ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোটের আয়োজন দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ কোনো প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে সরাসরি মত দেবে এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। যে কারণে নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু হওয়া আবশ্যক। নয়তো আগামীতে রাজনৈতিক অসন্তোষ-বিভাজন তৈরির ঝুঁকি রয়ে যাবে। আর গ্রহণযোগ্য গণভোট আয়োজনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সরকার ও সরকারের সর্বস্তরের কর্মজীবীদের নিরপেক্ষ অবস্থান।

এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক নির্দেশনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কমিশন জানিয়েছে যে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট প্রদানের জন্য জনগণকে আহ্বান জানাতে পারবেন না। গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬-এর আলোকে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে সরকারের কর্মজীবীরা গণভোট সম্পর্কে জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন না।

এ আইনি বিধান নতুন নয়। গণতান্ত্রিক অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক ও নির্বাচনসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে নিরপেক্ষ থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যাতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবমুক্ত রাখা যায়। সরকারি কর্মজীবীরা প্রশাসনিক ক্ষমতার অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের বক্তব্য, কর্মকাণ্ড কিংবা নির্দেশনা সাধারণ নাগরিকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এ বাস্তবতায় আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গণভোট বা নির্বাচনে তারা কোনো পক্ষের প্রচারক হতে পারবেন না। এতে জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রভাবমুক্ত এবং প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। এমনকি সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধি ১৯৭৯ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ বিধির ২৫-এর উপবিধি-১-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারী বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে অথবা বাংলাদেশ-বিষয়ক কোনো ব্যাপারে অংশগ্রহণ করিতে, সাহায্যার্থে কোনো চাঁদা দিতে বা যেকোনোভাবে সহযোগিতা করিতে পারবেন না’।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এরই মধ্যে গণভোটকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। বিশেষ করে ১১ জানুয়ারি থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রকাশ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারণায় যুক্ত হয়েছিল। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে রাষ্ট্রের লোগো সংবলিত ফটোকার্ড প্রকাশ, সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে উপদেষ্টাদের প্রচারমূলক বক্তব্য, জেলা প্রশাসকদের সভাপতিত্বে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যত একটি নির্দিষ্ট পক্ষের প্রচার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সে সময় থেকেই এসব উদ্যোগ জনপরিসরে নানা আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কি আইনসম্মতভাবেই এ ধরনের প্রচারে যুক্ত হতে পারেন। যদিও সে সময় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ভোটের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এসে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করেছে যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পক্ষপাতমূলক প্রচারণা আইনবিরোধী। এটি প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আবার নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ নন, তাই তারা নির্দিষ্ট পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন; নিষেধাজ্ঞা কেবল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রযোজ্য। কিন্তু যে সরকারের অধীনে গণভোট আয়োজিত হতে যাচ্ছে, উপদেষ্টারা সেই সরকারের অংশ। উপদেষ্টাদের কোনো পক্ষে অবস্থান নেয়া সরাসরি গণভোটের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আর গণভোটের ফলাফল যদি কোনো কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কার অবকাশ থেকে যায়।

গণভোটের মতো একটি প্রক্রিয়া তখনই কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হবে, যখন জনগণ পুরোপুরি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। সরকার ও সরকারি কর্মজীবীরা যদি সরাসরি কোনো একটি উত্তরকে কাঙ্ক্ষিত ফল হিসেবে উপস্থাপন করে, তবে তাতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। জনগণ তখন আর কেবল প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দেয় না, বরং সরকারি কর্মজীবীদের ভাষ্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। গণভোটের মূল দর্শন হলো—রাষ্ট্র প্রস্তাব উপস্থাপন করবে, জনগণ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তারাই যদি ‘উত্তর’ নির্ধারণে প্রভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তবে গণভোটের প্রকৃত উদ্দেশ্য অপূরণীয় থেকে যাবে।

এ পরিস্থিতিতে গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা কেবল ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে না, নির্ভর করবে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর। ভবিষ্যতে যে কোনো পক্ষ যদি এ সংস্কারের বিরোধিতা করে, তারা বলতে পারবে—রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করে একপক্ষকে সুবিধা দেয়া হয়েছিল। তখন আইনি বৈধতা থাকলেও রাজনৈতিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হতে পারে। গণতন্ত্রে বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা সমান্তরালে থাকে। একটি ছাড়া অন্যটি টেকসই হয় না।

নির্বাচন কমিশনের বর্তমান নির্দেশনা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বার্তা দেয়—প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভূমিকা নিরপেক্ষ থাকতে হবে। তবে এ নির্দেশনা কার্যকর করতে হলে কেবল বিজ্ঞপ্তি জারি করাই যথেষ্ট নয়। প্রশাসনের সব স্তরে এ নির্দেশনার সুষ্ঠু পরিপালন হওয়া জরুরি। কোন আচরণ অবহিতকরণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং কোন আচরণ প্রচারণা হিসেবে গণ্য হবে—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দিকনির্দেশনা থাকাটাও জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট ফল নিশ্চিত করা নয়, বরং একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। গণভোটের প্রশ্ন যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এ সিদ্ধান্ত জনগণ কতটা স্বাধীনভাবে নিয়েছে, সে বিষয়ে দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক মহলে আস্থা তৈরি করা। এজন্য রাষ্ট্রের সব অংশের আচরণে এমন একটি ভারসাম্য থাকা দরকার, যাতে জনগণ বুঝতে পারে তাদের মতামতই চূড়ান্ত, রাষ্ট্র কোনো উত্তর চাপিয়ে দিচ্ছে না। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত রাখা। এজন্য নির্বাচন কমিশন, সরকার ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার কোনো নির্দিষ্ট পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচারণা থেকে বিরত থাকাই সমীচীন।