প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে গড়ে তোলা হয় শিশু বিকাশ কেন্দ্র। বর্তমানে দেশে মোট ৩৫টি সরকারি শিশু বিকাশ কেন্দ্র রয়েছে। ১০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে এসব কেন্দ্রে স্বল্প সময়ে বিশেষায়িত সেবা দেয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৪ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু চিকিৎসা নেয়। দুঃখজনকভাবে এসব কেন্দ্রের চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও কর্মীরা ১০ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না বলে উঠে এসেছে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটি আরো জানাচ্ছে, তাদের চাকরি আছে কি নেই, সে বিষয়েও কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য জানা না থাকায় চিকিৎসকসহ অনেকেই পদত্যাগ করেছেন। আবার যারা আছেন তাদের বেতন কবে হবে, সে নিশ্চয়তাও না থাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবাদান কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন। এদিকে এ কেন্দ্রগুলো বন্ধ হওয়ায় ৫০ হাজারের অধিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বলে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, যাতে এসব কেন্দ্রে সেবাদান কার্যক্রম অব্যাহত থাকে এবং শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো যায়। পাশাপাশি ইন্দ্রীয় বিকাশের পথ সুগম করা হয়।

সুস্থ জাতি গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। তাদের জন্য প্রয়োজন বিশেষ যত্ন, পরিচর্যা ও চিকিৎসা, যার মাধ্যমে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং তাদের জীবনযাপনের সক্ষমতাও বাড়বে। আর এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এ কেন্দ্রগুলো। অটিজম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, এনডিডি, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোমসহ নানা সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের বিশেষায়িত সেবা দেয় এসব কেন্দ্র, যেগুলোয় ১০ মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও থেরাপিস্টরা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন। আশঙ্কা রয়েছে, এতে প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর বয়স ১০-১২ বছর পার হয়ে গেলে অনেক থেরাপিই কার্যকর হয় না। তাই সময়মতো সেবা না পাওয়ার অর্থ হলো তাদের পুরো জীবনকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়া। আবার আর্থসামাজিক কারণে বেশির ভাগ পরিবারের জন্য এসব কেন্দ্রে সাশ্রয় মূল্যে যে চিকিৎসা পাওয়া যায়, তা বেসরকারি কোনো কেন্দ্র থেকে নেয়া সম্ভব নয়। সুতরাং সরকারের দ্রুতই সরকারি কেন্দ্রগুলোর সেবাদান কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া মনে রাখা প্রয়োজন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ প্রতিবন্ধী, যাদের পূর্ণ সম্ভাবনা ব্যবহারে ব্যর্থ হলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন সম্ভব হবে না। এ কারণেও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সম্মিলিত স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন চিকিৎসাসেবা একান্ত জরুরি। নিশ্চিতভাবে এক্ষেত্রে সরকারি ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোর বর্তমান পরিস্থিতির কারণ বাজেটে বরাদ্দ না থাকা। চতুর্থ স্বাস্থ্য খাত কর্মসূচির মাধ্যমে ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের জন্য বার্ষিক ১০-১২ কোটি টাকা বাজেট দেয়া হতো, যেটি সমাপ্ত হয়েছে। কিন্তু এরপর রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তর না হওয়ায় শিশু বিকাশ কেন্দ্রে কোনো বরাদ্দ দেয়া হয়নি। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ মাস জুন পর্যন্ত কর্মীদের বেতন দেয়া সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছর থেকে এসব কেন্দ্রের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের বেতন বন্ধ রয়েছে। প্রথম কয়েক মাস বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে অনেকে নিয়মিত সেবাদানে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন।

প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, শিশু মনোবিজ্ঞানী, ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট, অফিস ম্যানেজার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন। এছাড়া শিশু বিকাশ কেন্দ্রের মাল্টিডিসিপ্লিনারি ট্রেনিং সেন্টারে বিভিন্ন বিষয়ের ইনস্ট্রাক্টর, কো-অর্ডিনেটরসহ মোট ১১ জন রয়েছেন। এ প্রকল্পের অধীনে কাজ করা সব মিলিয়ে মোট ১৮৬টি পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু চলতি মাসসহ ১০ মাস ধরে বেতন আটকে থাকায় এসব স্বাস্থ্যকর্মী কাজে আগ্রহ হারিয়ে এরই মধ্যে সাতজন শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, একজন শিশু মনোবিজ্ঞানী ও দুজন ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট পদত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে।

স্বাভাবিকভাবেই মানুষ কর্ম করে জীবিকা উপার্জনের তাগিদে। কিন্তু এভাবে বেতন বন্ধ থাকলে কার্যক্রমে আগ্রহ হারানো বা পদত্যাগ করা নিয়ে খুব বেশি দায় দেয়া যায় না। সরকারকে তাই এ সংকটের সমাধান করতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৪৪ হাজার ৪৪২টি শিশু সেবার আওতায় এসেছিল। এর আগের ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে যথাক্রমে ৫৩ হাজার ৮১৭ ও ৫৬ হাজার ১৭২টি শিশুকে বিশেষ সেবা দেয়া হয়। ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে কভিড-১৯ মহামারী চলাকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হলেও যথাক্রমে ২৬ হাজার ৪৭৫ ও ১৯ হাজার ২২১টি শিশু সেবা গ্রহণ করে। সে হিসাবে গত বছরের জুন থেকে চলতি এপ্রিল পর্যন্ত গত ১০ মাসে অর্ধলক্ষাধিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

আবার একটি শিশুর একাধিক সমস্যা থাকতে পারে। ফলে একাধিক সেবা দিতে হয়। এ ভিন্ন ভিন্ন সেবা দেয়ার জন্য রয়েছেন শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট ও শিশু মনোবিজ্ঞানী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শিশুকে একই সেবা একাধিকবার নিতে হয়। সে হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৯টি সেবা দেয়া হয়েছে শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোয়। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেয়া হয় যথাক্রমে ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৬৩ ও ১ লাখ ৬০ হাজার ২৭৮টি সেবা।

শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোয় সেবার পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে এ প্রকল্প কতটা প্রয়োজনীয় ছিল। অথচ যেখানে গত অর্থবছরেও ৪৪ হাজারের বেশি শিশু সেবার আওতায় এসেছিল, সেখানে বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় শূন্য। প্রশ্ন জাগে, এত প্রয়োজনীয় ও মানবিক একটি প্রকল্প কীভাবে এমনভাবে উপেক্ষিত হতে পারে? যদি এ সেবাকে রাজস্ব বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা না হয়, তবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ কিংবা শিশু অধিকার নিয়ে বলা সব কথা কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। প্রত্যাশা রয়েছে সরকার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোকে সচল করবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তুলবে, যাতে বাজেট ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দেশের প্রতিবন্ধী ও বিশেষচাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে না হারিয়ে যায়।