বাংলাদেশ হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সেই রূপকথার রাজ্য যেখানে প্রতিটি সম্ভাবনার ভাঁজে লুকিয়ে আছে সোনার মতো মূল্যবান বিনিয়োগের সুযোগ। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত নদীমাতৃক এ ছোট্ট ভূখণ্ডে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর জমি, বিপুল পরিমাণ কর্মক্ষম জনসংখ্যা, স্বল্প মূল্যের শ্রমিক এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি এক অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপান্তর করতে প্রয়োজন সরকারের যথাযথ তদারকি, রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের গঠন। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর আশিক চৌধুরী গত সাত মাসে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দিয়েছেন কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে তার প্রচারণামূলক কার্যকলাপের ফল এখনো দৃশ্যমান হয়নি। বিডায় নিবন্ধিত বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব যেমন নিম্নমুখী তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ কমেছে (সূত্র: বণিক বার্তা)। বেশ কিছুদিন ধরে বিদেশী বিনিয়োগের এমন নেতিবাচক পরিস্থিতির জন্য বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্টদের দিকে অভিযোগের তীর নিক্ষেপ করা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এ পরিস্থিতির জন্য এককভাবে বিডার চেয়ারম্যান বা একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা কতটা যৌক্তিক? বিডার চেয়ারম্যান কোনো আলাদিনের দৈত্য নন যে তার একটি নির্দেশে রাতারাতি সবকিছু পাল্টে যাবে! মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগ একটি চলমান ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া যার ফল রাতারাতি আসে না। বিডা একা কখনই রাজনৈতিক বা কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে পারবে না বরং এখানে দরকার সমন্বিত প্রচেষ্টা।

এখন একটু চোখ বুলানো যাক, বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে যে শর্তগুলো পূরণ করা আবশ্যক, বর্তমানে এর কতটুকু বাংলাদেশ পূরণ করতে সক্ষম। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার নেই, আছে অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার নয়, বরং এটি হলো একটি অস্থায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা যা নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য গঠিত। অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিদায়ী সরকারের প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু এখনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এ সরকারকে। একদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল চাচ্ছে দ্রুত নির্বাচন দেয়ার জন্য তো অন্যদিকে সাধারণ ছাত্র-জনতা আন্দোলন করছে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার জন্য। তাছাড়া গত ১৭ বছরে যার যত দাবিদাওয়া আছে, ছোট হোক বড় হোক, রাজপথ ব্লকেড দিয়ে দাবি আদায়ের আন্দোলন করাটা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে এখন। প্রতিদিনের ধর্মঘট ও অবরোধ দেশে একটি অনিশ্চয়তার চিত্র তৈরি করছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সাপ্লাই চেইন, যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অন্যতম উদ্বেগের জায়গা। এছাড়া বর্তমান সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের পর যেসব রাজনৈতিক দলের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার সম্ভাবনা আছে, তা তখনো বলবৎ থাকবে কিনা, সে বিষয় নিয়েও রয়েছে তাদের উদ্বেগ।

৫ আগস্টের পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছিল তার যথাযথ উন্নয়ন এখনো সম্ভব হয়নি। অপরাধ প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই তারা সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না, ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। এ আস্থার অভাব থেকেই এক ভয়াবহ সামাজিক প্রবণতা ক্রমে বাড়ছে—মব জাস্টিস, অর্থাৎ জনগণের হাতে বিচার। সাম্প্রতিক সময়ে কোনো সন্দেহ বা গুজবের ভিত্তিতে জনগণ নিজেরাই বিচারক হয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে, কখনো-বা সেটা প্রাণঘাতী আকার ধারণ করছে। চুরি, ছেলেধরা বা যেকোনো অপরাধের সন্দেহ হলেই কখনো কখনো নিরীহ মানুষও মব জাস্টিসের শিকার হচ্ছেন। এছাড়া সম্প্রতি আমাদের দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান কয়েক দিনের জন্য সামরিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েছিল, যা এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এছাড়া ভারতের সঙ্গে সীমান্তে আমাদের টুকটাক উত্তেজনা চলছে নিয়মিত। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ইস্যু এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার অভাব এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি না থাকায় এটি ক্রমেই একটি নিরাপত্তাঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশে বিগত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি, তাদের পরিবার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে, যার অনেকগুলোর রয়েছে প্রমাণিত ভিত্তি। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য কিংবা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকেন, তখন বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারানো খুবই স্বাভাবিক। অতীতের এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম দেশের ব্যাংক খাতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বহু ব্যাংক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে; এমনকি কিছু ব্যাংক তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। পুরো আর্থিক খাতেই সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের টালমাটাল অবস্থা, যা দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ হার ১৫ শতাংশ বা তারও বেশি, যা স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য চরমভাবে নিরুৎসাহজনক। এত উচ্চ হারে ঋণ নিয়ে যে কেউ নতুন ব্যবসা শুরু করতে বা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী হবে না—এটি একেবারেই স্বাভাবিক। উচ্চ সুদের বোঝা বিনিয়োগের লাভজনকতা কমিয়ে দেয় এবং ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে উৎপাদন ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এসব খাতের খরচ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনেক বেশি, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে কম ব্যয় এবং স্থিতিশীল নীতির দেশগুলোয় বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা যখন এমন প্রতিকূল পরিবেশে বিনিয়োগে আগ্রহ হারান, তখন বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় ও অনাস্থা সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আচরণ ও আত্মবিশ্বাসকে একটি সূচক হিসেবে বিবেচনা করে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। কর ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এনবিআরের করনীতি অনেক সময় পূর্বানুমানযোগ্য নয়, যা একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া বাংলাদেশ থেকে উপার্জিত অর্থ নিজ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের। লজিস্টিক অবকাঠামো নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। যেখানে পুরনো বিনিয়োগকারীদের নতুন করে বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কা কাটেনি, সেখানে রাতারাতি নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করাটা যেন আষাঢ়ে গল্প!

দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হলে নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সহজ ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কার্যকর নীতিমালা। মনে রাখতে হবে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কেবল সরকার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব নয়, বরং দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে দেশে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখতে। ৫ আগস্টের পর দেশে যে বিশৃঙ্খলা চলছে সেটা নিরসনে কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, বরং নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকে দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে। উপযুক্ত পরিবেশ থাকলে বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই আসবেন মূলধন নিয়ে বিনিয়োগ করতে; আমাদের কাউকে ডেকে আনতে হবে না।

তানজিলা আমির: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি