পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য এবারের বাজেটে ২ হাজার ২৪০ কোটি টাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২৫টি মন্ত্রণালয় মিলিয়ে জলবায়ুসম্পর্কিত সামগ্রিক বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা, যা বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। আপাতদৃষ্টিতে এ বিশাল বরাদ্দ এবং সরকারের সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনাকে পরিবেশের জন্য একটি বড় জয় মনে হলেও টেকসই নির্মিত পরিবেশ (Built Environmental Sustainability)—বিশেষ করে আবাসন খাত, টেকসই নগর পরিকল্পনা ও জলবায়ু অভিযোজনের বাস্তবতায় এর কার্যকারিতা নিয়ে গভীর ও সমালোচনামূলক আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
একটি দেশের ‘নির্মিত পরিবেশ’ বলতে মানুষের তৈরি বাসস্থান, কর্মক্ষেত্র, পরিবহন, রাস্তাঘাট ও সামগ্রিক অবকাঠামোকে বোঝায়। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এ নির্মিত পরিবেশকে টেকসই ও সহনশীল করে গড়ে তোলা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। এবারের বাজেটে আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি গাছ লাগানোর মেগা পরিকল্পনা ও উপকূলীয় বনাঞ্চলের ৫০ শতাংশকে কার্বন ট্রেডিংয়ের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে, যা ৩ শতাংশ ৫ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি করবে। এছাড়া ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা এবং থ্রিআর (রিডিউস, রিইউজ রিসাইকেল) নীতিমালার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে এ প্রশংসনীয় উদ্যোগগুলোর পাশে দেশের দ্রুত বর্ধনশীল আবাসন খাতকে জলবায়ুসহনশীল করার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের বড় ধরনের অভাব রয়েছে। প্রতি বছর নদী ভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় এবং তীব্র সাইক্লোনের কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভাগীয় শহর ও রাজধানীতে আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু এ বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য জলবায়ুসহনশীল সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তুলতে বাজেটে যে ধরনের কাঠামোগত প্রণোদনা ও বিশেষ বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল, তা এখনো অপর্যাপ্ত।
বাজেটের পরিবেশগত বরাদ্দের একটি বড় অংশ গ্রামীণ অবকাঠামো, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও প্রথাগত অভিযোজনমূলক প্রকল্পে ব্যয় করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, তবে শহরাঞ্চলের নির্মিত পরিবেশ ও আবাসন নির্মাণশৈলীকে এ মহাপরিকল্পনার বাইরে রাখলে দীর্ঘমেয়াদে বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের আবাসন খাতে পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী পোড়ামাটির বিকল্প ইট (যেমন হলো ব্লক বা পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক) ব্যবহারের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে এর কোনো দৃশ্যমান প্রতিফলন নেই। বাজেটে পরিবেশবান্ধব আবাসন সামগ্রী তৈরিতে কর রেয়াত বা আবাসন নির্মাতাদের জন্য কোনো বিশেষ ‘সবুজ প্রণোদনা’ রাখা হয়নি। ফলে বেসরকারি আবাসন খাত এখনো সেই সনাতন, উচ্চ-কার্বন নিঃসরণকারী নির্মাণ পদ্ধতির ওপরই নির্ভরশীল রয়ে গেছে, যা আমাদের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে ব্যাহত করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের শহরগুলো, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম, প্রতিনিয়ত ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর উত্তাপ দ্বীপে পরিণত হচ্ছে। অপরিকল্পিত কংক্রিটের ভবন, জলাশয় ভরাট এবং গাছপালা কেটে ফেলার কারণে শহরের ভেতরের তাপমাত্রা চারপাশের গ্রামীণ এলাকার চেয়ে অনেক বেশি থাকছে। এবারের বাজেটে বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং বৈদ্যুতিক বাস ও পরিবহন খাতের জন্য বড় ঘোষণা এসেছে—যেখানে পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক গাড়ির শুল্ক-কর কমানো হয়েছে এবং প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ট্যাক্স ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করা হয়েছে। তবে এ ইতিবাচক পরিবহন রূপান্তরের পাশাপাশি ভবনের ছাদে সবুজায়ন কিংবা পরিবেশবান্ধব উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করার জন্য নগর সংস্থা বা সিটি করপোরেশনগুলোকে কোনো বিশেষ তহবিল দেয়া হয়নি। টেকসই নির্মিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে শুধু গাছ লাগানো বা ইভি চালুর প্রণোদনাই যথেষ্ট নয়, বরং টেকসই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মতো প্রযুক্তিগুলোকে প্রতিটি নতুন ভবনে বাধ্যতামূলক করার জন্য আর্থিক নীতিমালার প্রয়োজন ছিল, যা এ বাজেটে অনুপস্থিত।
বাজেটের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমনের মধ্যে ভারসাম্যের অভাব। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে নির্মিত পরিবেশকে জলবায়ুসহনশীল করতে হলে অভিযোজনমূলক অর্থায়ন সবচেয়ে জরুরি। এবারের বাজেটের বড় অংশ অভিযোজনে রাখার কথা বলা হলেও, তার একটি বড় অংশই চলে যায় আমলাতান্ত্রিক ও প্রথাগত অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে। অথচ উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি রক্ষা করার জন্য যে বিশেষ ধরনের ‘লবণাক্ততাসহনশীল আবাসন মডেল’ বা ভাসমান বাড়িঘরের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি প্রয়োজন, সেখানে গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ খুবই নগণ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুদ্রাস্ফীতির হার বিবেচনায় নিলে এবারের বাজেট বাড়ানোর প্রকৃত কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। তাছাড়া প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬-এর অধীনে ১১টি নতুন কার্বন ট্রেডিং প্রকল্প নেয়ার যে পরিকল্পনা বাজেটে করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করতে পারলে নির্মিত পরিবেশের কোনো টেকসই রূপান্তর সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টেকসই নির্মিত পরিবেশের আলোচনা করতে গেলে দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলোকেও বিবেচনায় আনতে হয়। বাংলাদেশ এরই মধ্যে তার জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান হালনাগাদ করে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও শিল্প ও জ্বালানি খাতের পাশাপাশি নির্মাণ ও আবাসন খাতও দেশের মোট কার্বন নিঃসরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, তবু এ খাতকে নিম্ন-কার্বন অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য এখনো সুসংহত অর্থনৈতিক নীতি ও প্রণোদনা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণের ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন ভবন নির্মিত হচ্ছে, যার অধিকাংশই শক্তি দক্ষতা, পানি ব্যবস্থাপনা কিংবা জলবায়ুসহনশীলতার মৌলিক মানদণ্ড অনুসরণ করে না।
বিশ্বের অনেক দেশ এরই মধ্যে ‘গ্রিন বিল্ডিং’ বা পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণকে উৎসাহিত করতে কর ছাড়, সহজ ঋণ এবং বিশেষ সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করেছে। বাংলাদেশেও কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট ভবন আন্তর্জাতিক গ্রিন বিল্ডিং সনদ অর্জন করলেও সাধারণ আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ এখনো সীমিত। অথচ ভবনের নকশা পর্যায়ে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার বৃদ্ধি, সৌরবিদ্যুৎ সংযোজন, তাপ নিরোধক উপকরণ ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এছাড়া বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, হাওর এলাকা এবং নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চলের জন্য ভৌগোলিক বাস্তবতাভিত্তিক আবাসন নীতির প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। কক্সবাজার, সাতক্ষীরা, খুলনা, ভোলা কিংবা পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোতে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় একই ধরনের আবাসন মডেল কার্যকর হবে না। স্থানীয় পরিবেশ, লবণাক্ততা, বন্যা ঝুঁকি ও দুর্যোগের প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক নির্মাণ নির্দেশিকা প্রণয়ন জরুরি। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী আশ্রয় কেন্দ্রের সঙ্গে আবাসন অবকাঠামোর সমন্বয় এবং উঁচু প্লিন্থভিত্তিক ঘর নির্মাণের মতো উদ্যোগকে বাজেটারি সহায়তার আওতায় আনা প্রয়োজন।
নগর পর্যায়েও জলবায়ুসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার মতো বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ ও বায়ুদূষণ ক্রমেই জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই পরিবেশ বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ নগর জলবায়ু অভিযোজন তহবিল হিসেবে সংরক্ষণ করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে সবুজ অবকাঠামো নির্মাণে উৎসাহিত করা যেতে পারে। নগর পার্ক, উন্মুক্ত জলাধার, সবুজ করিডোর এবং পথচারীবান্ধব পরিবেশ শুধু পরিবেশগত সুবিধাই প্রদান করবে না, বরং নাগরিক জীবনের মানও উন্নত করবে।
সবশেষে টেকসই নির্মিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং জলবায়ুসহনশীল, শক্তি-দক্ষ এবং সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হতে পারে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এ দৃষ্টিভঙ্গিকে বাজেট বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে পরিবেশ বাজেটের প্রকৃত সুফল দেশের মানুষ ভোগ করতে পারবে।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি পরিবেশ রক্ষায় সরকারের সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটালেও টেকসই নির্মিত পরিবেশ ও আবাসনের মতো দূরদর্শী সংকটের সমাধান করতে পুরোপুরি সক্ষম নয়। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের দোরগোড়ায় নয়, বরং ঘরের ভেতরে চলে এসেছে। তাই পরিবেশ বাজেটকে কেবল প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাস বা বনায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, দেশের গৃহায়ন নীতিমালা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে। আগামী দিনগুলোতে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ওপর শুল্ক ছাড়, সবুজ আবাসনের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা এবং শহরের কংক্রিটের জঙ্গলকে সহনশীল করার জন্য সুনির্দিষ্ট কর সংস্কার করা না হলে, এ বিশাল বাজেট কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে একটি টেকসই ও নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।
ড. সজল চৌধুরী: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায় (চুয়েট) এবং ভবন পরিবেশ, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক










