বিগত সরকারের পতন ঘটেছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে। এ অভ্যুত্থানে গতি সঞ্চার করেছিল তৎকালীন সরকারকে ঘিরে জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ। আর জমা ক্ষোভের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল বিরুদ্ধ মত দমন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করতে গুম-খুন, মিথ্যা মামলায় দিনের পর দিন কারাবন্দি রাখা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। স্বভাবতই যখন এ সরকারে পতন ঘটে এবং নতুন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়, প্রত্যাশা জেগেছিল মানবাধিকার পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু এ পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন ঘটেনি, বরং আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এ সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর মব ভায়োলেন্স থেকে শুরু করে ছিনতাই-ডাকাতি, প্রকাশ্য দিবালোকে হামলা-হত্যা, মাজার ভাংচুর, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভবনে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্দেহভাজন বিবেচনায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ গ্রেফতার ইত্যাদি ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিষয়টি মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস)’ সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্যে আরো স্পষ্ট হয়েছে।
এইচআরএসএসের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে (২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত) ১ হাজার ৪১১ রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ১৯৫ জন নিহত ও ১১ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে সন্ত্রাসী হামলার ২৩৬ ঘটনায় ১৫৬ জন নিহত ও ২৪৯ জন আহত হন। এছাড়া তিন শতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হন এবং শতাধিক রাজনৈতিক কার্যালয় ও ১৩০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনির ৪১৩ ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ও ৩১৩ জন আহত হন। সাংবাদিকদের ওপর ৪২৭ হামলায় ছয়জন নিহতসহ ৮৩৪ জন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এছাড়া অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ১৫৫টি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় সাতজন নিহত ও ১ হাজার ৪০৩ জন আহত হয়েছেন।
এসব তথ্য জানান দিচ্ছে, গত ১৭ মাসে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা অস্থিতিশীল ছিল এবং জননিরাপত্তা নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি ছিল। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ সুগম করা। আর গণতান্ত্রিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কেবল তা-ই নয়, জননিরাপত্তা মৌলিক মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত, যার নিশ্চয়তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। বিষয়টি দেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১১ নং অনুচ্ছেদেও উল্লেখ রয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে...’। অর্থাৎ মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত গতি সঞ্চার ঘিরে সরকারের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা পূরণে সেভাবে সফলতা দেখাতে পারেনি।
বিগত ক্ষমতাচ্যুত সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল গুম-খুন, ভয়ভীতি, দমনপীড়নের রাজনীতির চর্চা। সেই সঙ্গে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনায় গ্রেফতার। বর্তমান সরকারের আমলে গুম-খুনের মতো ঘটনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনায় গ্রেফতারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৬-এর তথ্য বলছে, বর্তমানে আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মী ও সমর্থক হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে কারাবন্দি রয়েছেন। বিচারহীন অবস্থায় আটকে থাকা এসব ব্যক্তির জামিন নিয়মিতভাবে নাকচ করা হচ্ছে। আর এ তালিকায় রয়েছেন অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক ও রাজনৈতিক কর্মীরাও। এছাড়া আশঙ্কা করা হচ্ছে যে ভিন্নমত দমনে অতীতে ব্যবহৃত কঠোর বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আরো অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মোটেও প্রত্যাশিত নয়। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিবেচনা বা পক্ষপাতিত্ব স্থান পেতে পারে না। বিচার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সামান্য রাজনৈতিক প্রভাবও জনগণের আস্থা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।
সব মিলিয়ে জনগণের মধ্যে অতীতের মতোই ভীতি ও আস্থার অভাব রয়ে গেছে। প্রায় ৪৭ দশমিক ১৭ শতাংশ মানুষ এসব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) ২০২৫’-এ উঠে এসেছিল। অর্থাৎ জনগণকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় স্বস্তি দেয়ার মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি সরকার।
একটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দায়িত্বে থাকে সরকার। তাই সরকারের দায়িত্ব জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষে এ দায়িত্ব পালন করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু এ সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পুলিশের সক্রিয়তা ও বিচারকাজের গতিও সেভাবে বৃদ্ধি করতে পারেনি। আগে থেকে সম্ভাব্য অপরাধ শনাক্ত করা ও প্রতিহত করার কৌশলে যেমন ঘাটতি দেখা গেছে, তেমনি বেশির ভাগ সময় অপরাধ সংঘটিত হলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার নজিরও কম ছিল।
দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনমন ঘটেছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলার সময়েই। বিশেষ করে তৎকালীন সরকার পতনের পর তিনদিন দেশ ছিল সরকারবিহীন। এ সময় পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে একপ্রকার অচলাবস্থা তৈরি হয়। এ সুযোগ নিয়ে দেশে নৈরাজ্য বেড়ে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেয়া সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন ছিল দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। এজন্য প্রয়োজনীয় মনোযোগ, নজরদারি ও অন্যান্য উদ্যোগ নিতে হতো, যা মানবাধিকারের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু সেটি হয়নি, বরং ক্রমেই পরিস্থিতি আরো অবনমনের দিকে গেছে। ফলাফল হিসেবে এখনো দেশে নানা ধরনের সহিংসতা দেখা যাচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়েছে দেশের প্রায় প্রতিটি খাতে। এমনকি সরকারের কোনো সংস্কার কার্যক্রমও ঠিকমতো সম্পন্ন না হওয়ার পেছনে এর বড় দায় রয়েছে।
এদিকে জাতীয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আর বেশি দিন বাকি নেই। এ কয়েক দিনে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন বা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয় না। তবু প্রত্যাশা এই যে অন্তত নির্বাচনের পরিবেশ যেন স্থিতিশীল থাকে। আর নির্বাচিত সরকারের আমলে যেন মানবাধিকারের সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়।










