তবে ঢাবির গবেষণার ক্ষেত্রে অতীত ও সাম্প্রতিক কোনো তথ্য-উপাত্তই স্বস্তিদায়ক নয়। এজন্যই বিশ্ববিদ্যালয়টি ক্রমেই মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছে। সম্প্রতি বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের প্রায় ৪০ শতাংশই ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। বিশেষত ঢাবির গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে গত পাঁচ বছরে বরাদ্দকৃত অর্থের ৬০ শতাংশই ব্যয় করা যায়নি। এ পরিসংখ্যান ঢাবির গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রমাণ। তবে ফ্ল্যাগশিপ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গবেষণা সংস্কৃতির বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই নেতৃত্ব দেয়ার অবস্থানে নিতে হবে। এজন্য সরকারের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জরুরি।

ঢাবির রেজিস্ট্রার দপ্তর জানাচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দের ৩৭ দশমিক ১৬ শতাংশ অর্থ অব্যবহৃত থেকে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৬১টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। বিশ্বখ্যাত অনেক প্রতিষ্ঠানেও এতগুলো গবেষণা কেন্দ্র নেই। তবে ঢাবির ক্ষেত্রে গবেষণা কেন্দ্র শুধু সংখ্যা। গত পাঁচ বছরের হিসাব অনুযায়ী, ২০-২৫টি কেন্দ্র তাদের জন্য নির্ধারিত অর্থের ১ টাকাও ব্যয় করতে পারেনি। প্রশাসনিক গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র, জলবায়ু পরিবর্তন অধ্যয়ন কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভ ও ইতিহাস গবেষণা কেন্দ্রসহ সাতটি কেন্দ্রে টানা চার বছর কোনো গবেষণা কার্যক্রমই পরিচালিত হয়নি। আরো আটটি কেন্দ্রেও একই সমস্যা তিন বছর ধরে।

ঢাবির গবেষণা কার্যক্রমে স্থবিরতা উচ্চশিক্ষা খাতের এক ধরনের দ্বিমুখী সংকটকেই ইঙ্গিত করছে। প্রতিষ্ঠানটিতে গবেষণার জন্য মূল বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক বাজেটের মাত্র ২-৩ শতাংশ গবেষণা খাতে ব্যয় হয়। পরের সংকট আরো উদ্বেগজনক। সীমিত বরাদ্দের অর্থও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এর কারণ কাগজে-কলমে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন বহু গবেষণা কেন্দ্র সক্রিয় যেগুলোর বাস্তবে কোনো কার্যক্রম নেই। অনেক কেন্দ্রের নিজস্ব কার্যালয়, পরিচালক বা জনবল নেই। কোনো কোনোটির কার্যক্রম সেমিনার ও কর্মশালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আবার তহবিল বরাদ্দের সময় এমন অনেক কেন্দ্রকেও অর্থ দেয়া হয় যেগুলো কার্যত সক্রিয় নয়। তাই বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়।

ঢাবির গবেষণা কার্যক্রমে অবহেলা একদিনে তৈরি হয়নি। এ বিশ্ববিদ্যালয়েই সত্যেন বোস থেকে শুরু করে অনেক খ্যাতনামা বিজ্ঞানী নিজেদের গবেষণা স্বপ্নকে উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু অতীতে রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনায় কিছু গবেষণা কেন্দ্র গড়া হয়। এসব কেন্দ্র গবেষণার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্বই জাহির করেছে বেশি। তাই কেন্দ্র বাড়লেও কার্যকারিতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। তহবিল ব্যয় না হওয়ার পেছনে গবেষকদের সীমাবদ্ধতাও একটি বাস্তব কারণ। বরাদ্দ এমনিতেই এত কম যে তা দিয়ে অনেক গবেষণা প্রকল্প সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয় না, ফলে অনেকে আবেদন করতেই আগ্রহী হন না। শিক্ষকদের সাধারণত যে অর্থ দেয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। ফলাফল প্রতিবেদন জমাদানের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে গবেষণা অনুদানপ্রাপ্ত ৯৬ শিক্ষকের মধ্যে ২১ জন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৫ জনের মধ্যে ৩৭ জন এখনো নির্ধারিত গবেষণা প্রতিবেদন জমা দেননি। এ থেকে স্পষ্ট, কম বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দ যথাযথভাবে কাজে না লাগা—দুটোই একে অন্যকে শক্তিশালী করছে। অপ্রতুল অর্থ গবেষকদের আগ্রহ কমায়, আর স্বল্প আগ্রহ ও দুর্বল জবাবদিহি কাঠামো বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের পথেও বাধা তৈরি করে।

এক্ষেত্রে ইতিবাচক বিষয় হলো, ঢাবি প্রশাসন এ সমস্যাকে অস্বীকার করছে না। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা ৮-১০টি গবেষণা কেন্দ্র বন্ধের সুপারিশ এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে শুধু কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি সামগ্রিক ও কাঠামোগত সংস্কার। এ লক্ষ্যে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন গত তিন-চার বছরে যেসব কেন্দ্রে কোনো গবেষণা কার্যক্রম হয়নি, সেগুলোর কার্যকারিতা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনে একীভূত বা বিলুপ্ত করতে হবে। এভাবে সীমিত অর্থ ও জনবল প্রকৃত সক্রিয় কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত করা যাবে। এরপর যেসব কেন্দ্র সক্রিয় রাখা হবে, সেগুলোর নেতৃত্বে এমন পরিচালক প্রয়োজন যিনি অন্য প্রশাসনিক দায়িত্বের চাপ ছাড়াই কেন্দ্রের কার্যক্রমে মনোযোগ দিতে পারবেন। রেজিস্ট্রার ভবন থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত অর্থ পৌঁছতে যে সময়ক্ষেপণ হয়, তা কমিয়ে আনতে হবে। এভাবে গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত সময় যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারবেন গবেষকরা। গবেষকদের উৎসাহ বাড়াতে গবেষণা প্রকল্প সম্পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম অর্থের ভিত্তিতে অনুদানের বরাদ্দ নির্ধারণ করতে হবে। শুধু বরাদ্দ দিলেই চলবে না। নির্ধারিত সময়ে গবেষণা প্রতিবেদন জমা না দেয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা রাখতে হবে। যেহেতু সরকারি বরাদ্দ অপ্রতুল তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহিঃস্থ অনুদানের মাধ্যমে গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে আরো স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে গবেষকদের জন্য কাজ করার একটি সুসংহত ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। গবেষণার পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ যখন সরকারি কোষাগারে ফেরত যায় তখন পুরনো ঐতিহ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এজন্যই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পাশাপাশি জবাবদিহির কাঠামোও সমানভাবে জরুরি। দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা সংস্কৃতি গড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গৎবাঁধা পাঠদানেই সীমাবদ্ধ। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখার উপযোগী এবং শিল্প সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে গবেষণা সংস্কৃতির বিকাশ জরুরি। দেশের ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাবিকে কেন্দ্র করে গবেষণা ইকোসিস্টেমের পথনকশার বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই ভাবতে হবে। এভাবে গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও সংস্কারের অধীনে আনা সম্ভব হবে। গবেষণা কেন্দ্রের সংকট সমাধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ অর্থাৎ নিষ্ক্রিয় কেন্দ্র বন্ধের সুপারিশ একটি ইতিবাচক সূচনা হতে পারে। তবে এটি যেন বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ না হয়ে একটি ধারাবাহিক সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।