২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের ফলে প্রথমে কেউ কেউ ভেবেছিলেন যে দ্বিতীয় বিপ্লব বা দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। যদিও গণ-অভ্যুত্থানের প্রাথমিক পর্বের আশাবাদের পর ধাতস্থ হয়ে অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই বলেছিলেন যে এর প্রাথমিক সম্ভাবনা অনেক উজ্জ্বল মনে হলেও পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থাটি খুবই তরল ও অনিশ্চিত। এর ফলাফল খুব খারাপও হতে পারে। ভালোও হতে পারে! নির্ভর করবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনগণ ও অভ্যুত্থানের বিপ্লবী ছাত্ররা অন্তর্বর্তী সরকারকে ঠিক পথে রাখতে পারবে কি পারবে না তার ওপর।
বর্তমান ভাবনা
এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে যে ইউনূস সরকার অভ্যুত্থান নয়, শাসক শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্য সেনা, দেশীয় দক্ষিণপন্থী শক্তি ও বিদেশী শক্তির (সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তি ও তাদের অনুগত দেশীয় শক্তি ও আন্তর্জাতিক অর্থনির্ভর এনজিও/প্রতিষ্ঠানগুলো) সমর্থনে গঠিত একটি অন্তর্বর্তী সরকার। শুধু তরুণ-কিশোরদের ওপর নির্ভর করে বা বামপন্থীদের অনুমোদনে এ সরকার গঠন হয়নি। আমরা এও জানি, আওয়ামী লীগ ছাড়া শাসক শ্রেণীরই নানা সময়ের নানা অংশ সাবেক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি। এছাড়া নবগঠিত তরুণদের এনসিপি এখন পর্যন্ত নিজেকে মধ্যপন্থী নতুন দল হিসেবে দাবি করলেও তার ভেতরে প্রচুর পরস্পর বিপরীত প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে (বাম, ডান, মধ্য ও ইসলামী, সবাইকে ধারণ করা একটি জগাখিচুড়ি দল!) এবং দল হিসেবে সুস্পষ্ট কোনো আদর্শ ধারণ করে তারা এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। উপরন্তু তারা এখনো আদর্শগত নানা ভাঙা-গড়া ও অস্থিরতার মধ্যে আছে। তবে যে সামান্য সময়ে তাদের কেউ কেউ বর্তমান সরকারে ছিল, তাতে তাদের অনেকের ভাবমূর্তিও কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধও হয়েছে। এ-যাবৎ ছাত্ররা কখনো গণ-অভ্যুত্থানের পর নিজেরাই সরকারের মন্ত্রী হননি!
তবে উল্লিখিত সব রাজনৈতিক শক্তির কমবেশি সমর্থন নিয়েই অন্তর্বর্তী সরকারই এখন পর্যন্ত দেশ চালাচ্ছে বলে দেখা যায়। এখন তাদের সামনে প্রধান প্রশ্ন, বাঘের খাদ্য না হয়ে বাঘের পিঠ থেকে নামার ব্যবস্থা করা।
তবে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীরা এ বিষয়ে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রকারী ও মৌলবাদীদের দিকে বিশেষ অঙ্গুলি নির্দেশ করে আসছেন। তাদের মতে ইউক্রেন, জর্জিয়া, আরব বসন্ত ইত্যাদি অঞ্চলের শাসনক্ষমতার পরিবর্তনের মতো বাংলাদেশের এটাও ছিল একটি ‘রঙিন বিপ্লব’ যার পেছনে সাধারণত থাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ডিপস্টেটের পুঙ্খানুপুঙ্খ গোপন নকশা, ‘মানবাধিকার ও টেকনিক্যাল অ্যাসিসট্যান্স’-এর নামে নানা আর্থিক বিনিয়োগ ইত্যাদি। পোস্ট ট্রুথ সোসাইটিতে নিওলিবারেল বয়ান ও ধর্মীয় বয়ানের মিশ্রিত নানা পপুলিস্ট প্রচার-অপপ্রচার দ্বারা এ ধরনের রেজিম চেঞ্জ সংঘটিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই হাইপোথিসিসের সবটা এখনো প্রমাণ করা না গেলেও আংশিক প্রমাণযোগ্য টুকরো টুকরো ঘটনা যোগ করলে একটি নকশা বা প্যাটার্নের সাক্ষাৎ পাওয়া কঠিন হবে না। সেই অনুযায়ী এর চূড়ান্ত ফলাফল হওয়ার কথা এক দক্ষিণপন্থীকে সরিয়ে আরেক দক্ষিণপন্থী বা আরো দক্ষিণ অভিমুখিন প্রো-আমেরিকান সরকার প্রতিষ্ঠা।
ভবিষ্যৎ ভাবনা
আসল প্রশ্নটা হচ্ছে, জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক শক্তিগুলো (গণতান্ত্রিক-দেশপ্রেমিক শক্তি বলতে বোঝাচ্ছি বাংলাদেশের তাদেরকে, যারা কমপক্ষে স্বৈরাচারী শাসন নতুন রূপে প্রত্যাবর্তন দৃঢ়ভাবে আটকাতে চান, বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির প্রভুত্বেরও ধাপে ধাপে অবসান চান ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক বিভক্তির সম্পূর্ণ অবসান চান—এ ত্রয়ী নীতির পক্ষের লোকদের বোঝাচ্ছি)। প্রগতিশীল দলগুলো দুর্বল হলেও তারা অবশ্য সর্বদা এ নীতিগুলোর পক্ষেই অবস্থান নিয়ে এসেছেন। এছাড়া আশা নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে অন্য যারা অংশগ্রহণ বা নীরবে তা সমর্থন করেছিলেন তারা এখন কীভাবে তাদের সেসব আশাসহ উল্লিখিত সাধারণ শত্রুদের প্রতিরোধ করে গণতন্ত্র, শোষণ-নির্যাতন-বৈষম্য নিরসনের নানা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবেন, সেটাই হচ্ছে জনগণের জন্য প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু। যদিও গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি হতাশা এবং এমনকি আশঙ্কা রয়েছে যে তবে কি এত আত্মত্যাগ বৃথা যাবে? কিন্তু তার পরও দেশের নাগরিকদের বলতে হবে, বিপ্লব বেহাত হয়ে গেছে বলে হাল ছেড়ে দেয়াটা মোটেও ঠিক হবে না। বর্তমানে ক্ষতি বা বিশ্বাসের বিচ্যুতি যা হওয়ার হয়ে গেছে ধরে নিয়ে ‘ড্যামেজ’ কমানোর জন্য মাঠে নামতে হবে।
পরীক্ষিত ধনিক শ্রেণীর শাসক দলগুলোর বাইরের দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে প্রগতিশীল সুনির্দিষ্ট অংশটি গণ-অভ্যুত্থানের আগেই মাঠেঘাটে যেই স্লোগান দিতেন তা হচ্ছে— ‘দুঃশাসন হঠাও-ব্যবস্থা বদলাও—বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প তৈরি করো’। প্রগতিশীলদের এ দাবি মহৎ হলেও তা এখন পর্যন্ত কার্যকরী করার কোনো দৃশ্যমান শক্তি তারা তৈরি করতে পারেননি। কিন্তু জামায়াতে ইসলামসহ গণ-অভ্যুত্থানের অন্য বড় শক্তিগুলো এত বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা না বললেও তারাও চেয়েছিলেন তাদের পছন্দমতো কিছু নিজস্ব আদর্শ ও ঐক্যমতভিত্তিক সংস্কার ও একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন। ড. ইউনূস ও ড. আলী রীয়াজের ঘোষিত লক্ষ্যও ছিল তদেরই মতো। তারাও বিপ্লব নয়, সীমিত ইতিবাচক সংস্কারই চেয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সীমিত সংস্কার নিয়েও জাতীয় ঐকমত্য হয়নি। আসলে বাস্তব ঐতিহাসিক কারণে তা সম্ভবও ছিল না। কারণ বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মতাদর্শ এক ছিল না। বিশেষত ইসলাম ও শরিয়াভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা যারা চান তাদের চাওয়ার সংগে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন যারা দেখেন তাদের বৈরিতামূলক দ্বন্দ্ব থাকাটাই স্বাভাবিক। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো চান ‘ইহলৌকিক’ বিষয়ে নিজ নিজ প্রাচীন ধর্মীয় প্রেসক্রিপশন আক্ষরিকভাবে চালু করতে। ফলে কোনো দেশে যদি একাধিক ধর্মের অনুসারী বা ধর্ম বিশ্বাসবহির্ভূত নাগরিক থাকে এবং তাদের যদি নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থভিত্তিক আক্ষরিক আইনের সুপারিশ থাকে তাহলে কিন্তু শরিয়া আইনের সংগে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আইনের একটি অমীমাংসাযোগ্য দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। তখন আল্লাহ, ভগবান ও যীশুকে একজায়গায় ডেকে এনে সমাধান করতে হবে যা বাস্তবে সম্ভব নয়!
তবে কেউ কেউ বলেন যে ভোটের বাজারে বা রাজনীতি বা আদর্শের বাজারে নানা সুবিধাজনক ব্যাখ্যা—বেচাকেনা যেহেতু চলে তাই শাসক শ্রেণীর রাজনীতিতে এসব মতভেদ বা দ্বন্দ্ব নিয়ে শেষ কথা বলে কিছু নেই। এখানে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনে সে ধরনের একটি ভঙ্গুর বা অস্থায়ী বন্দোবস্ত (Deal) হলেও হতে পারে। ড. ইউনূস ও আলী রীয়াজের দীর্ঘদিন সাধনার পর যোগ-বিয়োগ করে যে প্যাকেজ সনদটি প্রণীত হয়ে গণভোটের জন্য দেয়া হয়েছে সেটি সে ধরনেরই একটি দুর্বল ভঙ্গুর বন্দোবস্তের পরিকল্পনা বলেই প্রতিভাত হয়। কারণ এতে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে যার কোনো কোনোটি সবাই সহজেই মানবেন, যেমন ‘সংস্কার আপনি চান কি চান না?’ সবাই এতে ‘হ্যাঁ’ ভোটই দেবেন! কিন্তু যখন সংবিধানের বিশেষ বিশেষ সংস্কারের প্রস্তাব দেয়া হবে তখন সংবিধানসম্মতভাবে সংস্কার করতে হলে এক্ষেত্রে পার্লামেন্টে অনুমোদনের ব্যাপারটি অনিবার্যভাবে সামনে এসে যাবে। তখন আসলে শুধু গণভোট দিয়ে সমাধান করা যাবে না—অতীতের মতো সংসদেই সেই সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো পাস করিয়ে তার মীমাংসা করতে হবে। সেজন্যই কোনো কোনো পার্টি মনে করে গণভোট একটি অপ্রয়োজনীয় বিষয়। সংসদই এখানে সার্বভৌম নির্ধারক শক্তি। তবে ড. ইউনূস ও তার বন্ধুদের সেফ এক্সিটে সহায়ক হবে যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়। সেজন্যই সম্ভবত ইউনূস সরকার নিরপেক্ষ সরকার হিসেবে নিজেকে দাবি করলেও গণভোটে হ্যাঁকে জয়ী করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
চূড়ান্ত বিচারে, সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য সংসদীয় নির্বাচন ও নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই গণভোট, সরকার গঠন ও সংস্কারগুলোর পরিণতি নির্ভর করবে। সম্ভবত সে কথা মনে রেখেই বিএনপিও বর্তমানে সনদের ক্ষেত্রে ‘ভিন্নমত’ দেয়া সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে আপস প্রস্তাবানুসারে তাতে স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে আবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নির্বাচন একই দিনে করার জন্য অনড় ছিল। এ কথা ঠিক, ‘সংস্কার’ চাই কি চাই না শুধু এ প্রশ্ন নিয়ে ভোট হলে গণভোটে জয়লাভ করা যত সহজ ছিল, এখন প্যাকেজ ডিলে হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত করাটা ততোধিক কঠিন হবে। কারণ অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব আছে, যা সংবিধানকে স্পর্শ করে এবং তা নিয়ে প্রধান দলগুলোর মধ্যেই দ্বিমত রয়েছে। তদুপরি গণভোটের নিয়ম হচ্ছে ‘পুরোটা গ্রহণ করো নতুবা কোনোটাই না’। অনেকেই এ ধরনের ‘Either-or-Choice’ এ অস্বস্তি বোধ করতে পারেন এবং গণভোটে শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণ থেকেই বিরত থাকতে পারেন। অন্তত বামপন্থীরা এরই মধ্যে গণভোট যে অপ্রয়োজনীয় তা জানিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের সাধারণ ভোটাররাও এ ব্যাপারে অনিশ্চিত বা নেতিবাচক থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। তাহলে ইউনূস সরকারকে বাধ্য হয়ে নির্ভর করতে হচ্ছে জামায়াত ও এনসিপির ওপর। এটা দিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’কে জয়ী করা যাবে কি? সুতরাং ১২ ফেব্রুয়ারির দুটি ভোট নিয়েই এক ধরনের তরল অবস্থা বিরাজ করছে।
গণ-অভ্যুত্থানের আগে সবাই শেখ হাসিনাকে সরানোর ব্যাপারে প্রথমে ঐকমত্য পোষণ করলেও এবং ড. ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দিতে রাজি হলেও শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর ক্ষমতায় কে বসবে সেই প্রশ্নে কিন্তু কখনো কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি। গণ-অভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ে সবার একটি প্রিয় নেগেটিভ স্লোগান ছিল, ‘এক দফা এক দাবি—শেখ হাসিনা কবে যাবি’। কিন্তু যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন তার পর থেকে ওই শূন্য স্থানে কে বসবে সেই পজিটিভের বিষয়ে দেশী-বিদেশী শক্তি ও দেশের ভেতরের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা দ্বন্দ্ব ও মেরুকরণ শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং সেটাই ছিল অনিবার্য পরিণতি। এখন তারেক রহমানকে সেখানে শাসক শ্রেণীর দলগুলো সামনে আনছেন। কিন্তু সবাই কি তারা তা মানছেন? অন্তত জামায়াত তো নয়ই! নাকি বাইরে এক-ভেতরে আরেক?
বর্তমানে ঐক্য অনেকটাই ভেঙে গেছে
জামায়াত, ইসলামী দলগুলো, এনসিপি, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ, বামপন্থীরা কেউই আর বর্তমানে জাতীয়ভাবে এক কাতারে ঐক্যবদ্ধ নেই। স্বাভাবিকভাবেই নিজের দলকে কেন্দ্র করে ভোটে জেতার জন্য অথবা তলে তলে ভোট ঠেকানোর জন্য তারা কেউ কেউ গড়ে তুলছেন সুবিধাজনক কৌশলগত মৈত্রীজোট। এ পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে ১৬ বছর পর বহুপ্রতীক্ষিত ভোটের গণতন্ত্র। এ নির্বাচনে কোন ধরনের মিত্রদের জোট/যুক্তফ্রন্ট গঠন করে দেশপ্রেমিক-বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য এবং ব্যবস্থা বদলের সংগ্রামকে প্রগতিশীলরা কীভাবে এগিয়ে নিতে পারবে—এটা যেমন প্রগতিশীলদের সামনে মুখ্য প্রশ্ন। তেমনি দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির সামনে রয়েছে তাদের ৩১ দফা মতাদর্শভিত্তিক নিজস্ব বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে এগোনোর প্রশ্ন। অন্যদিকে এনসিপি ও জামায়াত চায় মুক্তিযুদ্ধের সংবিধানবিরোধী সংস্কারের সনদ নিয়ে এগোতে। এ সনদে চার মূলনীতি থেকে তিন মূলনীতি বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদ’, ‘সমাজতন্ত্র’¿ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ আদর্শগুলোকে বাদ রাখা হয়েছে। যদিও এগুলোর বদলে সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার মতো অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য বিমূর্ত শব্দগুলো আবার আমদানি করা হযেছে। যেজন্য বামরা কেউ কেউ এটুকু গ্রহণ করে সন্তুষ্ট রয়েছে, তবে প্রধান বামেরা সনদ শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরও করেনি। তবে আলী রীয়াজ কমিটির সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে জামাত ও এনসিপি মোটামুটি একমত হয়েছে এবং তারা উভয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে এগুলো পাস করিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। আগেই বলেছি, বিএনপি প্রথমে চেয়েছিল জাতীয় নির্বাচন আগে হোক, এখন শেষ পর্যন্ত শর্ত সাপেক্ষে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হওয়াটা মেনে নিয়েছে। তবে নির্বাচনে জিতলে তারা এ সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে কী বলবে বা করবে তা সংসদে বসে তারা পরবর্তী সময়ে ঠিক করবে। সুতরাং এত কষ্ট করে যে সনদ তৈরি হলো তার ভবিষ্যৎ এখন বস্তুত শূন্যে ঝুলছে!
করণীয়
অতীতে অনেক বড় বড় সামষ্টিক গণতান্ত্রিক সংগ্রামে এদেশের জনগণকে কখনো যুক্তফ্রন্ট করে, কখনো ইস্যুভিত্তিক ফ্রন্ট করে বা কনভেনশন/প্লাটফর্ম করে ঐক্যবদ্ধ করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। কখনো ফ্রন্ট ছাড়া এক ধরনের যুগপৎ, সমঅভিমুখী বা সমান্তরাল আন্দোলন করে বা এমনকি বিশেষ উপলক্ষে মিত্রদেরকে এক প্ল্যাটফর্মে এ ডেকে এনে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের সূচনা ও নানা আয়োজন বা পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে এবং অরাজনৈতিক গণসংগঠনের মাধ্যমে জনগণের সংগ্রামকে অগ্রসর হতে আমরা দেখেছি, আগামীতেও হয়তো দেখব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কী করলে উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি মৌলিক দুটি লক্ষ্য গণতন্ত্র ও বৈষম্য নিরসনের (আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যা পুনরায় বিশেষভাবে সামনে এসেছে) দিকে অগ্রগতি বিঘ্নিত হবে না, বরং ধাপে ধাপে দেশ সেদিকে এগিয়ে যাবে—সেই সুস্পষ্ট কর্মসূচিটি আগে প্রণয়ন করতে হবে? এ মুহূর্তে সেটি প্রণয়ন করে নির্বাচনী ইশতাহারে তা তুলে ধরে বামপন্থী, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক শক্তির প্রার্থীদের জনগণের মধ্যে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
[মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব]
এম এম আকাশ: অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক










