তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্স। স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নানা সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিগত সরকার আমলে প্রতিষ্ঠানটির অধীনে জরিপ, অনুসন্ধান ও কূপ খননসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়। এসব উদ্যোগ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শাসনামলেও অব্যাহত রয়েছে। তার পরও জাতীয় গ্রিডে সংস্থাটির গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। উল্টো গ্যাস সরবরাহ কমছে। গত ১৬ মাসের তুলনায় বর্তমানে বাপেক্সের গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ৩৩ শতাংশের বেশি। যদিও এ প্রতিষ্ঠানের আওতায় মোট দশটি গ্যাসফিল্ড রয়েছে, যার আটটি উৎপাদনে। অন্যদিকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী বাকি দুই প্রতিষ্ঠানের আওতায় কমসংখ্যক গ্যাস ফিল্ড থাকলেও তাদের উৎপাদন স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে।
গ্যাস উৎপাদন বা সরবরাহ বৃদ্ধিতে বাপেক্সের পিছিয়ে থাকার পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, কারিগরি অদক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও অবকাঠামোর কারণে মূলত প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হতে পারেনি। এর দায় বিগত সরকারের ওপর সবচেয়ে বেশি বর্তায়। অভিযোগ রয়েছে সেসময় দীর্ঘদিন বাপেক্সকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকারও অতীতের চিত্র খুব একটা পরিবর্তন করতে পারেনি। যদিও এ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ করছে সংস্থাটি এবং এ কাজে তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। এর পরও বাপেক্সের গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়াটা হতাশাজনকই।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল বাপেক্সের আধুনিকায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কূপ খননে গতি বাড়ানো ঘিরে। কিন্তু নতুন কূপ খনন বা পুরনো কূপ সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি—কোনো ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং যেসব গ্যাস ফিল্ড বাপেক্স বহু বছর ধরে পরিচালনা করছে, তাতেও উৎপাদন কমছে। অন্যদিকে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাবে ভোলা নর্থ ও জকিগঞ্জের মতো আবিষ্কৃত গ্যাস ফিল্ড থেকে এখনো গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা যায়নি। আবার রূপগঞ্জ উৎপাদনরত গ্যাস ফিল্ডের তালিকায় থাকলেও সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
বাপেক্সের সংকট প্রধানত কারিগরি দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব। উন্নত দেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি বা বেসরকারি কোম্পানিগুলো উৎপাদন কমে যাওয়ার পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘কূপ স্টিমুলেশন’, ‘এনহান্সড রিকভারি’, কূপ পুনর্নির্মাণ, উন্নত চাপ ব্যবস্থাপনার মতো উদ্যোগ নিয়ে থাকে। কিন্তু বাপেক্স তেমন কোনো কাজই বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এসব কাজ সম্পাদনের জন্য যে কারিগরি দক্ষতা ও প্রযুক্তি প্রয়োজন তা বাপেক্সের নেই। বিনিয়োগ সংকটের প্রসঙ্গ এক্ষেত্রে চলে আসতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছে সেগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, কূপ খনন, গতানুগতিক বিনিয়োগ ও রিগ আধুনিকায়ন ও ক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে বাপেক্সের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ। কিন্তু এজন্য সবচেয়ে জরুরি ছিল সংস্থাটির কারিগরি দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জোর দেয়া। এমনকি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাপেক্সের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়ার পেছনে অন্যতম একটি কারণ সংস্থাটিকে অন্য কোম্পানির কূপ খননকাজেও ব্যস্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া জরিপকাজসহ সরবরাহ কার্যক্রমের আওতা বেশি হওয়ায় নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দিতে পারছে না বাপেক্স। এছাড়া বিগত সরকার আমলে নেয়া ১০০ কূপ খনন পরিকল্পনায় বাপেক্সকে বড় পরিসরে যুক্ত করা হয়েছে। এ পরিকল্পনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। কেননা এসব পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ছাড়া এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
যদিও পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স কর্মকর্তাদের দাবি, সংস্থাটির গ্যাস উৎপাদন কমেনি, বরং আরো গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও অবকাঠামো জটিলতায় তা করা যাচ্ছে না। এছাড়া গ্যাসের উৎপাদন তুলনামূলক কমার কারণ মজুদ কমছে। এ কথা সত্য যে অবকাঠামোগত জটিলতায় বাপেক্সের দুটি গ্যাস ফিল্ড থেকে উত্তোলিত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না। এটিও অস্বীকার করা উপায় নেই যে গ্যাসের মজুদ কমছে এবং ভবিষ্যতে আরো কমবে। বাপেক্সের পাশাপাশি অন্যান্য কোম্পানির আওতায় গ্যাসের সরবরাহও কমে যাচ্ছে। কারণ গ্যাস নবায়নযোগ্য জ্বালানি নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রায় ১০ বছর আগেই গ্যাস কমার প্রাক্কলন করা হয়েছিল। সুদীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও কেন গ্যাসের উৎপাদন বা গ্যাসের বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোয় মনোযোগ দেয়া হলো না। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও রিগ আধুনিকায়ন বা নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধানে অপ্রতুল বিনিয়োগ করা হলো? উল্টো দেশকে জ্বালানি আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে। ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এখনো সেই পথ থেকে বেরিয়ে আসা যায়নি। চলতি অর্থবছরেও এলএনজি আমদানিতে ৫৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হবে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। অর্থাৎ জ্বালানি আমদানির ঘূর্ণিপাকেই আটকে আছে দেশ। বিদ্যমান বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখেই রয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। প্রথমত, বাপেক্সের যে গ্যাসফিল্ডগুলো উৎপাদনে নেই সেগুলোকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেসব ফিল্ডের গ্যাস অবকাঠামোগত সংকটে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যায়নি, সেগুলোর জন্য দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে কূপ খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্যাস উত্তোলনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা দূর করা আবশ্যক। পেশাদার নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপনা ছাড়া কখনই একটি প্রতিষ্ঠান তার লক্ষ্য পূরণ করতে পারে না। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জ্বালানির চাহিদা পূরণে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। এর ওপর দেশের শিল্পোন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নির্ভর করছে।










