আমাদের অর্থ উপদেষ্টা সম্প্রতি জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা, উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলের ডাক্তারদের, যাদের যথেষ্ট আয় আছে কিন্তু কর ফাঁকি দেয়া হয়েছে, তাদের করের আওতায় আনার জন্য। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, চিকিৎসক ও আইনজীবীদের যাতে করের আওতায় আনা যায়, সেজন্য রসিদ ইস্যু করা বা তাদের ফি বাবদ ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত আছি। নগদ লেনদেনের কারণে অনেক হিসাব সহজে যাচাই করা যায় না। কিন্তু ক্যাশলেস সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যবসার লেনদেন চালু করা গেলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে আরো স্বচ্ছতা আসবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার বড় হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে ক্যাশলেস সিস্টেমের উদ্যোগ নিতে হবে। ক্যাশলেস অর্থনীতি বাস্তবায়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের মতো ইউনিফায়েড পেমেন্ট ইন্টারফেস (ইউপিআই) নিশ্চিত করা গেলে সহজেই একটা প্লাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএসের মাধ্যমে লেনদেন নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু শুধু ক্যাশলেস অর্থনীতি নিশ্চিত করলে কি কর সংগ্রহ বেড়ে যাবে?

ক্যাশলেস অর্থনীতির কোনো বিকল্প এ মুহূর্তে নেই। কিন্তু পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থায় বিভিন্ন বিভাগের (আয়কর, মূসক ও শুল্ক) মধ্যে ইন্টারঅপারেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান/কর্তৃপক্ষের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিস্টেম সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ইন্টারঅপারেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে।

ইন্টারঅপারেবিলিটি

আয়কর: বর্তমানে ই-টিন, ই-টিডিএস, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ (পিএসআর) ও ব্যক্তিগত আয়করের রিটার্ন মডিউল অনলাইন সিস্টেমে আছে। কিছু মডিউল অনেক পুরনো এবং বর্তমান মডিউলগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন সম্ভব নয়। এছাড়া অন্যান্য মডিউল (যেমন করপোরেট আয়কর রিটার্ন, নিরীক্ষা, আপিল, ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট, এডিআর ও রুটিন কাজ) এখনো তৈরি হয়নি।

সিস্টেমটি এমন সামগ্রিকভাবে তৈরি করতে হবে যাতে এটি আয়করের অন্য মডিউলগুলো এবং মূসক ও শুল্ক সিস্টেমের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান/কর্তৃপক্ষের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যায়।

মূসক: বর্তমানে মূসক নিবন্ধন, মূসক রিটার্ন এবং ফর্ম ৪.৩ জমা দেয়ার কাজ অনলাইনে সম্পন্ন করা যায়। অন্যান্য মডিউল, যেমন ক্রয়-বিক্রয়ের ইনভয়েস সফটওয়্যার থেকে অটোমেটিক্যালি জেনারেটকরণ (ই-ইনভয়েসিং), নিরীক্ষা, আপিল, ট্রাইব্যুনাল, এডিআর ও রুটিন কাজ অনলাইন সিস্টেমে আনা গেলে অটোমেশনের সুবিধা পুরোপুরি ভোগ করা যাবে।

ক্যাশলেস সিস্টেম চালু করা গেলে লেনদেন শনাক্ত করা যাবে। একজন ব্যবসায়ী মূসকের সীমা অতিক্রম করলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করবে এবং নিকটস্থ মূসক অফিসকে নোটিফিকেশন পাঠাবে। একটি অতিরিক্ত যন্ত্র (ইএফডিএমএস) বসিয়ে মূসক আহরণের বহু চেষ্টা বহু বছর ধরে সফল হয়নি। তাই যন্ত্র না বসিয়ে ক্যাশলেস লেনদেনের বাধ্যবাধকতা আনয়ন দরকার। এর ফলে ব্যবসায়ীদের দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনা যাবে এবং নিবন্ধিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে মূসক আহরণ সহজ হবে। মূসক আদায়ের ভিত্তিতে আয়কর আহরণও সহজ হবে। বড় ব্যবসায়ীদের জন্য ই-ইনভয়েসিং চালু করলে মূসক আহরণ এবং রেয়াত যাচাই সহজ হবে।

শুল্ক: বর্তমানে অ্যাসাইকুডা, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) মডিউলের কিছু মডিউল চালু আছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ধন্যবাদ দিতে হয়—দেরিতে হলেও এনএসডব্লিউ কিছু মডিউল চালু করেছে। অন্যান্য মডিউলের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। উদাহরণস্বরূপ ভ্যালুয়েশন মডিউল কার্যকর করার ফলে সব কাস্টমস স্টেশনে একই পণ্যের একই কাস্টমস ভ্যালু নিশ্চিত করা যাবে। এই মডিউলে পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ দিতে হয় এবং নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ ব্যতিরেকে শুল্কায়ন শেষ করা যায় না। ফলে স্বচ্ছতার সঙ্গে যথাযথ ভ্যালুয়েশন নিশ্চিত করা যায়।

আয়কর, মূসক ও শুল্কের সব মডিউলের মধ্যে আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে একজন করদাতার মূসক অনলাইনের বা অ্যাসাইকুডা অনুযায়ী আমদানি তথ্যের সঙ্গে নিরীক্ষা রিপোর্টের গরমিল থাকলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করবে।

এছাড়া কর এবং মূসকের বিভিন্ন রিটার্ন পুরোপুরিভাবে শুধু অনলাইনে দাখিলকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরাসরি অফিসে গিয়ে রিটার্ন দাখিলকরণের পদ্ধতি আইনগতভাবে বন্ধ করতে হবে।

ইন্টারঅপারেবিলিটি

আমরা প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেখি অমুক ব্যক্তি ৩০০ একর জমি, ১০টি ফ্ল্যাট, অসংখ্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা এবং অন্যান্য সম্পদ আছে যা কর কর্মকর্তার কাছে দাখিলকৃত হিসাবে অপ্রদর্শিত রেখেছেন। আমাদের কর ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা এই ইন্টারঅপারেবিলিটির অভাব।

বর্তমানে গাড়ি এবং সঞ্চয়পত্র একজন করদাতা লুকাতে পারেন না যেহেতু এগুলো অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) দিয়ে সংযুক্ত। কিন্তু কীভাবে বাকি বিষয়গুলো সংযুক্ত করা যায়?

সিটি করপোরেশনে অবস্থিত ফ্ল্যাট মালিককে হোল্ডিং ট্যাক্স দিতে হয়। হোল্ডিং ট্যাক্স জমার রসিদে/সিস্টেমে ই-টিন/এনআইডি তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে। সিটি করপোরেশন পরবর্তী সময়ে ই-টিন/এনআইডি-ভিত্তিক ফ্ল্যাটের তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে প্রেরণ করবে। এটি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ। দীর্ঘমেয়াদে এপিআই দিয়ে সংযুক্ত থাকতে হবে।

জমির খাজনা এখন অনলাইনে পরিশোধ করা যায়। খাজনা জমার রসিদে/সিস্টেমে ই-টিন/এনআইডি তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভূমি অফিস পরবর্তী সময়ে ই-টিন/এনআইডি-ভিত্তিক জমির তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে প্রেরণ করবে। এটি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ। দীর্ঘমেয়াদে এপিআই দিয়ে সংযুক্ত থাকতে হবে।

ধীরে ধীরে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আরজেএসসি, বিএসইসির সিস্টেমের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিস্টেম রিয়েল টাইমে এপিআই দিয়ে সংযুক্ত থাকতে হবে, যাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ই-টিনভিত্তিক বিভিন্ন করদাতার মোট সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের পরিমাণ যাচাই করতে পারে।

অবকাঠামো

প্রাতিষ্ঠানিক: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অর্গানোগ্রামে আইটি কাজের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন পদে প্রয়োজনীয় লোকবলের সংখ্যা ও তাদের বিশেষায়িত যোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে। পর্যাপ্তসংখ্যক সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার স্পেশালিস্ট, হিউম্যান রিসোর্স স্পেশালিস্ট, ফাইন্যান্স স্পেশালিস্ট ও গবেষণা স্পেশালিস্ট নিয়োগ দেয়া জরুরি।

ভৌত: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে যথাযথ ভৌত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে এবং তথ্যপ্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয়সংখ্যক কম্পিউটার, সফটওয়্যার, নেটওয়ার্কিং ডিভাইস, সার্ভার, ডাটা স্টোরেজের ব্যবস্থা করতে হবে। এই সিস্টেমগুলো রক্ষণাবেক্ষণের পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।

উল্লিখিত কার্যক্রম সম্পাদনের লক্ষ্যে যথাযথ বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং এসবের পরিচালনা ও পুনঃসংস্কারের জন্য ধারাবাহিকভাবে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।

সুবিধা: ক. কর ফাঁকি রোধকরণ সহজ হবে ও৷ লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত হবে খ. অটোমেশনের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত ও যাতায়াতের কাজ কমে গেলে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কম হবে। যাতায়াত বন্ধের ফলে অনৈতিক লেনদেনের সম্ভাবনাও কমবে গ. রাজস্ব কর্মকর্তাদের রুটিন কাজ কমে যাবে। সরকারের বেতন খরচ কমার পাশাপাশি যথাযথ প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষা করে অধিক কর আহরণে মনোনিবেশ করা যাবে।

অতীতে ক্যাশলেস অর্থনীতি বাস্তবায়নে বহু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল কিন্তু কোনো আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর, মূসক, শুল্কের জন্য বিভিন্ন স্বতন্ত্র সফটওয়্যার তৈরি করেছে, কিন্তু তাতেও কোনো আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। তাই সময় এসেছে ইউপিআই একটি সমন্বিত আইটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দেশীয় আইটি ফার্ম দ্বারা এবং বিদেশী পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।

অনেকের ধারণা, সামগ্রিক অটোমেশনের মাধ্যমে অর্থনীতি ধসে পড়বে। এটা সত্যি যে শুরুতে এ ধাক্কা সামলানো কষ্ট হবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের বাস্তবতা মাথায় রেখে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব। জনমানুষের মতামতের ভিত্তিতে গঠিত এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থা তথা অর্থনীতি মজবুত ভিত্তিতে গড়ে উঠবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া: এফসিএ, ডিরেক্টর, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেড