দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। এতে মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ছে। সবচেয়ে কষ্টে রয়েছে নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষ। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কথা ভাবা প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চাল বিতরণ বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বের দাবি রাখে। কিন্তু এক্ষেত্রে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারিভাবে খাদ্যশস্য বিতরণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারিভাবে চাল বিতরণ করা হয়েছিল ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৭৪৩ টন। এর মধ্যে ওএমএসের আওতায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৩৬ টন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৭২ টন, ভিজিএফের আওতায় ১ লাখ ১০ হাজার ১৫৮ টন ও ভিজিডির আওতায় ১ লাখ ২২ হাজার ৬৪১ টন চাল বিতরণ করা হয়।

চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত অর্থাৎ একই সময়ে সরকারিভাবে মোট চাল বিতরণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৭৫ হাজার ৪৪ টন। এর মধ্যে ওএমএসের আওতায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৭৩ টন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ৯২ হাজার ১৬৬ টন ও ভিজিএফের আওতায় ১৮ হাজার ৭৪০ টন চাল বিতরণ হয়েছে। অর্থাৎ গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় এবার ২ লাখ ১২ হাজার ৬৯৯ টন কম চাল বিতরণ করা হয়েছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার সাধারণত আমদানির ভিত্তিতে এসব সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কোনো চাল আমদানি করা হয়নি। এদিকে চালের বিদ্যমান মজুদ ধরে রাখার পাশাপাশি চলমান ডলার সংকটের কারণে এখন সহায়তা কমানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দরিদ্র মানুষের উপার্জনের বড় অংশ চাল কেনায় ব্যয় হয়। অতীতে দেখা গেছে, নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে দরিদ্র মানুষের জন্য সরকার স্বল্প মূল্যে ও বিনা মূল্যে চাল বিতরণ বাড়ায়। চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে যেখানে সরকারের চাল বিতরণ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে বরং সরকার চাল বিতরণ কম করেছে। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর প্রভাব কিছুটা স্তিমিত হওয়ার সময়ও সরকার এমন ভূমিকা নিয়েছিল। তখন বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় আম্পানেও মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বর্তমানে সরকারি গুদামগুলোয় চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে বলে দাবি করা হলেও উৎপাদনের তথ্য সঠিকভাবে নিরূপণ করার প্রতি জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বর্তমানে চাল আমদানি বন্ধ রয়েছে। এক্ষেত্রে চাল উৎপাদনের তথ্যে গরমিল থাকলে ভবিষ্যতে বিপাকে পড়তে হতে পারে। তাই খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্ভুল তথ্য যেন থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের কথাও সরকারকে ভাবতে হবে। বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্যপণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে তাদের জন্য অবশ্যই সরকারের পক্ষ থেকে চাল বিতরণের মতো খাদ্যসহায়তা বাড়ানো দরকার। অথচ চাল বিতরণ কমানো হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে অপ্রত্যাশিত। বাজারে এখন চালসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের যে দাম, তাতে গরিব মানুষের জন্য তা কিনতে কষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার কথা ভেবে সরকারের এক্ষেত্রে দৃষ্টিপাত করা উচিত।

এজন্য খাদ্য অধিদপ্তরের খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির (ওএমএস) মতো খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি অব্যাহত রাখা দরকার। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ অন্তত দুই বেলা পেটপুরে খেতে পারবে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি এমনিতেই কম, এজন্য প্রধান খাদ্য চালের ক্ষেত্রে অন্তত সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ সবার কাম্য। কারণ এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির লাঘব হবে। সামাজিক অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কাও থাকবে না। আবার পর্যাপ্ত মজুদ আছে বলে বর্তমানে চাল আমদানি বন্ধ রয়েছে। কিন্তু আমন মৌসুমে চাল ঠিকমতো উৎপাদন হলে গুদামে সংরক্ষণ করার জায়গা থাকবে না। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাল থেকেও সরকারের বিতরণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখা যেতে পারে। কারণ বৃষ্টি ভালো হওয়ায় আমনের ফলন ভালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে।বস্তুত চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক লক্ষণ। সেই সঙ্গে বিশ্ববাজারে এখন চালের দামও বেশি। এদিকে রিজার্ভ ধরে রাখার জন্য ব্যয় কমানোর অংশ হিসেবে চাল আমদানি করা হচ্ছে না। কিন্তু দেশের দরিদ্র মানুষের কথা সরকারকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। যদি চাল আমদানি নাও করা হয়, তাহলে কীভাবে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে, সেক্ষেত্রে সরকারের যথোপযুক্ত পদক্ষেপ কাম্য। এজন্য প্রয়োজনে চাল উৎপাদন আরো বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। 

আজ থেকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ভর্তুকি মূল্যে চালসহ পাঁচটি পণ্য বিক্রির যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, টিসিবির পাশাপাশি অন্যান্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিগুলোও অব্যাহত রাখা হবে।