শৈশবে কিছু পদাধিকারীর দেখতাম ইয়া বড় গোঁফ। সূঁচালো, পাকানো আবার কারোবা দারুণ চওড়া। নাকের নিচে ঠোঁটের উপরিভাবে এত ছোট একচিলতে ঠাঁই যে বাংলাভাষায় জায়গাটির পৃথক নামই খুঁজে পাইনি, ইংরেজিতে গালভরা নাম ফিলট্রামে (Philtrum) অত চওড়া বুনোট গোঁফ হয় কী করে, আবার হলেও জুড়ে থাকে কী করে এটা শৈশবে ছিল এক বিশাল ভাবনার ব্যাপার। তারপর কারো কাছে একদিন শুনেছিলাম তারা নাকি গোঁফের যত্নআত্তির জন্য, গোঁফকে ‘মানুষ’ করতে মাসে পাঁচ সিকে ভাতা পান। আড়াই টাকা সেরের সরিষার তেলের যুগে বাহারি গোঁফ মাসে খেয়ে নেয় আধা সের তেল!

শখ হয়েছিল বড় হয়ে বাহারি গোঁফ রাখব। বড় হয়ে গোঁফ গজালে গুম্ফ ভাতার হদিস না পাওয়ায় আমার গোঁফ আর পুরুষ্ট হলো না। তবে গুম্ফ ভাতা থাকুক বা না থাকুক সরকারি কর্মচারীরা বেতনের সঙ্গে নানা রকমের ভাতা পান। সে ভাতা কোনোটা বেতনের সঙ্গে একেবারে গায়ে গায়ে, শার্টে যেমন বোতাম, পায়জামায় ফিতা। আবার কিছু ভাতা দেয়া হয় মেয়াদি। কোনো কোনো ভাতা আবার পদপদবি বেতন গ্রেডভিত্তিক। কোনো কোনো ভাতা কার্যকারণভিত্তিক। কমবেশি যে ভাতাগুলোর নাম জানা গেছে তার সংখ্যা প্রায় ২৩। ১. বাড়ি ভাড়া ভাতা, ২. চিকিৎসা ভাতা, ৩. উৎসব ভাতা, ৪. বাংলা নববর্ষ ভাতা, ৪. শিক্ষা সহায়ক ভাতা, ৫. আপ্যায়ন ভাতা, ৬. যাতায়াত ভাতা, ৭. মোবাইল ফোন ভাতা, ৮. পত্রিকা ভাতা, ৯. ধোলাই ভাতা, ১০. শ্রান্তিবিনোদন ভাতা, ১১. দুর্গম এলাকা ভাতা, ১২. পাহাড়ি ভাতা, ১৩. ঝুঁকি ভাতা, ১৪. ওভারটাইম ভাতা, ১৫. মাইলেজ ভাতা, ১৬. মহার্ঘ ভাতা, ১৭. বিশেষ ভাতা, ১৮. লাঞ্চ ভাতা, ১৯. ক্ষৌরী ভাতা, ২০. ডোমেস্টিক এইড ভাতা, ২১. টিফিন ভাতা, ২২. কার্যভার ভাতা, ২৩. প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা।

প্রথম জাতীয় বেতন স্কেলে প্রায় সোয়া দুই হাজারের বেশি বেতন স্কেলকে টেনে আঁটানো হলো ১০টার প্যাকেটে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, টাকার জোগান কম, কর্মচারীদের মধ্যে বেতনের সমতা আনতে হবে, নানা টানাপড়েনে এ বেতন স্কেল। এখনো পৌরসভা হতে না পারা রেল জংশনবিশিষ্ট থানা সদরে তখন ব্যাপক গুঞ্জরণ, সিও সাহেবের চেয়ে পশু ডাক্তার বড় অফিসার! সরকারি চাকরির জন্ম থেকেই তার ওজন মাপা হয় বেতন দিয়ে। ’৭৩-এর আগে সিওর চেয়ে কারিগরি পেশাজীবীদের মূল বেতন কম থাকলেও নানা ভাতায় তারা মোট বেতন বেশি পেতেন। প্রথম বেতন স্কেল চালু হলে থানা পশুপালন কর্মকর্তা (টিএলও) হলেন পঞ্চম গ্রেডের আর সার্কেল অফিসার উন্নয়ন (সিও) ষষ্ঠ গ্রেডের অফিসার। ফলে সিওর আহূত কোনো সভায় টিএলও যান না, ব্যত্যয় ঘটে সমন্বয়ের। সমন্বয়ের ধারা বজায় রাখতে যা করা হয়েছিল সে এক কাহিনী।

নাম না হয় নাই-ই বললাম। দেখা গেল নাম বেফাঁস হলে ধর্মঘটের হুমকি হতে পারে। প্রায় সব সরকারি কর্মচারী অবসরে যাওয়ার সময় শেষ মূল বেতনের ভিত্তিতে পান অবসরকালীন সুবিধা, গ্রাচুইটি ও পেনশন। কিন্তু ওই যে যাদের নাম বলতে সংকোচ, তারা এ সুবিধা পান চাকরিকালে যে মাইলেজ ও ওভারটাইম ভাতা পান সেসবও বিবেচনা করে। কেউ চাকরিকালে প্রাপ্ত উপরি আয় যে পেনশন সুবিধার সঙ্গে দাবি করেননি সেটা রাষ্ট্রের ভাগ্যজোর বলেই খুশি হতে হয়।

১৯৭৩-এর বেতন কমিশনের আগে বাড়ি ভাড়া ভাতা ও চিকিৎসা ভাতা ছিল না। বাড়ি ভাড়া ভাতা না থাকলেও যারা সরকারি বাড়িতে থাকতেন তাদের বেতন থেকে কেটে নেয়া হতো পদমর্যাদানুসারে মূল বেতনের ৭ দশমিক ৫ কিংবা ৫ শতাংশ হারে। বেতন যা দেয়া হতো তাতে চিকিৎসা, বাড়ি ভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়া, অফিসে টিফিন করা কোনোটাই আটকে থাকত না। উৎসবের সময় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতনের অর্ধেক অগ্রিম দেয়া হতো, উৎসবের পরের তিন মাসে সমন্বয় করা হতো সে অগ্রিমের টাকা।

স্বাধীনতার পর প্রথম বেতন কমিশনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বেতন কমে গেলে তা পুষিয়ে দেয়া হলো চিকিৎসা ভাতা ও বাড়ি ভাড়া ভাতা দিয়ে। যারা সরকারি বাড়িতে থাকলেন তাদের বাড়ির বিপরীতে কর্তন অব্যাহত থাকল। বাড়ি ভাড়া ভাতায় শর্ত জুড়ে দেয়া হলো কর্মস্থলে নিজের বাড়ি থাকলে ভাতা মিলবে না। পরে সে শর্তও আর থাকেনি। সরকারি কর্মচারীরা বাড়ি ভাড়া ভাতা পাওয়া শুরু করলে শুরু হলো বাড়ির ভাড়া বাড়ার প্রতিযোগিতা। স্বামী-স্ত্রী একই কর্মস্থলে সরকারি বাসায় থাকলে প্রথমে ছিল দুজনের কেউই বাড়ি ভাড়া ভাতা পাবেন না, যার নামে বরাদ্দ তার বেতন হতে কর্তন হবে ৭ দশমিক ৫ বা ৫ শতাংশ। পরে হলো যার নামে বাসা বরাদ্দ নেই তিনি বাড়ি ভাড়া ভাতা পাবেন, তবে যার নামে বরাদ্দ তিনি ভাতা পাবেন না এবং যথারীতি সাড়ে ৭ শতাংশ কর্তন হবে। এখনো যার নামে সরকারি বাসা বরাদ্দ তিনি বাড়ি ভাড়া ভাতা পান না, কিন্তু আগের মতো আর কর্তনটুকু নেই। ঢাকা থেকে কর্মচারীরা বাইরে যেতে চান না, তাই বিধান করা হলো ঢাকার সরকারি বাসা ছেড়ে কেউ দুই বছরের বেশি মফস্বলে চাকরি করে ঢাকায় ফিরে এলে বাসা ভাড়া ভাতা দ্বিগুণ পাবেন। এখন অনেকের সরকারি বাসায় না থাকাই লাভ, তাই অনেকেই আর সরকারি বাসায় থাকেন না। কবে হয়তো শুনব, সরকারি বাসায় বসবাসকারীকে বাড়ি ভাড়া ভাতা দিয়ে সঙ্গে বসবাস করার জন্য বাসার যত্নআত্তি ভাতাও দেয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্যবীমা শব্দটি আকর্ষণীয় হলেও আমাদের দেশে চালু হওয়ার আশাবাদ থাকলেও চালু হওয়ার কোনো লক্ষ্মণ নেই। বিপরীতে সরকারি কর্মচারীদের দেয়া হয় চিকিৎসা ভাতা। ১৯৭৩-এর প্রথম জাতীয় বেতন স্কেলে ৫০ টাকা দিয়ে শুরু চিকিৎসা ভাতা। এখন ঠেকেছে দেড় হাজারে, তা সে যে গ্রেডেরই কর্মচারী হোক না কেন। অবসরে যাওয়ার পর বয়স ৬৫ হলে ভাতার পরিমাণ বেড়ে হয় আড়াই হাজার টাকা। দাবি-দাওয়ার বহরে চিকিৎসা ভাতাও কয়েক গুণ বাড়ানোর তালিকায় থাকায় নবম বেতন কমিশন তিন ধাপে বেশ একটা সন্তোষজনক স্তরে নিয়েছে।

১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ সরকারি কর্মচারীদের দিলেন এক মহা উপঢৌকন। বেতনের আধাআধি করে দুই প্রধান উৎসবে উৎসব ভাতা। ক্রমান্বয়ে সে উৎসব ভাতা মূল বেতনের সমান হলো। বিগত সরকারের আমলে নতুন করে বৈশাখী ভাতা নামে চালু হলো বেতনের ২০ শতাংশ ভাতা। এখন সে ভাতা বেড়ে বেতনের অর্ধেক হতে চলল। অদূর ভবিষ্যতে হিজরি নববর্ষ ভাতা, নবান্ন ভাতা, স্বাধীনতা দিবস ভাতা, বিজয় দিবস ভাতা, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ভাতা প্রভৃতি চালু হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

অফিসের পরের সময়টা পরিবারের জন্যই থাকা উচিত। কিন্তু সে সময়টাও সরকার নিয়ে নেয়ায় পুষিয়ে দিল টেলিফোন ভাতা পরবর্তী সময়ে মোবাইল ভাতা নামে। রাজকর্মচারীরা যাতে খুশি থাকে, তাই দেয়া হলো মোবাইল ফোন কেনার টাকাও। সে বরাদ্দ দেখলে পিলে চমকে ওঠে, এত দামি ফোন কতজন রাজকর্মচারী ব্যবহার করেন সে পেরেশানিতে।

নগর বিশারদরা বলছেন ঢাকায় ছোট গাড়ি বাড়তে বাড়তে রাস্তা আটকে যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার উদার হয়ে বিনা সুদে আমলাদের গাড়ি কেনার ঋণ দিল। প্রাধিকারের গণ্ডি বাড়াল, যাতে বেশি জনকে ঋণ দেয়া যায়। এ গাড়ি ব্যক্তিগত। বলা যেতে পারত বা এখনো বলা যায় গাড়ি স্বচালিত হতে হবে। কিন্তু না, গাড়ির ঋণ দেয়ার পর কর্মচারীদের অধিক সন্তুষ্টির জন্য দেয়া হলো চালকের বেতনসহ গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা। কারো কারো জন্য তা হয়ে গেল মূল বেতনের প্রায় কাছাকাছি। তা নাকি দেড় গুণ বাড়ানোর জোর উদ্যোগ আছে, যদিও জাতীয় বেতন কমিশন কোনো সুপারিশ করেনি, তবে বেড়ে গেলেও যেতে পারে।

নতুন ভাতার শুলুক-সন্ধানে থাকা সরকারি কর্মচারীরা জুটিয়ে নিলেন শিক্ষা সহায়তা ভাতা। সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য মাথাপিছু ৫০০ করে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা। চিকিৎসা ভাতার মতো এ ভাতাও ছোটবড় সবার জন্য একই। এরই মধ্যে আওয়াজ কানে এসেছে, ভাতার হারটি নিদেনপক্ষে সন্তানপ্রতি ৫ হাজার টাকা করার দাবি। কেউ কেউ আবার তাতেও সন্তুষ্ট নন। আরো বেশি হলে খুশি হয়। যে সন্তানদের জন্য শিক্ষা সহায়ক ভাতা দেয়া হচ্ছে, সেসব সন্তান লেখাপড়া শেষ করলে তাদের কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত শুধু তাদের বেকার ভাতার যে দাবি ওঠেনি সেটাই আশ্চর্য। বেতনের পাশাপাশি এ ভাতাও বাড়ছে। এবার বেতন কমিশন যুক্ত করছে নতুন একটি ভাতা—প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা। নতুন ভাতাটি প্রতিবন্ধী সন্তানের পিতা-মাতাকে সরকারের সহানুভূতির বার্তা।

১৩-২০ গ্রেডের সব কর্মচারী পেতেন ২০০ টাকা করে টিফিন ভাতা। এক পেশাজীবী দল তো এমনভাবে আসমান কাঁপাল যেন তাদের এ ২০০ টাকা টিফিন ভাতা দিয়ে অপমানই করা হচ্ছে। এটা ২ হাজার করলেও হয়তো একই অনুযোগ শুনতে হবে। তার চেয়ে বরং এ ভাতা তুলে দিয়ে মূল বেতনে যুক্ত করলে অনুযোগ শুনতে হবে না। সরকার বেতন নির্ধারণের সময় আহারের কথা বিবেচনায় রেখেই নির্ধারণ করে। তাই এ ভাতা তুলে দেয়াই শ্রেয়। একই সঙ্গে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের অন্যদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক ‘লাঞ্চ ভাতা’-ও বন্ধ করা দরকার। আসমান কাঁপানো আবদারে এবার টিফিন ভাতা পাঁচ গুণ বেড়ে ১ হাজার টাকা হলেও কতটা সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে তা ভবিতব্যই জানে।

২০ হতে ২ গ্রেড পর্যন্ত সরকারি কর্মচারী বাড়ির কাজ নিজে বা পরিবারের কোনো সদস্য করেন কিংবা করেন কর্মচারীর বেতনভুক গৃহসহায়ক। কিন্তু গ্রেড-১-এ উন্নীত হলেই সরকার দায়িত্ব নেন ঘর সামলানোর, দেয়া হয় ডোমেস্টিক এইড ভাতা।

মোদ্দাকথা, এসব নানা ধরনের ভাতাজুড়ে মোট বেতন যা-ই হোক না কেন, ডাকের বেতন বলতে সেই কেবলি মূল বেতন, যেটা বললে ফুটে ওঠে করুণ দশা। কর্মচারী সংগঠনগুলোও ভাতাস্বল্পতা নিয়ে দেনদরবারের শুলুক-সন্ধান করতে পারে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পরে অনেকেরই মুখ বেজার। তাই এক কাজ হোক—নানা রকম ভাতার বিলুপ্তি ঘটিয়ে মাংসল হোক মূল বেতন। মূল বেতন স্থূল হলে সরকারি কর্মচারীদের অন্যের সঙ্গে তুলনায় যে গ্লানি তা অনেকটাই লাঘব হতো।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব