোগ্য কিনা এটি নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। রাজস্ব বোর্ডের কাঠামোগত দুর্বলতা, কর ফাঁকি এবং করদাতাদের অনীহা এখনো দূর হয়নি। প্রতি বছর বাজেটে আমরা লক্ষ্যমাত্রা দেখি, কিন্তু বছরের শেষে ঘাটতি থেকেই যায়। কর আহরণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তি এবং কর ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়ানো ছাড়া এ লক্ষ্য পূরণ কঠিন। কাজেই বলা যায়, লক্ষ্য উচ্চ খারাপ নয়, তবে বাস্তবায়ন নির্ভর করবে প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর।

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো আমাদের দীর্ঘদিনের আর্থিক চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে এ অনুপাত এখনো ৯ শতাংশের নিচে ঘোরাফেরা করছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় অনেক বেশি। বাজেটে কিছু রূপকল্পমূলক ঘোষণা থাকলেও কাঠামোগত সংস্কারের অভাব রয়ে গেছে। কর আদায়ে ডিজিটাল রূপান্তর এবং ভোক্তা পর্যায়ে ট্যাক্স রেজিস্ট্রেশনের প্রসার জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেকেই মনে করেন কর প্রশাসনের মনোভাব এখনো হয়রানিমূলক এবং ব্যবসাবান্ধব নয়। সুতরাং বাজেটে উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো ভালো শুরু হলেও কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

প্রত্যক্ষ করের হার তুলনামূলক কম—এ পরিস্থিতি উত্তরণে বাজেট কতটা সহায়ক হবে?

প্রত্যক্ষ কর একটি দেশের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সম্পদ পুনর্বণ্টনের অন্যতম হাতিয়ার। বাংলাদেশে এখনো পরোক্ষ করই রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। বাজেটে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর কিছু কর আরোপ বা হার সামান্য বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের দিক থেকে প্রশ্ন থেকেই যায়। ফাঁকির প্রবণতা, সম্পদের যথাযথ হিসাব না রাখা এবং অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ—এসব মিলিয়ে প্রত্যক্ষ করের কাঠামো দুর্বল থেকে যাচ্ছে। এতদিনের বাজেট এ দুর্বলতাকে পুরোপুরি চিহ্নিত না করে শুধু উপসর্গ মোকাবেলার চেষ্টা করেছে।

বাজেট ব্যয়ে অগ্রাধিকার কেমন দেখছেন? শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কি যথেষ্ট? সরকারি ব্যয়ে সুশাসনের ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়নে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?

আমরা যদি একটি টেকসই, দক্ষতাভিত্তিক ও মানবসম্পদনির্ভর অর্থনীতি গড়তে চাই, তাহলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাজেটে এসব খাতে বরাদ্দ জিডিপির তুলনায় অনেক কম এবং বরাদ্দের একটি বড় অংশ আবার ব্যবহৃত হয় না। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পেছনে বরাদ্দ অনেক বেশি, যেটা রাজনৈতিকভাবে চমকপ্রদ হলেও অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করে না।

আমি মনে করি, আমাদের বাজেটে ‘মানবিক উন্নয়ন’ এখনো প্রাধান্য পায়নি।

বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সুশাসনের অভাব। প্রকল্প অনুমোদনের পর অকার্যকর টেন্ডারিং, দেরিতে বাস্তবায়ন, মানহীন কাজ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাজেটের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। দুর্নীতির প্রভাব সরাসরি ব্যয়ের দক্ষতায় পড়ে। আমরা দেখি অনেক সময় বাজেট বরাদ্দ থাকে, কিন্তু সঠিক কাজে তা খরচ হয় না। কাজেই বাজেট শুধু কাগজে-কলমে না থেকে মাঠপর্যায়ে কীভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে এর সফলতা। এ জায়গায় এখনো আমরা পিছিয়ে।

বাজেট ও মুদ্রানীতির মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য আছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন?

বাজেট ও মুদ্রানীতির মধ্যে সুসমন্বয় থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। বাজেটে যদি বিশাল ঘাটতি থাকে এবং সেটি ব্যাংক ঋণ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রিন্টেড মানি থেকে পূরণ করা হয়, তাহলে তা সরাসরি মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে তোলে। এখন আমরা এমন একটা অবস্থায় আছি, যেখানে একদিকে মূল্যস্ফীতি চেপে ধরেছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ স্থবির। বাজেটে সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য খুব একটা দিকনির্দেশনা আমি দেখছি না। বরং অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করার জন্য মুদ্রানীতিকে কঠিন করে ফেলা হয়েছে, যা বাজেটের লক্ষ্য পূরণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।

মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বাজেটে কিছু ভর্তুকি এবং খাদ্যনিরাপত্তাসংক্রান্ত পদক্ষেপ রয়েছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, সরবরাহ চেইনে ঘাটতি দূর করা এবং আমদানি-রফতানির ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে সুদহার ও মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত পন্থা নিতে হবে। বাজেট এসব বিষয়ে মোটামুটি নীরব।

দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেট কতটা সহায়ক বলে আপনি মনে করেন? সুদের হার ও ডলার সংকটের প্রেক্ষাপটে বাজেট কতটা বাস্তবসম্মত?

বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক পরিবেশের স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার নির্ভরযোগ্যতা লাগে। গেল বাজেটে কিছু কর রেয়াত ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রসঙ্গ এসেছে, কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এর চেয়ে বেশি কিছু দরকার ছিল। আমরা এখনো ব্যবসা শুরু করতে বিভিন্ন ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির মুখোমুখি হই। বাজেট এসব কাঠামোগত দুর্বলতা সমাধানে নীরব। আশা করব আগামী বাজেটে এগুলো আরো পরিষ্কার হবে।

ডলার সংকট ও উচ্চ সুদের হার বর্তমানে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ ও আমদানিনির্ভর খাতের জন্য বড় বাধা। বাজেটে এর প্রেক্ষাপটে অতীতে নির্দিষ্ট করে কোনো সমাধান দেয়া হয়নি। আমরা দেখছি ব্যাংক খাত তারল্য সংকটে ভুগছে এবং অনেক ব্যবসায়ী ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বাজেটকে এ সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে ব্যাংক খাতকে পুনর্গঠন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হতো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাজেটে এ গভীর সমস্যার ওপর খুব কম আলোকপাত করা হয়েছে এবং হয়।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ ও কার্যকারিতা নিয়ে আপনার মতামত কী? আয়বৈষম্য হ্রাসে বাজেট কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আপনি মনে করেন?

সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু বরাদ্দের পরিমাণ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সঠিক উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেয়া। এ খাতে আমরা এখনো তালিকাভুক্তির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারিনি। ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। বাজেটে এ প্রক্রিয়া নিয়ে খুব বেশি কিছু বলা হয়নি। ফলে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বাজেটের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের বাজেট এখনো ধনীকেন্দ্রিক ও আয়করের ক্ষেত্রে কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীর ওপর নির্ভরশীল। বড় ব্যবসা ও গোষ্ঠীগুলোর জন্য কর রেয়াত থাকলেও মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়ছে। সরাসরি আয় পুনর্বণ্টনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এভাবে চলতে থাকলে সামাজিক বৈষম্য আরো বাড়বে। দুর্নীতি কমানো খুব কঠিন হবে।

আসন্ন বাজেট আমাদের মধ্যম আয়ের দেশের লক্ষ্য পূরণে কতটা সহায়ক হতে পারে? এ বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল দিক কোনটি বলে আপনি মনে করেন?

মধ্যম আয়ের দেশের লক্ষ্য পূরণে দরকার উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন ও রফতানির বহুমুখীকরণ। বাজেটে এসব বিষয়ে কিছু বক্তব্য থাকলেও তা অনেকটাই সাধারণ এবং দিকহীন। আমরা কেবল সরকারি ব্যয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চাইছি, কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এ প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। তাই আমি বলব, বাজেট লক্ষ্যপূরণের দিক থেকে যতটা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় ছিল বা আছে, বাস্তবায়নের জায়গায় ততটাই দুর্বল।

বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো বাস্তবায়নের দুর্বলতা ও স্বচ্ছতার অভাব। আমরা দেখতে পাই, অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ থাকলেও তার যথাযথ ব্যয় হয় না। আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় বাধা। বাজেটকে যদি আমরা শুধু একটি রাজনৈতিক দলিল বা সরকারের ফর্দ হিসেবে দেখি, তাহলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। আমাদের দরকার একটি বাস্তবভিত্তিক, সুশাসনসম্মত ও দৃষ্টিভঙ্গিমূলক বাজেট। সেই সঙ্গে প্রয়োজন একটি দক্ষ সরকার আর ভবিষ্যৎমুখী রাজনৈতিক দলও।