হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়লেও জানুয়ারির শুরুতে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঢাকার কিছু বস্তিতে রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছিল বলে জানা যায়। এ প্রেক্ষাপটে সে সময় থেকেই জনগণকে সতর্ক করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন ছিল। তাতে হয়তো বর্তমানে পরিস্থিতি এতটা নাজুক হয়ে উঠত না। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুলাই-আগস্টে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে শিশুদের হামের টিকা দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিচারে এ কার্যক্রমের সময়সূচি কীভাবে আরো এগিয়ে আনা যায় তা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। এছাড়া পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা নতুন করে টিকার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। সেটা প্রকৃত অর্থে কাজে আসুক সেটাই প্রত্যাশা। এছাড়া বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোয় আক্রান্তদের জরুরি ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নয়তো হামে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বাড়বে বৈ কমবে না।
হাম সংক্রামক রোগ। একজন রোগী থেকে একাধিক মানুষ সহজেই সংক্রমিত হতে পারে। এটি প্রতিরোধের কার্যকর উপায় হলো হামের টিকাদান। বিশ্বব্যাপী এটিই এ রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রধান কৌশল। দেশেও দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য মিলেছে। কিন্তু সম্প্রতি পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে, যার প্রধানতম কারণ টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া। বিষয়টির ওপর স্বাস্থ্যমন্ত্রীও সম্প্রতি আলোকপাত করেছেন। গত আট বছর অতিসংক্রামক এ রোগটির টিকা না দেয়ার কারণেই এখন হামের প্রকোপ আবার দেখা যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। দেশের টিকাদান কর্মসূচির তথ্যও একই চিত্রই ফুটিয়ে তুলছে। ২০২০-এ করোনা মহামারী এবং ২০২৪-এ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টিকাদান কর্মসূচিতে ছেদ ঘটে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের যেমন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। এজন্য টিকাদানের বিষয়টিও গভীর পর্যালোচনা করা আবশ্যক।
সাধারণত ৯-১৫ মাস বয়সী শিশুকে হামের টিকা দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে আক্রান্তদের সিংহভাগই ৯ মাসের কম বয়সী বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আবার টিকা দেয়া ছিল এমন শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার কথাও জানা যাচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে হাম রোগ ছড়ানো ভাইরাসের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। কিংবা টিকার মানের প্রশ্নটিও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। এছাড়া অনেক শিশু হয়তো পূর্ণ ডোজ পায়নি। সুতরাং টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে এসব বিষয় সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে।
হামকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফের তথ্য মতে, হাম এখনো বৈশ্বিক স্বাস্থ্য হুমকি। গত বছর সংস্থা দুটির যৌথ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইউরোপে ২০২৪-এ হামে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। আর ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এ সময় এ দুই অঞ্চলের ৫৩টি দেশে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৫০টি হাম সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়, যা ছিল ১৯৯৭ সালের পর সর্বোচ্চ। এ প্রেক্ষাপটে ইউরোপে ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক উল্লেখ করে যে ‘হাম ফিরে এসেছে এবং পর্যাপ্ত টিকাদান বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বলে কিছু থাকবে না। তাই কোনোভাবেই হামকে অগুরুত্বের চোখে দেখা যাবে না। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এটি প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া অত্যাবশ্যক।’
তবে বর্তমানে প্রতিকারের দিকে নজর দেয়াও সমজরুরি। নয়তো এর সংক্রমণ বাড়তেই থাকবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক হাসপাতাল এখনই রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। কোথাও কোথাও পৃথক ‘হাম কর্নার’ চালু করা হলেও পৃথক আইসিইউ সুবিধার অভাব প্রকট। ফলে অবস্থা ক্রমেই জটিল হয়ে পড়া শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যার সাম্প্রতিক নজির রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সংকটে ১১ দিনে প্রায় ৩৩ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা। এটি হতাশাজনক, একই সঙ্গে লজ্জাজনকও বটে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এ কাঠামোগত সমস্যা মূলত দীর্ঘদিনের। জনস্বাস্থ্য নিয়ে এ ধরনের হেলাফেলা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। সরকারের উচিত এসব কাঠামোগত সমস্যার দিকে নজর দেয়া। নয়তো যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসার অভাবে প্রতিকারযোগ্য রোগে মৃতের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অপুষ্টির কারণে অনেক শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। বিশেষত শাল দুধ পর্যাপ্ত পান করার অভাবে। তাই অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার অবকাশ রয়ে গেছে। সন্তানের পুষ্টিনিরাপত্তার দিকে নজর দিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, হামের ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, সতর্কবার্তাও বটে। স্বাস্থ্য খাতে যতই সাফল্য অর্জন হোক না কেন, তদারকি ও কাজের ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলে যেকোনো সময় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ভবিষ্যতে টিকাদানের মতো জরুরি কর্মসূচি যেন ব্যাহত না হয় সে বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে যেতে হবে।










