বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি পণ্য আমদানি করে সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে সরকার। বর্তমানের এ সংকট দেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। কারণ বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তার চেয়ে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কিংবা অসহনীয় ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসগুলোকে বাড়তি গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টি ক্রমেই সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের এক গবেষণা প্রতিবেদনেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
সংস্থাটির প্রস্তাব অনুযায়ী, শিল্প-কারখানার ছাদ কিংবা বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে যদি নবায়নযোগ্য শক্তির অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, তাহলে ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এ প্রস্তাব জ্বালানি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নির্ভরতা থেকে মুক্তির কিছুটা পথ দেখিয়েছে। কিন্তু বিষয়টিকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব দেয়া না হলে এমন প্রস্তাব কাগজে-কলমে থেকে যাবে।
নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের বেশকিছু সুফল রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো এতে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আসে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়মিত মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য বিমোচনেও ভূমিকা রাখে। সব দিক বিবেচনায় বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ স্থানে নবায়নযোগ্য শক্তিই হচ্ছে বিদ্যুতের সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎস। বাংলাদেশে বিষয়টি নিয়ে কাগজে-কলমে চমৎকার কিছু পরিকল্পনা প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু তা বাস্তবায়নে ধীরগতি ও বাস্তবায়নের পরিসংখ্যান হতাশাজনক।
ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসকে মূলধারায় আনার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সর্বশেষ সরকারি ও আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের অনেক বেশি হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আমরা মাত্র ১ হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। এটি আমাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫-৬ শতাংশের কাছাকাছি। বড় অংশই আসছে সোলার হোম সিস্টেম এবং ছোট আকারের সোলার পার্ক থেকে। জ্বালানি রূপান্তরের গ্লোবাল ট্রেন্ডের সঙ্গে তুলনা করলে এ অর্জন অত্যন্ত নগণ্য। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ৬০ শতাংশই এখন আমদানিনির্ভর।
প্রশ্ন হচ্ছে, সম্ভাবনা থাকার পরও নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশ পিছিয়ে কেন? এর কিছু বাস্তবিক ও নীতিগত কারণ রয়েছে। দেশে কৃষিজমির ঘনত্ব বেশি হওয়ায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্যায়ের সোলার পার্ক স্থাপন সহজ নয়। এদিকে জ্বালানি খাত মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং গ্রিড আধুনিকায়নের অভাব থাকায় নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগকারীরা অর্থায়নে উৎসাহ পান না। সবচেয়ে বড় সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি অবকাঠামো আমদানিনির্ভর থাকায় অতি দ্রুত এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার দেশের জাতীয় গ্রিড অনেক ক্ষেত্রে দ্বিমুখী বিদ্যুৎ প্রবাহ (সোলার থেকে গ্রিডে আসা) সামলানোর মতো স্থিতিশীল নয়। ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার সিস্টেম বা বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়তে না পারায় এ সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। বড় আকারের সোলার পার্কের জন্য প্রয়োজনীয় অকৃষিজমি নিশ্চিত করতে না পারায় অনেক প্রকল্প ঝুলে আছে। জাতীয় গ্রিড এখনো ‘ভ্যারিয়েবল’ বা পরিবর্তনশীল সৌরবিদ্যুৎ গ্রহণ করার মতো যথেষ্ট আধুনিক নয়। ফলে অনেক বেসরকারি উদ্যোক্তা বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও তা গ্রিডে দিতে গিয়ে যান্ত্রিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। মূলত সমন্বয়ের অভাব এবং ভর্তুকি নীতি বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানিতে (তেল-গ্যাস) সরকার যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়, তার তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরাসরি প্রণোদনা অনেক কম।
নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ চাহিদা টেকসইভাবে মেটানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমআকারের অর্থনীতির বহু দেশের উদাহরণ দেয়া যায়। এক্ষেত্রে ভারত, ভিয়েতনাম, কেনিয়ার মতো দেশগুলোর উদাহরণই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভিয়েতনাম বিগত বছরগুলোয় বিদ্যুৎ গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের অংশ শূন্য থেকে প্রায় ২৫ শতাংশে নিয়ে গেছে। এছাড়া ‘ফিড-ইন ট্যারিফ’ পলিসির মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করেছে। এমনকি আফ্রিকার দেশ মরক্কো নুর ওউয়ারজাজাতে প্রকল্পের মাধ্যমে মরুভূমি ও অব্যবহৃত ভূমিতে বিশ্বের অন্যতম বড় সৌরশক্তি কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এসব উদাহরণ থেকে বিকেন্দ্রীভূত সোলার সিস্টেম নির্মাণের বিষয়টিকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রয়োগের কথা ভাবা যায়।
সেক্ষেত্রে পরিকল্পনার মাধ্যমে এনজিও ও বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বিজনেস মডেল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কৃষিজমি রক্ষা স্ট্র্যাটেজিকে প্রাধান্য দিতে হবে। দেশের প্রতিটি গ্রামকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরিণত করার সময় এখনই। এক্ষেত্রে জমি রক্ষা আর জ্বালানি রূপান্তরকে সমান্তরালে এগিয়ে নিতে হবে। বর্তমানে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নেট মিটারিং চালু থাকলেও সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে এটি এখনো জটিল। এজন্য আবাসিক ভবন ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নেট মিটারিং প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে। গ্রাহক যে পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রিডে দেবে, তার সঠিক মূল্য বা ক্রেডিট যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তৈরি পোশাক খাতের চার কোটি বর্গফুট ছাদ ব্যবহার করে চার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব। এখানেও ‘নেট মিটারিং’য়ের মাধ্যমে কারখানার ব্যয় কমানো যাবে। এছাড়া ১৩ লাখ ডিজেলচালিত পাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তর করলেও তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হবে। এটি বছরে প্রায় ৮০ কোটি লিটার ডিজেল সাশ্রয় করবে।
জ্বালানি সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ‘স্মার্ট গ্রিড’ প্রযুক্তি প্রবর্তন করা জরুরি। এ প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করবে কখন গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিতে হবে আর কখন সোলার থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ পাঠাতে হবে। ফলে সিস্টেম লস বা ইনেফিশিয়েন্সি কমে আসবে। নবায়নযোগ্য শক্তি অবকাঠামোকে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করতে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের দাম ক্রয়সাধ্যের মধ্যে রাখতে হবে। এজন্য সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি দেশে মানসম্মত প্যানেল ও ব্যাটারি তৈরির শিল্পে প্রণোদনা দেয়া। এতে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমে আসবে।
এত নেতিবাচকতার মধ্যেও কিছু আশার কথাও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কম সুদে ঋণের ফলে অনেক উদ্যোক্তা সোলার প্যানেল ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছেন। তাছাড়া তৈরি পোশাক খাতের মালিকরা ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ খরচ ১৪-১৫ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের গাণিতিক লক্ষ্যমাত্রা থেকে দেশ এখনো অনেক দূরে। দেশের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের স্বার্থে এখনই এদিকে নীতিনির্ধারকদের গভীর মনোযোগ দিতে হবে।










