দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যমুনা নদীর ওপর নির্মিত রেলসেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে গতকাল। এ সেতু উদ্বোধনের ফলে যোগাযোগ, বাণিজ্য ও অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অগ্রযাত্রার আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল। যোগাযোগের অন্যতম সাশ্রয়ী, সহজ, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব মাধ্যম হচ্ছে রেল। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও আয়বৈষম্য নিরসনে ভারসাম্যমূলক সমৃদ্ধির মূলে রয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার ভূমিকা। আর যোগাযোগের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে রেল। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগের ফলে বদলে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। পদ্মা সেতুর পর এবার যমুনায় রেলসেতু নির্মাণে বদলে যাবে উত্তর-দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ।

স্থলপথে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের বড় অংশই সংঘটিত হয় স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে। এসব স্থলবন্দরের অধিকাংশের অবস্থান দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সীমান্তে। এসবের মধ্যে বেনাপোল ও বুড়িমারী স্থলবন্দর অন্যতম। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর ও ভারতের মালদহের মধ্যে রেলপথে পণ্য পরিবহনে রেল নেটওয়ার্ক রয়েছে। এ পথে ট্রেনে বিপুল পণ্য আমদানি-রফতানি হয়। যমুনা রেলসেতু চালু হওয়ায় রেলপথে ভারতের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রফতানি বাড়বে। ফলে আমদানি-রফতানি খরচ কমে যাওয়াসহ যমুনা সেতু ও মহাসড়কের ওপর চাপ কমবে। এর ফলে যমুনা সেতুর ঝুঁকিও হ্রাস পেয়েছে। মানুষের সহজ যাতায়াত যেমন নিশ্চিত হয়েছে, তেমনি উত্তর জনপদের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গ থেকে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হবে, কমবে পণ্য পরিবহন খরচ, যা এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

যমুনা নদীর ওপর বর্তমান সড়কসেতুর পাশে নতুন রেলসেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। এ রেলসেতুতে আসা-যাওয়ার দুটি লাইন (ডুয়াল গেজ ডাবল ট্র্যাক) রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নতুন সেতুর একটি লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। গতকাল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর থেকে সেতুটির দুটি লাইনেই ট্রেন চলাচল করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল সেতু পার হতে ট্রেনে লাগবে ৩-৫ মিনিট। সেতুর দুই পাড়ের স্টেশন সয়দাবাদ ও ইব্রাহিমাবাদের মধ্যে দূরত্ব ১৩ কিলোমিটার। এ অংশ পার হতে ৭ মিনিটের বেশি লাগবে না। আগে যমুনা সড়কসেতু পার হতে ট্রেনের সময় লাগত ২০-২৫ মিনিট। নতুন সেতু দিয়ে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি যাতায়াতের সময়ও কমবে। নতুন সেতু চালুর ফলে পুরনো যমুনা সড়কসেতুর রেলপথ দিয়ে আর ট্রেন চলাচল করছে না।

১৯৯৮ সালে যমুনা নদীর ওপর সড়কসেতু চালু হয়। ওই সেতুতে শেষ মুহূর্তে রেল ট্র্যাক যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়। তবে ২০০৬ সালে সেতুটিতে ফাটল দেখা দেয়ার পর সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। তখন থেকে সেতু দিয়ে ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করত। এ সমস্যার সমাধানে সরকার যমুনা নদীর ওপর পৃথক রেলসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলসেতু নির্মাণের প্রকল্প নেয়া হয় ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। জাপান ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে সেতুটি নির্মিত হয়েছে। প্রকল্পের নকশা প্রণয়নসহ সেতুর নির্মাণ ব্যয় প্রথমে ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের মধ্যে এর কাজ শেষ করার কথা ছিল। পরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৫ সাল পর্যন্ত। প্রকল্পের শুরুতে এ সেতুর নাম ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত বছরের ডিসেম্বরে সেতুর নাম পাল্টে যমুনা রেলসেতু রাখা হয়। নতুন রেলসেতু ৫০টি পিলারের ওপর ৪৯টি স্প্যানে নির্মিত হয়েছে। এ সেতুতে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। রেলওয়ে সূত্র বলছে, তারা সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল নির্ধারিত করে দিয়েছে। তবে এর চেয়েও কম গতিতে ট্রেন চলাচল করবে।

দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও আয়বৈষম্য নিরসনে ভারসাম্যমূলক সমৃদ্ধির মূলে যোগাযোগ ব্যবস্থার ভূমিকা। যেহেতু যোগাযোগের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম রেলওয়ে সেহেতু অর্থনৈতিক উন্নয়নে রেলসেতুর ভূমিকাও অপরিসীম। বাংলাদেশে তিন হাজারের বেশি রেলওয়ে সেতু আছে। এতদিন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে সেতু ছিল পাবনার পাকশীতে নির্মিত শতবছরের পুরনো হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। বর্তমানে যমুনার ওপর নির্মিত সেতুটি খুলে দেয়ায় এটিই দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে সেতু। সেতুটি উদ্বোধন হওয়ায় ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রেলওয়ের যোগাযোগে শুধু নতুন দিগন্তই উন্মোচন করেনি, বরং ঢাকার সঙ্গে রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা অঞ্চলের রেলওয়ে যোগাযোগে বর্তমান যে বিড়ম্বনা ছিল, সেটিও আর থাকছে না। সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্নে করতে পারবে। কমে যাবে পরিবহনের খরচও। পণ্যের দাম কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ সেতু। সেই সঙ্গে মহাসড়কের ওপর চাপও অনেকটা কমে আসবে। এ রেলসেতু দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।